কুমার বললে, না, না, কামড়াবে না, বাঘা বড় ভালো কুকুর।
কমল এতক্ষণ চুপ করে কথাবার্তা শুনছিল। এখন সে বললে, বিমলবাবু, আপনাদের নাম আর ওই কুকুরের নাম শুনে আমার একটা কথা মনে হচ্ছে।
বিমল বললে, কী কথা?
কমল একটু ইতস্তত করে বললে, যকের ধন বলে আমি একটা উপন্যাস পড়েছিলুম, তাতেও বিমল, কুমার, রামহরি আর বাঘা কুকুরের নাম আছে। কী আশ্চর্য মিল!
বিমল একবার কুমারের মুখের দিকে চেয়ে মুখ হেসে বললে, মিল দেখে আশ্চর্য হবেন না। আমরা সেই লোকই বটে।
বিস্ময়ে হতভম্বের মতো কমল হাঁ করে খানিকক্ষণ বিমলের মুখের পানে তাকিয়ে রইল; তারপর বলে উঠল, তাও কি সম্ভব?
বিমল তেমনি হাসিমুখে বললে, সম্ভব নয় কেন?
কমল বললে, তারা হচ্ছে উপন্যাসের নোক, আর আপনারা যে সত্যিকারের মানুষ!
বিমল বললে, যকের ধন যে সত্যিকারের ঘটনা; তা মিথ্যা বলে ভাবছেন কেন?
সত্যি ঘটনা! তাহলে আপনারা কি সত্যি-সত্যিই খাসিয়া পাহাড়ের বৌদ্ধমঠে গিয়েছিলেন?
নিশ্চয়! কিন্তু সে আজ পাঁচ-ছয় বছর আগেকার কথা, সে সব বিপদের কথা এখন আমাদের কাছে স্বপ্ন বলে মনে হয়!
.
পুকুর-চুরি
খাওয়াদাওয়ার পর বিনয়বাবু যকের ধন-এর গল্পটি বিমলের মুখ থেকে আগাগোড়া শ্রবণ করলেন। তারপর আশ্চর্য স্বরে বললেন, আপনারা এই বয়সেই এমন সব বিপদের মধ্যে পড়েও বেঁচে আছেন! ধন্য!
বিমল বললে, বিনয়বাবু, বিপদ আমি ভালোবাসি, বিপদকে আমি খুঁজে বেড়াই, আর আজ এই বিলাসপুরেও আমরা এসেছি নতুন কোনও বিপদেরই সন্ধানে।
বিনয়বাবু বললেন, আপনারা সাহসী লোক বটে!
কুমার বললে, কিন্তু এখানে এই যে-সব ঘটনা ঘটছে, আমরা তো তার কোনও হদিস খুঁজে পাচ্ছি না। এসব কি ভূতুড়ে কাণ্ড?
বিনয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, না। তবে, আমার সন্দেহ যদি সত্য হয়, তাহলে–
বিমল অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আপনি কী সন্দেহ করেন। বিনয়বাবু?
বিনয়বাবু বললেন, এখন বলব না, আরও দু-চারটে প্রমাণ দরকার, নইলে আপনারাই হয়তো বিশ্বাস করবেন না। অনেক রাত হল, আসুন–এবারে নিদ্রালোকে গমন করা যাক।
.
গভীর রাত্রে হঠাৎ একসঙ্গে সকলের ঘুম ভেঙে গেল।
কমল লাফ মেরে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, উঃ, কী শীত!
কুমার বললে, জানলা দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া আসছে–বাইরে ঝড় উঠেছে,–বলেই সে। উঠে পড়ে জানলা বন্ধ করে দিতে গেল।
বিনয়বাবু বললেন, দাঁড়ান কুমারবাবু, জানলা বন্ধ করবেন না।
ঝড় উঠেছে যে!
না, ঝড় ওঠেনি, দেখছেন না, বাইরে ফুটফুটে চাঁদের আলো?
তবে ও শব্দ কীসের?
