কিন্তু ওদের দলকে বনের ভেতরে গ্রেপ্তার করবার পরেও তো বন্দিদের উদ্ধার করা যেতে পারে?
রবীন, সাবধানের মার নেই। ধরো, শত্রুদের সবাই হয়তো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে না। গোলমাল দেখে ভয় পেয়ে তারা যদি বন্দিদের নিয়ে বনের ভেতর কোনও গুপ্তস্থানে পালিয়ে যায়, তখন আমরা কী করব?
আমি মুগ্ধ স্বরে বললুম, হেমন্ত এইটুকু সময়ের মধ্যে তুমি সবদিক ভেবে নিয়েছ!
ভাবতে হয় ভাই, ভাবতে হয়! মস্তিষ্ককে যে যথাসময়ে কাজে লাগাতে না পারে, তাকেই পড়তে হয় পদে পদে বিপদে! নাও, আর কথা নয়! সবাই প্রস্তুত হও!
.
ত্রয়োদশ। থার্মিট
আমরা তিন একতলা বাড়ি দেখপেরে একজন
আমরা তিনজনে একটা ঝোপ বেছে নিয়ে তার ভিতরে বসে দেখলুম সামনেই সাদা-কলি দেওয়া একখানা একতলা বাড়ি। দেখলেই বোঝা যায়, বাড়িখানা নতুন।
বাড়ির সদর-দরজার চৌকাঠের উপরে একজন হৃষ্টপুষ্ট লোক বসে হুঁকো টানছে। তার একটু তফাতেই আর-একটা লোক গাভীর দুগ্ধদোহন করছে।
বাড়ির সামনে একটুখানি চাতালের মতন জায়গা। সেখানে চারজন লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরস্পরের সঙ্গে কি কথাবার্তা কইছে।
হেমন্ত ঠিক বলেছে, এদের কারুর চেহারাই কার্তিকের মতো নয়, বরং স্মরণ করিয়ে দেয়, দুর্গা-প্রতিমার মহিষাসুরকে। তাদের জনতিনেককে মনে হল হিন্দুস্থানী বলে।
অনতিবিলম্বেই আমাদের তিনজন লোক বনের ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করলে। দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্যে তাদের চেষ্টাও করতে হল না। তারা বাইরে আসবামাত্রই সদর-দরজায় লোকটা সবিস্ময়ে হুঁকোটা পাশে রেখে দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে হেঁড়ে গলায় হাঁকলে, কে রে! কে রে!
আমাদের লোকেরা দাঁড়িয়ে পড়ল চমকে ও থমকে!
শত্রুদের অন্যান্য লোকেরাও সচকিত দৃষ্টিতে দু-এক মুহূর্ত এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন আগন্তুকরা আকাশ থেকে খসে পড়া মানুষ!
আমাদের লোকেরা জড়োসড়ো হয়ে পিছোতে লাগল পায়ে-পায়ে।
তারপরেই উঠল মহা হইচই! বাড়ির ভিতর থেকেও আরও চারজন লোক ছুটে এল– তাদের মধ্যে একজনের চেহারা আবার একেবারে যমদূতের মত, যেমন ঢ্যাঙা তেমনি চওড়া।
আমাদের লোকেরা যেন প্রাণের ভয়েই বনের ভিতরে অদৃশ্য হল।
চাতালের উপরে কতকগুলো ছোট-বড় কাটা-বাঁশ পড়েছিল। শত্রুরা টপাটপ সেই বাঁশগুলো তুলে নিয়ে মারমূর্তি হয়ে গর্জন করতে করতে ছুটে গিয়ে ঢুকল বনের ভিতরে।
হেমন্ত হাসিমুখে বললে, বিনা রিহার্সালে আমাদের লোকেরা প্রথম শ্রেণির অভিনয় করেছে! এখন ওরা শেষ রক্ষা করতে পারলেই হয়!
সতীশবাবু বললেন, কোনও ভয় নেই হেমন্তবাবু! সঙ্গে যাদের এনেছি তারা হচ্ছে। বহুযুদ্ধজয়ী বীর। কিন্তু এইবারে আমরা কি বেরিয়ে পড়ব?
