নিতেই হবে? বেশ, ও-বিষয় নিয়ে আপনি সতীশবাবুর সঙ্গে কথা কইতে পারেন!..ওঠো হে রবীন! মহারাজকে প্রণাম করে আমি এখন সবেগে পলায়ন করতে চাই!
মেঘদূতের মর্ত্যে আগমন (উপন্যাস)
অলৌকিক রহস্য
সেদিন সকালবেলায় কমল যখন নিজের পড়বার ঘরে সবে এসে বসেছে, হঠাৎ তার চাকর ঘরে ঢুকে খবর দিলে, বাবু, একটা লোক আপনাকে এই চিঠিখানা দিয়ে গেল। কমল চিঠিখানা খুলে পড়লে, তাতে শুধু লেখা আছে–
প্রিয় কমল,
শীঘ্র আমার বাড়িতে এস। সাক্ষাতে সমস্ত বলব। ইতি– বিনয় মজুমদার।
বিনয়বাবুর সঙ্গে কমলের আলাপ হয় মধুপুরে বেড়াতে গিয়ে। কমলের বয়স উনিশ বৎসর, সে কলেজের তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণির ছাত্র। বিনয়বাবুর বয়স পঁয়তাল্লিশ। কিন্তু বয়সে এতখানি তফাত হলেও, দুজনের মধ্যে আলাপ খুব জমে উঠেছিল। বিনয়বাবুর স্বভাবটা ছিল এমন সরল যে, বয়সের তফাতের জন্যে কারুর সঙ্গে তার ব্যবহারের কিছুমাত্র তফাত হত না।
কমলের সঙ্গে বিনয়বাবুর আলাপ এত ঘনিষ্ঠ হবার আরও একটা কারণ ছিল। বিনয়বাবু সরল হলেও তার প্রকৃতি ঠিক সাধারণ লোকের মতন নয়। দিন-রাত তিনি পুঁথিপত্র আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকেন, সংসারের আর কোনও ধার বড় একটা ধারেন না। তাঁর বাড়ির ছাদের উপরে আকাশ-পরিদর্শনের নানারকম দুরবিন ও যন্ত্র আছে, গ্রহ-নক্ষত্রের খবর রাখা তার একটা মস্ত বাতিক। এ-সম্বন্ধে তিনি এমন সব আশ্চর্য গল্প বলতেন, তার অন্যান্য বন্ধুরা যা গাঁজাখুরি বলে হেসেই উড়িয়ে দিতেন, এমনকী অনেকে তাকে পাগল বলতেও ছাড়তেন না।
কমল কিন্তু তার কথা খুব মন দিয়ে শুনত। কমলের মতো শ্রোতাকে পেয়ে বিনয়বাবুও ভারি খুশি হয়েছিলেন এবং এইজন্যেই কমলকে তার ভারি ভালো লাগত। নিজের নতুন-নতুন। জ্ঞানের কথা কমলের কাছে তিনি খুলে বলতেন, কমলও তা ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিতে কিছুমাত্র ইতস্তত করত না।
আজ সকালে বিনয়বাবুর চিঠি পেয়ে কমল বুঝল যে, তিনি নিশ্চয়ই কোনও বিশেষ কথা তাকে বলতে চান। সে তখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
বিনয়বাবুর বাড়িতে গিয়ে উপরে উঠে কমল দেখলে, তিনি তার লাইব্রেরি-ঘরের ভিতরে অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিনয়বাবু দেখতে ফরসা এবং মাথায় মাঝারি হলেও তার দেহখানি এমন বিষম চওড়া যে, দেখলেই বোঝা যায়, তার গায়ে জোর আছে অত্যন্ত। তার মাথায় কাঁচাপাকা চুল,–সে চুলে কখনও চিরুনি-বুরুশ পড়েছে বলে সন্দেহও হয় না। মুখেও কাঁচাপাকা গোঁফ ও লম্বা দাড়ি।
কমলকে দেখেই বিনয়বাবু বললেন, এই যে ভায়া, আমি তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি!
কমল বললে, কেন বিনয়বাবু, আপনি কোনও নতুন নক্ষত্র আবিষ্কার করেছেন নাকি?