সকলে কান পেতে শুনলে বাইরে থেকে একটা অদ্ভুত-রকম শব্দ আসছে–যেন কারা লক্ষ লক্ষ পেনসিল ঘর্ষণ করছে।
বিনয়বাবু গম্ভীর স্বরে বললেন, ও ঝড়ের শব্দ নয়।
বিমল বললে, তবে?
সেই রহস্যই তো জানতে চাই, বলেই বিনয়বাবু এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বাঘা ঘরের ভিতর থেকে এক লাফে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সকলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। চারিদিকে পরিষ্কার চাঁদের আলো, আকাশে মেঘের নামমাত্র নেই। তবে ঝড়ের মতন ঠান্ডা-হাওয়া বইছেই বা কেন, আর ওই রহস্যময় শব্দটাই বা আসছে কোত্থেকে?
বিনয়বাবু বললেন, শব্দটা হচ্ছে উপর দিকে। তার কথা শেষ হতে না হতেই খানিক তফাত থেকে মানুষের তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল–তার পরেই কুকুরের চিৎকার।
কুমার বললে, এ যে বাঘার গলা!
রামহরি বললে, বাঘা বোধহয় কারুকে কামড়ে ধরেছে।
মানুষ আর কুকুরের চিৎকার আরও বেড়ে উঠল।
কুমার বললে, না রামহরি, বাঘা কারুকে কামড়ায়নি, তার চিৎকার শুনে মনে হচ্ছে, সে যেন ভয়ানক ভয় পেয়েছে!
বিমল বললে, চলো, চলো, এগিয়ে দেখা যাক!
যেদিক থেকে সেই মানুষ আর কুকুরের আর্তনাদ আসছে, সকলে বেগে সেইদিকে ছুটে গেল। কিন্তু কই, কোথাও তো কিছুই নেই!
আর্তনাদ তখনও হচ্ছে, কিন্তু অতি অস্পষ্ট–যেন অনেক দূর থেকে আসছে।
কুমার চেঁচিয়ে ডাকলে–বাঘা, বাঘা, বাঘা! কোথায় বাঘা?
বিনয়বাবু উপর-পানে হাত তুলে বললেন, আকাশে!
বিমল বললে, হা, হ্যাঁ তাই তো! আকাশ থেকেই তো আর্তনাদ আসছে, এ কী কাণ্ড।
রামহরি বললে, রাম, রাম, রাম, রাম! বাঘাকে পরিতে উড়িয়ে নিয়ে গেছে!
কুমার কাতরভাবে বললে, আমার এতদিনের কুকুর।
সকলে সভয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
বিনয়বাবু বললেন, ওই যেন কী দেখা যাচ্ছে না? বিমল বললে, হ্যাঁ, ঠিক যেন দুটো কালো ফোঁটা…ওই যাঃ, মিলিয়ে গেল!
বিনয়বাবু আরও আশ্চর্য ব্যাপার দেখলেন,আকাশের বুকে ছায়ার মতো অস্পষ্ট কি একটা প্রকাণ্ড জিনিস! কিন্তু সে ব্যাপার আর প্রকাশ না করে তিনি শুধু বললেন, আর সেই শব্দ নেই, আর্তনাদও শোনা যাচ্ছে না–ঠান্ডা বাতাসও বইছে না।
কমল বললে, এমন ব্যাপারের কথাও তো কখনও শুনিনি! এর মানে কী বিনয়বাবু? আপনি কি এখনও বলতে চান যে, এসব ভৌতিক কাণ্ড নয়?
বিনয়বাবু কোনও জবাব দিলেন না, ঘাড় হেঁট করে কি ভাবতে লাগলেন।…খানিকক্ষণ পরে পথের পাশে তাকিয়ে সচমকে তিনি বললেন, ও কী ও!
সকলেই সেদিকে তাকালে, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলে না। পথের পাশে খালি পুকুর রয়েছে, কিন্তু তার জল প্রায় সমস্তই শুকিয়ে গিয়েছে।
বিনয়বাবুকে তখনও বিস্ফারিত চোখে সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিমল জিজ্ঞাসা করলে, আপনি কি দেখছেন বিনয়বাবু?
বিনয়বাবু বললেন, ওই পুকুরটা!
