বিমল কিছুই বুঝতে না পেরে বললে, হা, পুকুরে জল নেই; তাতে কী হয়েছে?
বিনয়বাবু বললেন, কিন্তু আজ বৈকালে আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে পুকুরটার কানায় কানায় জল টলমল করছে!
বিমল বললে, আপনি ভুল দেখেছেন!
না, আমি ঠিক দেখেছি।
তাহলে এর মধ্যে এক-পুকুর জল কোথায় গেল?
ওই আকাশে!
এই অদ্ভুত উত্তরে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল।
বিমল বললে, এক-পুকুর জল আকাশে উড়ে গেছে? না, না, এটা একেবারেই অসম্ভব!
বিনয়বাবু গম্ভীরভাবে বললেন, কাল সকালে আমি সব কথা খুলে বলব। তখন আপনারা বুঝতে পারবেন, এর মধ্যে কিছুই অসম্ভব নেই। এখন ডাকবাংলোয় ফিরে যাওয়া যাক।
কুমার মলিন মুখে বললে, কিন্তু আমার বাঘা?
বিনয়বাবু বললেন, সে আর ফিরবে না। শুধু বাঘা নয়, আমরা মানুষের আর্তনাদও শুনেছি, একজন মানুষও নিশ্চয় বাঘার সঙ্গী হয়েছে।
বিনয়বাবুর কথাই সত্য। পরদিন শোনা গেল, বিলাসপুরের একজন রাতের চৌকিদারের কোনওই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
.
মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা
বিমল বললে, দেখুন বিনয়বাবু, আপনি আমাদের চেয়ে বয়সে ঢের বড়। কাজেই এবার থেকে তুমি বলেই ডাকবেন।
বিনয়বাবু হেসে বললেন, আচ্ছা বিমল, তাই হবে।
বিমল বললে, তাহলে এইবারে এখানকার আশ্চর্য ব্যাপারের গুপ্তকথা আমাদের কাছে খুলে বলুন।
বিনয়বাবু খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, দেখো আমি যা বলব, তা শুনলে তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা, জানি না। কিন্তু বিশ্বাস করো আর নাই করো, এটুকু নিশ্চয়ই জেনো যে, আমি একটিও মনগড়া বাজে কথা বলব না, কারণ আমার প্রত্যেকটি কথাই বিজ্ঞানের মতে সত্য বলে প্রমাণ করা শক্ত হবে না। এমনকী, ইউরোপ আমেরিকার বড়-বড় পণ্ডিত আর বৈজ্ঞানিকরা এই বিষয় নিয়ে এখন যথেষ্ট মাথা ঘামাচ্ছেন। আমিও এই বিষয় নিয়ে আজ অনেক বৎসর ধরে আলোচনা করে আসছি—
বিমল বাধা দিয়ে বললে, কিন্তু এখানকার এইসব অলৌকিক কাণ্ডের সঙ্গে বিজ্ঞানের কী সম্পর্ক থাকতে পারে, বিনয়বাবু?
