এসব কোনও বদমাশ বা চোরের দলের কাজ হইতে পারে না। তাহা হইলে পূর্বোক্ত স্টিমার বা বটগাছ বা ইঞ্জিনের কোনও না কোনও খোঁজ নিশ্চয়ই পাওয়া যাইত। অতবড় একটা বটগাছ শিকড়সুদ্ধ উপড়াইয়া ফেলিতে যে কত লোকের দরকার, তা আর বুঝাইয়া বলিবার দরকার নাই–মোট কথা, সেটা একেবারে অসম্ভব। এসব কাজ এতটা চুপিচুপি, এত শীঘ্র করাও চলে না। অথচ এমনি সব কাণ্ড ঘটিতেছে। এর কারণ কী?
বিলাসপুরের বাসিন্দারা এইসব অলৌকিক ব্যাপারে যে যার পর নাই ভয় পাইয়াছে, সেকথা বলাই বাহুল্য। সন্ধ্যার পর গ্রামের কেউ আর বাহির হয় না। চৌকিদারও পাহারা দিতে চাহিতেছে না সকলেই বলিতেছে, এসব দৈত্য-দানবের কাজ। রাত্রে অনেকেই নাকি একরকম অদ্ভুত শব্দ শুনিতে পায়–সে শব্দ ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হইয়া আবার ধীরে-ধীরে মিলাইয়া যায়। কোনও কোনও সাহসী লোক জানলায় মুখ বাড়াইয়া দেখিয়াছে বটে, কিন্তু কিছুই দেখিতে পায় নাই। তবে তাহারা সকলেই এক আশ্চর্য কথা বলিয়াছে শব্দটা যখন খুবই স্পষ্ট হইয়া উঠে, তখন চারিদিকে নাকি বরফের মতো কনকনে ঠান্ডা বাতাস বহিতে থাকে। এ শব্দ কীসের। এবং এ ঠান্ডা বাতাসের গুপ্ত রহস্যই বা কী?
আমরা অনেক রকম আশ্চর্য ঘটনার কথা শুনিয়াছি, কিন্তু এমন ব্যাপার আর কখনও শুনি নাই। এ ঘটনাগুলি যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য, সে বিষয়েও কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কারণ, আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা স্বয়ং ঘটনাস্থলে গিয়া সমস্ত বিষয় পরীক্ষা করিয়া আসিয়াছেন। যাঁহাদের বিশ্বাস হইবে না, তাঁহারাও নিজেরা দেখিয়া আসিতে পারেন।
.
শব্দ ও ঠান্ডা বাতাস
খবরের কাগজখানা টেবিলের উপরে রেখে কমল খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বিনয়বাবু তার মুখের পানে তাকিয়ে বললেন, সমস্ত পড়লে তো?
কমল বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ।
কী বুঝলে?
ঘটনাগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে এসব ভূতুড়ে ব্যাপার বলে মানতে হবে বই কী।
বিনয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, প্রথমত, আমি ভূত মানি না। দ্বিতীয়ত, ভূতে যে একদল খালাসি সমেত স্টিমার, ইঞ্জিন আর একদল বানরসুদ্ধ বটগাছ একেবারে বেমালুম হজম করে ফেলতে পারে এমন গল্প কখনও গাঁজাখোরের মুখেও শোনা যায় না।
কমল বললে, তবে কি এ সমস্ত আপনি মানুষের কাজ বলে মনে করেন?
বিনয়বাবু বললেন, মানুষ! মানুষের সাধ্য নেই যে ঘাসের গোছার মতো দেড়শো বছরের বটগাছ উপড়ে ফেলবে, খেলার পুতুলের মতন স্টিমার বা ইঞ্জিন তুলে নিয়ে যাবে! বিশেষ, তাহলে ওই বটগাছ, স্টিমার বা ইঞ্জিনের কোনও না কোনও খোঁজ নিশ্চয়ই পাওয়া যেত। এই ইংরেজ রাজত্বে একখানা ছোট গয়না কেউ চুরি করে লুকিয়ে রাখতে পারে না, আর অত বড় বড় মালের যে কোনও পাত্তাই মিলছে না, তাও কি কখনও সম্ভব হয়? স্টিমারের খালাসিরা আর গাছের বানরগুলোই বা কোথায় যাবে? তারপর, এই শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস। এরই বা হদিস কী? কেন শব্দ হয়, কেন ঠান্ডা বাতাস বয়?
