অবস্থাগতিকে হয়তো প্রাণ হাতে করে পালাবার দরকার হবে।
মাঠের মাঝবরাবর এসেছি, হেমন্ত হঠাৎ বলে উঠল, আমাদের অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন!
চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে সতীশবাবু বললেন, কই, আমি তো কোথাও আশার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাচ্ছি না!
হেমন্ত হাত তুলে একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললে, ওই দেখুন!
কী?
ধোঁয়া।
অনেক দূরে অরণ্যের মাথায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে খানিকটা ধোঁয়া ক্রমেই উপরদিকে উঠে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে সেখানে জেগে উঠল, পুঞ্জ পুঞ্জ ঊর্ধ্বগামী ধূম।
হেমন্ত বললে, ধোঁয়ার জন্ম আগুনে। আর আগুনের জন্ম মানুষের হাতে!
কিন্তু দাবানল জ্বলে আপনি।
ওটা কি মনে হচ্ছে? দাবানলের, না উনুনের ধোঁয়া?
উনুনের।
তবে এগিয়ে চলুন তাড়াতাড়ি।
সকলেরই মুখ উত্তেজিত। কিন্তু কেউ কোনও কথা কইলে না। নীরবে মাঠের বাকি অংশটা পার হয়ে গভীর এক অরণ্যের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালুম।
সতীশবাবু বললেন, আবার যে বন এল!
হেমন্ত বললে, আসুক। বন আমাদের বন্ধুর মতো লুকিয়ে রাখবে।
আমি বললুম, এখানে বনের ভেতরে যে একটি স্বাভাবিক পথের মতো রয়েছে!
হেমন্ত বললে, ভালোই হল। ধোঁয়া দেখেছি উত্তর-পশ্চিমে! পথটাও গিয়েছে ওইদিকে। এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো!
পথ দিয়ে এগুতে-এগুতেই মানুষের স্মৃতিচিহ্ন পেলুম। এক জায়গায় পেলুম একটা আধ পোড়া বিড়ি। মাঝে মাঝে শুকনো কাদায় মানুষের পায়ের ছাপ। বুঝলুম, পথটা ব্যবহৃত হয়।
মাইলখানেক অগ্রসর হওয়ার পর হেমন্ত বললে, সতীশবাবু, আর বোধহয় এভাবে এগুনো নিরাপদ নয়। আপনারা এইখানে অপেক্ষা করুন। আমি ওই বড় বটগাছটায় চড়ে চারিদিকটা একবার দেখি। সে গাছের তলায় গিয়ে জুতো খুলে ফেললে। তারপর উপরে উঠতে লাগল।
তখন সূর্য পশ্চিম-আকাশের দিকে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে ছায়া ঘন হয়ে উঠেছে। বেশ কাছ থেকেই শুনলুম, কে যেন কাকে চেঁচিয়ে ডাকছে। একবার গাভীর গম্ভীর হাম্বা-রবও শোনা গেল!
খানিক পরে হেমন্ত গাছ থেকে নেমে এল।
বললুম, কী দেখলে হেমন্ত?
যা দেখবার, সব! একটা লম্বা একতালা বাড়ি। ঘর আছে বোধহয় খান পাঁচ-ছয়। জনতিনেক লোকও দেখলুম–বেশ লম্বা-চওড়া, কারুর চেহারাই বাঙালি কুমোরের গড়া কার্তিকের মতো নয়। বাড়ির ভেতরে নিশ্চয়ই আরও লোক আছে।
বাড়িখানা এখান থেকে কত দূরে?
খুব কাছে।
অতঃপর কী কর্তব্য?
কিন্তু হেমন্তের সাড়া পাওয়া গেল না। সে নীরবে একবার বটগাছটার চারিপাশ ঘুরে এল। একবার বনের পথের দিকে তাকিয়ে দেখলে। তারপর চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবতে লাগল। সে এমন গম্ভীর ভাব ধারণ করেছে যে, আমরা কেউ তাকে ডাকতে ভরসা করলুম না।
মিনিট পাঁচ-ছয় এইভাবে কাটল। তারপর হেমন্ত হঠাৎ হাসিমুখে যেন নিজের মনেই বললে, ঠিক, ঠিক হয়েছে!