বিনয়বাবু হাসতে-হাসতে মাথা নেড়ে বললেন, বিমল ভায়া, এত অল্পেই ব্যস্ত হয়ে উঠো না। আগে মন দিয়ে আমার কথা শোনো..তোমরা জানো তো, সোম, মঙ্গল, বুধ প্রভৃতি অনেক গ্রহ আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আর এ-ও জানি যে, আমাদের পৃথিবীও একটি গ্রহ। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে যে গ্রহ আছে, তার নাম মঙ্গল বা মার্স।
হুঁ। ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় মানমন্দিরে আজকাল এমন সব প্রকাণ্ড দুরবিন ব্যবহার করা হয় যে, ওইসব গ্রহ-উপগ্রহ হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও, আমাদের চোখের সামনে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পণ্ডিতেরা অনেক আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, অন্তত কোনও কোনও গ্রহে পৃথিবীর মতো জীব বাস করে। এই সিদ্ধান্তের কারণও আছে। মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে বলে, দুরবিন দিয়ে তার ভিতরটাই বেশি করে দেখবার সুবিধে হয়েছে। পণ্ডিতেরা দেখেছেন যে, মঙ্গল গ্রহের ভিতরটা প্রায় মরুভূমির মতো। হয়তো প্রচণ্ড শীতের প্রকোপে আর জলাভাবে সেখানে উদ্ভিদ জন্মানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই সঙ্গে আরও একটি আশ্চর্য ব্যাপার দেখা গেছে। মঙ্গল গ্রহের মধ্যে শত শত ক্রোশ ব্যাপী এমন প্রকাণ্ড খাল আছে, যার তুলনা পৃথিবীতেও নেই। সে খাল আবার এমন সোজাসুজি কাটা যে, তা কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
বিমল অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে বললে, অর্থাৎ সে খাল কৃত্রিম?
হ্যাঁ। আর এইখানেই একটা মস্ত আবিষ্কারের সূত্রপাত। আরও দেখা গেছে, সে খাল যত দূর অগ্রসর হয়েছে ততদুর পর্যন্ত দু-পাশের জমি সবুজ–অর্থাৎ গাছপালায় ভরা। এখন বুঝে দেখ, কৃত্রিম খাল কখনও আপনা-আপনি প্রকাশ পায় না। নিশ্চয়ই তা মানুষ বা মানুষের মতো কোনও জীবের হাতে কাটা। আর এমন এক মরুভূমির মতন দেশে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শত শত ক্রোশ ব্যাপী কৃত্রিম খাল কেটে, চাষ-আবাদ করে যে জীব বেঁচে আছে, তারা যে খুব চালাক ও সভ্য, তাতেও আর কোনওই সন্দেহ নেই।
কমল বললে, বিনয়বাবু, এসব কথা আপনার মুখে আমি আরও অনেকবার শুনেছি। কিন্তু বিলাসপুরের এই ভূতুড়ে কাণ্ডের সঙ্গে আপনি মঙ্গল গ্রহকে টেনে আনছেন কেন?
বিনয়বাবু বললেন, ক্রমে বুঝবে, আগে সব শোনো। বৎসরের একটা ঠিক সময়ে, মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর অনেকটা কাছে আসে। কিছুদিন আগে কলকাতার সমস্ত খবরের কাগজে তোমরা নিশ্চয়ই পড়েছ যে, পৃথিবীর বড় বড় বেতারবার্তা পাঠাবার স্টেশনে এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটেছিল। বেতারযন্ত্রে এমন সব অদ্ভুত বার্তার সঙ্কেত এসেছিল, যার অর্থ কেউ বুঝতে পারেনি। সে-সব সঙ্কেত কোথা থেকে আসছে, তাও জানা যায়নি। ঠিক সেই সময়েই কিন্তু মঙ্গল গ্রহ এসেছিল পৃথিবীর খুব কাছেই। কাজেই বৈজ্ঞানিকরা স্থির করতে বাধ্য হলেন যে, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারাই পৃথিবীর লোকের সঙ্গে কথা কইবার জন্যে বেতারবার্তা পাঠাচ্ছে। কিন্তু তাদের বার্তার সঙ্গে আলাদা বলেই আমরা তা বুঝতে পারি না।
বিমল বললে, আজ্ঞে, হ্যাঁ, আমার মনে পড়ছে বটে, কিছুদিন আগে এমনই একটা ব্যাপার নিয়ে খবরের কাগজে মহা আন্দোলন চলেছিল।
বিনয়বাবু বললেন, তাহলে সংবাদপত্রে আরও একটা খবর তোমরা পড়েছ বোধহয়? আমেরিকার একজন সাহসী বৈজ্ঞানিক রকেটে চড়ে মঙ্গল গ্রহে যাত্রা করবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন?