কমল বললে, তাহলে আপনি কী মনে করেন? এসব যদি ভূত বা মানুষের কাজ না হয়—
বিনয়বাবু বাধা দিয়ে বললেন, কমল, ভূত কি মানুষের কথা এ সম্পর্কে একেবারে ভুলে যাও! এ এক এমন অজ্ঞাত শক্তির কাজ, আমাদের পৃথিবীতে যার তুলনা নেই। সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিকরা যে শক্তির সন্ধানের জন্যে এতকাল ধরে চেষ্টা করছেন, আমাদের বাংলাদেশেই তার প্রথম লীলা প্রকাশ পেয়েছে। কমল, তুমি জানো না, আমার মনে কী আনন্দ হচ্ছে!
কমল কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চুপ করে থেকে বললে, বিনয়বাবু, আপনার কথা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি কী বলতে চান?
বিনয়বাবু কয় পা এগিয়ে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন তারপর খানিকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে বললেন, কমল, আজ বৈকালেই আমি বিলাসপুরে রওনা হব। তুমিও আমার সঙ্গে যাবে?
কমল বললে, আমরা সেখানে গিয়ে কী করব?
বিনয়বাবু বললেন, ভয় পেয়ো না। ভয় পেলে মানুষ নিজের মনুষ্যত্বের মর্যাদা রাখতে পারে না। বিলাসপুরের যে-সব ঘটনা ঘটছে তা এক আশ্চর্য আবিষ্কারের সূচনা মাত্র! শীঘ্রই এর চেয়ে বড় বড় ঘটনা ঘটবে, আর তা ঘটবার আগেই আমি ঘটনাক্ষেত্রে হাজির থাকতে চাই।
কমল বললে, বিনয়বাবু, আমি ভয় পাইনি। আমি খালি বলতে চাই যে, পুলিশ যেখানে বিফল হয়েছে, আমরা সেখানে গিয়ে কী করব?
বিনয়বাবু বললে, পুলিশ তো বিফল হবেই, এ রহস্যের কিনারা করবার সাধ্য তো পুলিশের নেই। বাংলাদেশে এখন একমাত্র আমিই এ ব্যাপারের গুপ্ত কথা জানি আমার এতদিনের আলোচনা কি ব্যর্থ হতে পারে? এখন আমার প্রশ্নের জবাব দাও। আমার সঙ্গে আজ কি তুমি বিলাসপুরে যাবে?
কমল বললে, যাব।
.
নতুন পরিচয়
বিনয়বাবু আর কমল যখন বিলাসপুরে গিয়ে হাজির হলেন, তখন বিকালবেলা।
বিনয়বাবু বললেন, কমল এখানে আমার এক বন্ধুর বাড়ি আছে। তার বাড়িতে গিয়ে উঠলে পরে তিনি আমাদের খুব আদর-যত্ন করবেন বটে, কিন্তু কোনও খবর না দিয়ে হঠাৎ গিয়ে পড়লে তার অসুবিধে হতে পারে।
কমল বললে, কিন্তু সেখানে না গিয়েও তো উপায় নেই। রাত্রে একটা মাথা গোঁজবার ঠাই তো দরকার?
বিনয়বাবু হেসে বললেন, নিশ্চয়, নিশ্চয়! আমরা কি আর মাঠে শুয়ে রাত কাটাব? এখানে ডাকবাংলো আছে; সেখানে আজকের রাত কাটাতে তোমার কোনও আপত্তি নেই তো?
