ঠিক সেইসময়ে বনের ভিতর থেকে শোনা গেল ধ্ৰুম, ধ্রুম, ধ্রুম করে পরে-পরে তিনটে বন্দুকের আওয়াজ!
হেমন্ত হাসতে-হাসতে বললে, তাহলে বনবাসী বন্ধুরা বশ মানেননি–সেপাইদের সঙ্গে তাঁরা লড়াই করছেন? বেশ, বেশ! কিন্তু যুদ্ধে জিতে ফিরে এলেও দেখবে, তাদের বন্দিশালা শূন্য পড়ে আছে!…সতীশবাবু, তফাতে সরে যান! রবীন, হঠ যাও!
.
দূর থেকেই দেখলুম, হেমন্ত একটা দেশলাইয়ের কাটি জ্বেলে চামচের চূর্ণের উপরে ধরলে, চূর্ণ জ্বলে উঠল।
তারপরেই সে চামচের জ্বলন্ত চূর্ণটা লোহার দরজায় ছড়ানো চূর্ণের উপরে ফেলে দিয়েই চোখের নিমেষে লাফ মেরে তফাতে সরে এল।
মুহূর্ত-মধ্যে সেখানে জেগে উঠল। একটা চোখ-ধাঁধানো ভীষণ তীব্র অগ্নিশিখা সঙ্গে সঙ্গে চড়-চড় পট-পট শব্দ! বিষম বিস্মিত চোখে আমরা দেখতে লাগলুম, সেই জুলন্ত অংশটা যেন ক্রমে ক্রমে লোহার দরজার ভিতরে বসে যাচ্ছে! তারপরেই হঠাৎ হুড়মুড়-ঝনাৎ করে একটা শব্দ হল–বুঝলুম, দরজা খুলে নীচে ঝুলে পড়েছে।
আমি ছুটে গিয়ে দেখলুম, লোহার দরজার একটা পাল্লায় যেখানে ছিল কড়ার গোড়া, সেখানটায় রয়েছে একটা এত-বড় ছাদা যে, হাতের মুঠো গলে যায় তার ভিতর দিয়ে!
সতীশবাবু হতভম্বের মতন বললেন, এ কী কাণ্ড?
হেমন্ত বললে, থার্মিট!
থার্মিট? ও বাবা, সে আবার কী?
জার্মানির এস্যেন শহরের Goldschmidt নামে এক রসায়নবিদ পণ্ডিত এর আবিষ্কারক। Iron oxide আর metallic aluminium-এর মিশ্রণে এটি প্রস্তুত। তার উপরে যদি magnesium powder জ্বালিয়ে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে এমন এক ভয়ানক আগুনের সৃষ্টি হয় যে তার তাপ ওঠে fifty-four hundred degrees Fahrenheit পর্যন্ত! থার্মির্ট যেটুকু জায়গার উপরে ছড়ানো থাকে, লোহার বা ইস্পাতের কেবল সেইটুকু অংশই গলিয়ে দেয়।
সতীশবাবু বললেন, লোহার সিন্দুকের উপরে যদি এই থার্মিট ব্যবহার করা হয়?
তারও দুর্দশা হবে এই দরজাটার মতো!
বাব্বাঃ! হেমন্তবাবু, এত বৈজ্ঞানিক-বুদ্ধি নিয়ে আপনি চোর হলে কলকাতার আর রক্ষে থাকত না!
এখন গল্প রাখুন মশাই, বনের ভিতর কী হচ্ছে জানি না–আগে বন্দিদের উদ্ধার করুন!
লোহার দরজার তলায় একটা সিঁড়ি। তারপরেই অন্ধকার।
সতীশবাবু কোমল-স্বরে ডাকলেন, নীচে কে আছ খোকাবাবুরা! বেরিয়ে এসো–বেরিয়ে এসো! আর তোমাদের ভয় নেই। আমরা তোমার মা-বাবার কাছ থেকে এসেছি!
সিঁড়ির তলায় অন্ধকারের ভিতর থেকে উঁকি মারতে লাগল, তিনখানি শীর্ণকাতর কচিমুখ–উভ্রান্ত তাদের চোখের দৃষ্টি!
বাইরে একটা গোলমাল শোনা গেল।
হেমন্ত বললে, সতীশবাবু, খোকাদের ভার আপনার উপরে আমি গোলমালটা কীসের শুনে আসি! এসো রবীন!
