কমল বললে, কিছু না। বরং অচেনা লোকের বাড়ির চেয়ে ডাকবাংলোই ভালো।
স্টেশনের কাছেই ডাকবাংলো। দুজনে ডাকবাংলোর হাতার ভিতরে গিয়ে ঢুকতেই সেখানকার চাকর এসে তাদের সেলাম করলে।
বিনয়বাবু বললেন, এ বাংলো কি তোমার জিম্মায় আছে?
সে বললে, হ্যাঁ, কর্তাবাবু।
তোমার নাম কী?
আজ্ঞে, অছিমুদ্দি।
দেখো অছিমুদ্দি, আজ আমরা এখানে থাকব। এই ব্যাগটা তোমার কাছে রাখো, আর আমাদের দুজনের জন্যে রাত্রের খাবারের ব্যবস্থা করো–মুরগির ঝোল চাই, বুঝলে? এই নাও টাকা। আমরা ততক্ষণে একটু ঘুরে আসি।
বিনয়বাবু কমলের হাত ধরে বাংলোর হাতা থেকে আবার বেরিয়ে পড়লেন।
কমল বললে, আমরা কোথায় যাচ্ছি, বিনয়বাবু?
বিনয়বাবু বললেন, শীতলার মন্দিরে। বটগাছের ব্যাপারটা সত্যি কি না, আগে দেখে আসা দরকার।
বিনয়বাবু বিলাসপুরে আগেও বারকয়েক এসেছিলেন, কাজেই পথ-ঘাট তার জানা ছিল। মিনিট পাঁচেক পরেই তারা শীতলার মন্দিরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
বিনয়বাবু বললেন, কমল, সত্যিই তো বটগাছটা নেই দেখছি! সে গাছটা আগেও আমি। দেখেছি,–প্রকাণ্ড গাছ। শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিখ্যাত বটগাছ দেখেছ তো? এ গাছটি তার চেয়ে কিছু ছোট হলেও এতবড় গাছ বাংলাদেশে আর কোথাও দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। অথচ দেখো, সেই গাছের বদলে এখন শুধু একটা গর্ত রয়েছে।
কমল অবাক হয়ে দেখলে, তার সামনে মস্ত বড় একটা গর্ত–তার ভিতরে অনায়াসে শতাধিক মানুষকে কবর দেওয়া যায়। বটগাছটা যে কত বড় ছিল কমল এতক্ষণে তা আন্দাজ করতে পারলে। অথচ এত বড় একটা গাছকেই সকলের অজান্তে রাতারাতি উড়িয়ে নিয়ে গেছে! মানুষের পক্ষে এমন কাজ অসম্ভব, সম্পূর্ণ অসম্ভব!
মন্দিরের ভিতর থেকে একটি লোক বেরিয়ে এল।
বিনয়বাবু এগিয়ে গিয়ে তাকে একটি প্রণাম করে বললেন, আপনি বোধহয় এই শীতলাদেবীর সেবাইত?
হ্যাঁ, বাবা।
এখানে নানারকম আশ্চর্য কাণ্ডকারখানা হচ্ছে শুনে আমরা কলকাতা থেকে দেখতে এসেছি। আচ্ছা, যে রাতে বটগাছটি অদৃশ্য হয়, সে রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?
এই মন্দিরের পাশেই আমার ঘর। আমি এইখানেই ছিলুম।
অথচ কিছুই টের পাননি?
টের যে ঠিক পাইনি, তা নয়; তবে আসল ব্যাপারটা তখন বুঝতে পারিনি।
কী রকম?
অনেক রাতে হঠাৎ কীরকম একটা শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তার পরেই ঝড়ে গাছ দোলার মতো আওয়াজ শুনলুম সঙ্গে সঙ্গে একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাঁপটা জানলা দিয়ে আমার ঘরে ঢুকে পড়ল, আর বটগাছের বাঁদরগুলো কাতরে চাচাতে লাগল। ঝড় উঠেছে ভেবে তাড়াতাড়ি আমি জানলা বন্ধ করে দিলুম–তার পরেই সব চুপচাপ। সকালে উঠে দেখি, বটগাছটা আর নেই।
তাহলে আপনি কি মনে করেন যে, ঝড় এসেই বটগাছটিকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে?
