গাঙ্গুলি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, হেমন্তবাবু, ওসব বাজে কথা যেতে দিন মহারাজাবাহাদুরের মেজাজ আজ ভালো নয়। ভুলে যাবেন না, আজ হচ্ছে মাসের চব্বিশ তারিখ।
হেমন্ত বললে, আমি কিছুই ভুলিনি মি. গাঙ্গুলি! আজ মাসের চব্বিশ তারিখ বলেই আমি এখানে এসেছি।
মহারাজা ভুরু কুঁচকে বললেন, হ্যাঁ, মজা দেখতে। আমার যাবে পনেরো লক্ষ টাকা জলে, আর আপনি দেখবেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা!
আমি মজা দেখতে আসিনি মহারাজা, মজা দেখাতে এসেছি।
একথার অর্থ?
অর্থ হচ্ছে প্রথমত, আপনার পনেরো লক্ষ টাকা জলে পড়বে না, স্থলেই থাকবে– অর্থাৎ ব্যাঙ্কে।
অর্থটা আরও জটিল হয়ে উঠল। নয় কি গাঙ্গুলি?
গাঙ্গুলি বললেন, আমি তো অর্থই খুঁজে পাচ্ছি না। এ হচ্ছে অর্থহীন কথা।
হেমন্ত হেসে বললে, আচ্ছা, সতীশবাবু এসেই এর অর্থ বুঝিয়ে দেবেন। তিনি গাড়িতে বসে আছেন–ডেকে পাঠান।
মহারাজা বললেন, যাও তো গাঙ্গুলি, সতীশবাবুকে এখানে নিয়ে এসো।
গাঙ্গুলি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
হেমন্ত বললে, মহারাজা, প্রথমে আমি ভেবেছিলুম, কলকাতায় নিজস্ব কোনও ছেলেধরার দল যুবরাজকে চুরি করেছিল। কারণ আপনারা কলকাতায় আসবার আগেই চুরি গিয়েছিল আরও দুটি ছেলে। কিন্তু তারপরেই আমার ভ্রম বুঝেছি। এখন জানতে পেরেছি যে, প্রধানত পুলিশের চোখে ধূলি নিক্ষেপ করবার জন্যেই প্রথম ছেলে দুটি চুরি করা হয়েছিল। কিন্তু চোরের আসল। উদ্দেশ্য ছিল দুর্জয়গড়ের যুবরাজকেই চুরি করা।
মহারাজা ফ্যালফ্যাল করে হেমন্তের মুখের পানে তাকিয়ে বললেন, আপনার কোনও কথারই মানে আজ বোঝা যাচ্ছে না!
ঠিক এইসময়ে ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়াল, সতীশবাবুর সঙ্গে দুর্জয়গড়ের যুবরাজ।
মহারাজা নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। স্তম্ভিত চক্ষে!
বাবা, বাবা! বলে চেঁচিয়ে উঠে যুবরাজ ছুটে গিয়ে পিতার কোলের ভিতরে আঁপিয়ে পড়ল।
ছেলেকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে মহারাজা খানিকক্ষণ আচ্ছন্নের মতন রইলেন–তাঁর দুই চোখ ছাপিয়ে ঝরতে লাগল আনন্দের অশ্রু!
তারপর আত্মসংবরণ করে দুই হাতে ছেলের মুখ ধরে তিনি বললেন, খোকন, খোকন, এতদিন তুই কোথায় ছিলি বাছা?
আমাকে ধরে রেখেছিল বাবা!
কে?
তাদের চিনি না তো!
কে তোকে ফিরিয়ে এনেছে?
যুবরাজ ফিরে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিলে।
মহারাজা ব্যস্তভাবে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আঁঃ, আপনারা? আমার ছেলেকে বাঁচিয়েছেন, আপনারা? আপনাদের এখনি আমি পুরস্কার দেব কল্পনাতীত পুরস্কার! আমার চেক-বুক কই? গাঙ্গুলি, গাঙ্গুলি!