সতীশবাবু বললেন, কী হয়েছে হেমন্তবাবু? এতক্ষণ কী ভাবছিলেন?
আক্রমণের প্ল্যান!
প্ল্যান?
হ্যাঁ। আমি ভেবে দেখছিলুম কোন উপায়ে রক্তপাত না করেই কাজ হাসিল করা যায়।
তাহলে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন?
অসম্ভব কি! এটা তো মুনি-ঋষিদের তপোবন নয়, মানুষ-বাঘের বাসা।
ভেবে কী স্থির করলেন?
আটজন মিলিটারি-পুলিশ বন্দুক নিয়ে এই বটগাছটার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে থাকুক, যেন ওই পথ থেকে কেউ ওদের দেখতে না পায়। বাকি আমরা ছজনে মিলে ওই বাড়ির কাছে এগিয়ে যাই। তারপর রবীন আর আপনাকে নিয়ে আমি একটু তফাতে গিয়ে কোনও ঝোপ-টোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ব। তারপর আমাদের বাকি তিনজন, আসামিদের বাড়ির কাছে গিয়ে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। ওদের মধ্যে পড়ে যাবে বিষম সাড়া। আমাদের তিনজন লোক পায়ে পায়ে পিছিয়ে পালাবার ভাবভঙ্গি প্রকাশ করবে। তারপর আসামিরা সদলবলে তাড়া করে এলেই আমাদের লোকরা দ্রুতপদে সত্য-সত্যই পলায়ন করবে বনের পথে। ওরাও তখন নিশ্চয়ই তাদের পিছনে পিছনে ছুটবে–সংখ্যা মোটে তিনজন দেখে ওরা কিছুই ভয় পাবে না। তারপর আমাদের তিনজন লোক এই বটগাছটা পেরিয়ে অল্প কিছুদূর অগ্রসর হয়েই, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে সুমুখ ফিরে বার করবে তাদের রিভলভার এবং তাদের একজন বাজাবে হুইস! সঙ্কেত শুনে সেই মুহূর্তেই আটজন মিলিটারি পুলিশ বটগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াবে শত্রুদের পিছন দিকে। সামনে তিনটে রিভলভার আর পিছনে আটটা বন্দুক। এ-দেখেও তারা যদি আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে দু-একবার বন্দুক-রিভলভার ছুঁড়লেই তাদের যুদ্ধের সাধ মিটতে দেরি লাগবে না। সতীশবাবু, প্ল্যানটা কি আপনার পছন্দ হচ্ছে?
সতীশবাবু উচ্ছ্বসিতস্বরে বললেন, পছন্দ হচ্ছে না আবার! এক্ষেত্রে এর চেয়ে নিরাপদ প্ল্যান কল্পনাও করা যায় না! এত তাড়াতাড়ি কী করে যে আপনি ফন্দি আবিষ্কার করেন, আমি তো মশাই বুঝতেই পারি না। ধন্যি মানুষ আপনি–জিনিয়াস!
আমি বললুম, আর আমরা ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে বসে বসে কী করব হেমন্ত? তোমার গল্প, না মশাদের ঐকতান শুনব?
হেমন্ত বললে, ও-দুটোর একটাও না! শত্রুরা যেই আমাদের লোকের পিছনে তাড়া করে বনের ভেতর ঢুকবে, আমরাও অমনি ঝোপ থেকে বেরিয়ে পড়ে ঢুকব ওদের বাড়ির অন্দরে। যদি ওদের দলের দু-তিনজন লোক তখনও সেখানে থাকে, তাহলেও আমাদের তিনটে রিভলভারের সামনে ওরা পোষ না মেনে পারবে না। তারপর আমরা খুঁজে দেখব, কোথায় বন্দি হয়ে আছে কলকাতার হারিয়ে যাওয়া তিনটি ছেলে!