না, না, তা কী করে হবে? এতবড় বটগাছ উড়িয়ে নিয়ে যাবে, এমন প্রচণ্ড ঝড় উঠলে গাঁয়ের ভিতরে নিশ্চয়ই আরও অনেক গাছপালা তছনছ হত, অনেক ঘর-বাড়ি পড়ে যেত। কিন্তু আর কোথাও কিছু হল না, উড়ে গেল শুধু এই বটগাছটা?
তাহলে আপনি কি বলতে চান যে–
লোকটি বাধা দিয়ে বললে, আমি আর কিছু বলতে চাই না বাবা, এসব কথা নিয়ে নাড়াচাড়া করতেও আমার ভয় হয়, বলতে বলতে সে আবার মন্দিরের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বিনয়বাবু ফিরে বললেন, চলো কমল, আমরা একবার গাঁয়ের ভিতরটা ঘুরে আসি।
দুজনে আবার অগ্রসর হলেন। বিলাসপুর গ্রামখানি বেশ বড়–তাকে শহর বললেও চলে। পথে পথে ঘুরে নানা লোককে নানা কথা জিজ্ঞাসা করেও বিনয়বাবু আর কোনও নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে পারলেন না। তবে এটুকু বেশ বোঝা গেল, খবরের কাগজের কোনও কথাই মিথ্যা নয়।
সন্ধ্যার মুখে তারা যখন আবার ডাকবাংলোর দিকে ফিরলেন, তখন বিনয়বাবু লক্ষ করলেন যে, গ্রামখানি এর মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। পথে আর মানুষ নেই, অধিকাংশ ঘর বাড়িরই দরজা-জানলা বন্ধ। এখানকার বাসিন্দারা যে খুব বেশি ভয় পেয়েছে, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই।
বাংলোর বারান্দায় উঠে বিনয়বাবু দেখলেন, সেখানে দুটি যুবক দু-খানা চেয়ারের উপর বসে আছে। তার মধ্যে একটি যুবকের দেহ যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, দেখলেই বুঝতে দেরি লাগে না যে, তার দেহে অসুরের মতন ক্ষমতা।
তিনি কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই সেই লম্বা-চওড়া যুবকটি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন করে বললে, আজ বৈকালে আপনারাই কি এসেছেন?
হ্যাঁ।
তাহলে আমরাও আজ এখানে আপনাদের সঙ্গী হতে চাই। আপনার কোনও আপত্তি নেই তো?
না, না, আপত্তি আবার কীসের? বেশ তো একসঙ্গে সবাই মিলে থাকা যাবে। আপনারা কোথা থেকে আসছেন?
কলকাতা থেকে। খবরের কাগজে একটা ব্যাপার পড়ে দেখতে এসেছি।
ও, তাহলে আপনারও আমাদেরই দলে? আমরাও ওই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। আপনাদের নাম জানতে পারি কি?
আমার নাম শ্রীবিমলচন্দ্র রায়, আর আমার বন্ধুটির নাম শ্রীকুমারনাথ সেন।
বিনয়বাবু বললেন, বিমলবাবু, খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তো?
বিমল বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার চাকর রামহরিকে বাজারে পাঠিয়েছি, ওই যে, সে ফিরছে। চাঙারি হাতে করে একটি লোক বাগান থেকে বারান্দায় এসে উঠল, তার সঙ্গে এল ল্যাজ নাড়তে-নাড়তে প্রকাণ্ড একটা কুকুর।
বিনয়বাবু বললেন, ও কুকুরটা কার? কামড়াবে না তো?