সতীশবাবু বললেন, মি. গাঙ্গুলি তো এখন আসতে পারবেন না, মহারাজ! তিনি একটু বিপদে পড়েছেন।
বিপদ? গাঙ্গুলি আবার কি বিপদে পড়ল?
তিনি বাইরে গিয়ে যেই দেখলেন গাড়ির ভেতরে আমার পাশে বসে আছেন যুবরাজ, অমনি হরিণের মতো ছুটে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। তখনই আমার পাহারাওয়ালারা গিয়ে তাকে ধরে ফেললে। এতক্ষণে হাতে তিনি লোহার বালা পরেছেন।
মহারাজ ধপাস করে কৌচের উপরে বসে পড়ে বললেন, আবার সব মানে গুলিয়ে যাচ্ছে– সব মানে গুলিয়ে যাচ্ছে!
হেমন্ত বললে, কিছু গুলোবে না মহারাজ! সব আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।..মামলাটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি দৈবগতিকে একটা সাঙ্কেতিক শব্দে লেখা বিজ্ঞাপন দেখে আবিষ্কার করে ফেলেছিলুম যে, কলকাতায় কেউ আমেরিকান অপরাধীদের অনুকরণে ছেলে ধরবার জন্যে গুন্ডার দল গঠন করেছে। সে দলপতি হলেও গুন্ডাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে মেলামেশা করে না– অনেক কাজই চালায় সাঙ্কেতিক লিপির দ্বারা। সে যে যুবরাজকে কোনও দ্বীপে লুকিয়ে রেখেছে, এও টের পেলুম। তার নিজের হাতে লেখা এক পত্র পেয়ে আরও আন্দাজ করলুম, সে আমেরিকা-ফেরত, কারণ যে চিঠির কাগজ সে ব্যবহার করেছে তা কালিফোর্নিয়ার তৈরি, কলকাতায় পাওয়া যায় না। তারপর রাজবাড়িতে এসে খোঁজ নিয়ে যখন জানলাম যে, আপনার সঙ্গে গাঙ্গুলিও আমেরিকায় গিয়েছিল, তখন প্রথম আমার সন্দেহ আকৃষ্ট হয় তার দিকেই। তারপর একদিন গাঙ্গুলি নিজেই তার মৃত্যুবাণ তুলে দিলে আমার হাতে কোনও খেয়ালে জানি না, মহারাজের কাছ থেকে পুরস্কার-ঘোষণার বিজ্ঞাপন লেখবার ভার পেয়ে সে আমাদের সাহায্য গ্রহণ করলে। রবীনের মুখে ভাষা শুনে সে নিজের হাতে লিখে নিলে। আর তার সেই হাতের লেখা হল আমার হস্তগত। সাঙ্কেতিক লিপির লেখার সঙ্গে তার হাতের লেখা মিলিয়েই আমার কোনও সন্দেহই রইল না।
মহারাজা অভিযোগ-ভরা কণ্ঠে বললেন, সব রহস্য জেনেও আপনি তখনি ওই মহাপাপীর সাধুর মুখোশ খুলে দেননি!
দিইনি তার কারণ আছে মহারাজ! অসময়ে গাঙ্গুলিকে গ্রেপ্তার না করবার তিনটে কারণ হচ্ছে : ওইটুকু প্রমাণ আমার পক্ষে যথেষ্ট হলেও আদালতের পক্ষে যথেষ্ট নয়। গুন্ডার দল তখনও ধরা পড়েনি। দলপতির গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পেলে গুন্ডারা হয়তো প্রমাণ নষ্ট করবার জন্যে যুবরাজকে হত্যা করতেও পারত।
ঠিক, ঠিক! হেমন্তবাবু, আপনার কৃতজ্ঞতার ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারব না। আপনি কি পুরস্কার চান বলুন।
পুরস্কার? আমি পুরস্কারের লোভে কোনও মামলা হাতে নিই না। ভগবানের দয়ায় আমার কোনও অভাব নেই। আমি কাজ করি কাজের আনন্দেই।
না, না, পুরস্কার আপনাকে নিতেই হবে।