না, আরও মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করা যাক।
মিনিট দুয়েক কাটল।
হেমন্ত বললে, আসুন, সৈন্যহীন রণক্ষেত্রে এইবারে আমাদের বীরত্ব দেখাবার পালা। এত গোলমালেও বাড়ি থেকে যখন আর কেউ বেরুল না, নিশ্চয়ই তখন পথ সাফ! তবু রিভলভারগুলো হাতে নেওয়া ভালো!
সামনের জমিটা পার হলুম। গাভীটা অবাক হয়ে আমাদের পানে তাকিয়ে রইল, বোধহয় আমাদের মতন ভদ্ৰচেহারা এ-অঞ্চলে সে আর কখনও দেখেনি!
বাড়ির ভিতরে জনপ্রাণীর সাড়া নেই। পাঁচখানা ঘরসব ঘরের দরজা খোেলা। প্রত্যেক ঘরেই ঢুকলুম–কোথাও কেউ নেই।
হেমন্ত বারান্দায় বেরিয়ে এসে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না তো!
হঠাৎ শোনা গেল, শিশুর অস্পষ্ট কান্না!
সতীশবাবু চমকে বললেন, ছেলে কাঁদে কোথায়?
আমি দৌড়ে দালানের এককোণে গিয়ে দেখলুম, মেঝের উপরে রয়েছে একটা মস্ত চৌকোণা সমতল লোহার দরজা! হাঁটু গেড়ে বসে হেঁট হয়ে দরজায় কান পেতে বললুম, এইখানে, এইখানে! এরই তলা থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে!
দরজার উপরে আঘাত করে বুঝলুম, পুরু লোহার পাত পিটে তৈরি। প্রকাণ্ড কড়ায় প্রকাণ্ড কুলুপ লাগানো।
হতাশ-স্বরে বললুম, এ-কুলুপ ভাঙা অসম্ভব!
এবারে ভিতর থেকে কান্না জাগল একাধিক শিশু-কণ্ঠের! সকাতরে একজন কাঁদছে, ওগো মা গো, ওগো বাবা গো!
সতীশবাবু দুই কানে হাত চাপা দিয়ে বললেন, দিন-রাত এই কান্না শুনতে শুনতে এরা এখানে বাস করছে! কী পাষণ্ড!
হেমন্ত দরজায় উপরে সজোরে আট-দশবার পদাঘাত করলে। দরজা ঝনঝন করে বেজে উঠল।
আমি বললুম, বৃথা চেষ্টা হেমন্ত! ওই গুন্ডাগুলো ধরা পড়লে তবেই চাবি দিয়ে এ দরজা খোলা যাবে।
হেমন্ত বললে, এখনও তো বনের ভেতরে কোনওই সাড়াশব্দ পাচ্ছি না! যদি ওরা পালিয়ে যায়, তাহলেও কি আমরা এই বন্ধ-দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওই অভাগা শিশুদের কান্না শুনব?
তা ছাড়া উপায়?
উপায় আমার এই ব্যাগে! বলেই হেমন্ত মাটির উপরে উপুড় হয়ে বসে পড়ল।
হেমন্ত যখনই বাইরে কোনও অ্যাডভেঞ্চারে বেরুত, একটি ব্যাগ তার সঙ্গে-সঙ্গে থাকত সর্বদাই। তার মধ্যে যে কতরকম বৈজ্ঞানিক ও রাসায়নিক রহস্যের উপাদান এবং ছোট ছোট যন্ত্র সাজানো থাকত আমি তাদের হিসাবও জানি না, মর্মও বুঝি না। হেমন্তকে জিজ্ঞাসা করলে বলত, এটি হচ্ছে আমার ভ্রাম্যমান ল্যাবরেটরি! বলা বাহুল্য, ব্যাগটি আজও আছে তার। হাতে।
সে ব্যাগ খুলে বার করলে কাচের ছিপি আঁটা দুটি ছোট ছোট শিশি।
প্রচণ্ড কৌতূহলী চোখ নিয়ে সতীশবাবু হেঁট হয়ে দেখতে লাগলেন।
হেমন্ত অপেক্ষাকৃত বড় শিশিটার ছিপি খুলে লোহার দরজার একটা কড়ার গোড়ায় খানিকটা লালচে-রঙের চুর্ণ ঢেলে দিলে। তারপর অন্য শিশিটার ভিতর থেকে আর-একরকম চুর্ণ নিয়ে একটা চামচের ভিতরে রাখলে।