বিনয়বাবু তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বললেন, না হে, না, তার চেয়েও গুরুতর ব্যাপার!
তার চেয়ে গুরুতর ব্যাপার। তবে কি ধূমকেতু আবার পৃথিবীর দিকে তেড়ে আসছে?
তাও নয়।
তাও নয়? কিন্তু আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আপনি বড়ই ভয় পেয়েছেন।
ভয় পাইনি, তবে চিন্তিত হয়েছি বটে! আচ্ছা, আগে এই খবরের কাগজখানা পড়ে দেখো,–এই, এই নীল পেনসিলে দাগ দেওয়া জায়গাটা!–এই বলে বিনয়বাবু কমলের হাতে একখানা বাংলা খবরের কাগজ এগিয়ে দিলেন।
কাগজের একটা কলমের চারপাশে নীল পেনসিলের মোটা দাগ টানা রয়েছে। কমল পড়তে লাগল–
অলৌকিক কাণ্ড!
ভূত, না, মানুষের অত্যচার?
কলিকাতার অদূরবর্তী বিলাসপুর গ্রামে সম্প্রতি নানারূপ আশ্চর্য ঘটনা ঘটিতেছে, পুলিশ অনেক অনুসন্ধান করিয়াও কিছুই কিনারা করিয়া উঠিতে পারিতেছে না।
আজ ঠিক একমাস আগে প্রথম ঘটনা ঘটে। বিলাসপুরের জমিদারের একখানি ছোট স্টিমার গঙ্গার ঘাটে বাঁধা ছিল। হঠাৎ একদিন সকালে দেখা গেল, স্টিমারখানি অদৃশ্য হইয়াছে। স্টিমারে কয়েকজন খালাসি ছিল, তাহারাও নিরুদ্দেশ। পুলিশের বহু অনুসন্ধানেও স্টিমারের কোনও সন্ধান মিলে নাই।
তার পরের ঘটনা আরও বিস্ময়কর। বিলাসপুরের শীতলাদেবীর মন্দিরের সামনে একটি বহু-পুরাতন সুবৃহৎ বটবৃক্ষ ছিল। স্থানীয় লোকেরা বলে, বটগাছটির বয়স দেড়শত বৎসরের চেয়েও বেশি। এতবড় বটগাছ ও-অঞ্চলে আর দ্বিতীয় ছিল না! গত ৩ কার্তিক সোমবার সন্ধ্যাকালে এই বটগাছের তলায় কৃষ্ণযাত্রার অভিনয় হইয়াছিল। কিন্তু পরদিন প্রভাতে দেখা গেল, সমগ্র বটগাছটি রাত্রের মধ্যেই ডাল-পালা-শিকড়-সুদ্ধ কোথায় অদৃশ্য হইয়াছে। বটগাছের চিহ্নমাত্রও সেখানে নাই, গাছের উপরে একদল বানর বাস করিত, তাহাদেরও কোনও সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না। যেখানে বটগাছ ছিল, সেখানে একটি প্রকাণ্ড গর্ত হাঁ-হাঁ করিতেছে, দেখিলে মনে হয়, যেন এক বিরাট-দেহ দানব বটগাছটিকে শিকড়সুদ্ধ উপড়াইয়া লইয়া গিয়াছে।
তৃতীয় ঘটনাটিও কম আশ্চর্যের নয়। বিলাসপুর স্টেশনে একখানা রেলগাড়ির ইঞ্জিন লাইনের উপর দাঁড় করানো ছিল। গত ১৩ কার্তিক তারিখে রাত্রি বারোটার সময় স্টেশনমাস্টার স্বয়ং ইঞ্জিনখানাকে দেখিয়াছিলেন। কিন্তু রাত্রি একটার পর থেকে ইঞ্জিনখানাকে আর পাওয়া যাইতেছে না। ইঞ্জিনে আগুন ছিল না, সুতরাং তাহাকে চালাইয়া লইয়া যাওয়া অসম্ভব। তার উপরে সমস্ত লাইন তন্ন-তন্ন করিয়া খুঁজিয়াও ইঞ্জিনের কোনও সন্ধান মিলে নাই।