বাইরে গিয়ে দেখলুম, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর ও জমাদার আসছে রিভলভার হাতে আগে-আগে, তারপরেই এখানকার দুশমন চেহারার গুন্ডাগুলো তাদের প্রত্যেকেরই হাতে হাতকড়া এবং সব-পিছনে বন্দুকধারী আটজন মিলিটারি-পুলিশ। গুণে দেখলুম, বন্দিরা সংখ্যায় দশজন।
হেমন্ত আনন্দিতকণ্ঠে বলে উঠল, যাক বন্দুকের শব্দ শুনে আমার দুশ্চিন্তা হয়েছিল। এখন বোঝা যাচ্ছে, বন্দুক ছোঁড়া হয়েছে কেবল এদের ভয় দেখাবার জন্যেই! বুঝেছ রবীন, বিনা রক্তপাতেই কেল্লা ফতে–চমৎকার! আমি বৈষ্ণবের ছেলে, রক্তপাত ভালোবাসি না!
.
চতুর্দশ। কেউ হাসে, কেউ কাঁদে
কলকাতায় এসেছি। ইন্সপেক্টরের সঙ্গে শ্যামলপুরের জমিদারপুত্র ও লৌহব্যবসায়ী পতিতপাবন নন্দীর পুত্রকে পাঠিয়ে দেওয়া হল যথাস্থানে।
সতীশবাবু দুর্জয়গড়ের যুবরাজকে নিয়ে প্রাসাদের সামনে গাড়িতে অপেক্ষা করতে লাগলেন–রঙ্গমঞ্চ প্রস্তুত করবার জন্যে হেমন্তের সঙ্গে আমি ঢুকলুম রাজবাড়ির ভিতরে। আজকেই হচ্ছে মাসের চব্বিশ তারিখ।
হেমন্ত কার্ড পাঠিয়ে দিলে। পাঁচমিনিট যেতে না যেতেই ভৃত্য এসে আমাদের মহারাজাবাহাদুরের ড্রয়িং রুমে নিয়ে গেল।
একখানা কৌচের উপরে মহারাজাবাহাদুর চার-পাঁচটা কুশনে মাথা রেখে লম্বা হয়ে শুয়ে রয়েছেন তাঁর চোখের কোলে গাঢ় কালির রেখা, মুখ যেন বিষণ্ণতার ছবি। কৌচের পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মি. গাঙ্গুলি।
আমাদের দেখে মহারাজা ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। তারপর বিরক্ত-মুখে বললেন, হেমন্তবাবু, আপনি কি আজ মজা দেখতে এসেছেন?
হেমন্ত বললে, সে কী মহারাজ, আপনার দুঃখ-শোক কি আমার পক্ষে কৌতুককর হতে পারে?
তা ছাড়া আর কি বলব বলুন? শুনলুম আপনি আমার মামলা ছেড়ে দিয়ে গেছেন হাওয়া খেতে।
একথা কে আপনাকে বললে?
গাঙ্গুলি।
মি. গাঙ্গুলি!
গাঙ্গুলি বললেন, চোরকে পনেরো লাখ টাকা দিয়ে আপনি যুবরাজকে ছাড়িয়ে আনতে বলেছিলেন, আমি কেবল সেই কথাই মহারাজাবাহাদুরকে জানিয়েছিলুম।
মহারাজা বললেন, ওকথা বলা আর মামলা ছেড়ে দেওয়া একই কথা!
নিশ্চয়ই নয়।
দীপ্তচক্ষে মহারাজা বললেন, আমার সামনে অত বেশি চেঁচিয়ে জোর-জোর কথা বলবেন না হেমন্তবাবু! আমার পদমর্যাদা ভুলে যাবেন না।
পদমর্যাদা? পদ-সেবা জীবনে কখনও করিনি, কাজেই কারুর পদের মর্যাদা নিয়ে মাথাও ঘামাইনি কখনও। হেমন্ত হাসতে হাসতে বললে, অত্যন্ত সহজভাবে।
এরকম স্পষ্ট কথা শুনতে বোধ হয় মহারাজাবাহাদুর অভ্যস্ত নন, তিনি বিপুল বিস্ময়ে হেমন্তের মুখের পানে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন।
