শহরে বসে কারুর মুখে এ কাহিনি শুনলে কখনও বিশ্বাস করতুম না। কেউ একে সত্য বলে চালাবার চেষ্টা করলে তাকে নিশ্চয়ই আমি পাগলাগারদে পাঠাতে বলতুম।
কিন্তু এইখানে,আফ্রিকার এই বনে! এখানে বসে আজ সবই সম্ভব বলে মনে হচ্ছে! তাবুর পরদার তুলে একবার বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলুম।
কী পরিষ্কার রাত! আকাশে যেন জ্যোৎস্নার সমুদ্র এবং বাতাসে যেন জ্যোৎস্নার ঝরনা! ওই তো জুজু পাহাড়,–তার মেঘ-ছোঁয়া শিখরের ওপরে পূর্ণচাঁদের রৌপ্যমুকুট। পাহাড়ের নীচের দিক গভীর জঙ্গলে ঢাকা–মানুষ যার মধ্যে ভরসা করে ঢোকে না। কিন্তু ফুটফুটে চাঁদের আলোয় এই ভয়াল গহন বনকেও দেখাচ্ছে আজ চমৎকার!
এই আনন্দময় সুন্দর চন্দ্রালোকের মধ্যেও যে অরণ্যের চিরন্তন নাট্যলীলা বন্ধ হয়ে নেই, তার সাড়াও কানের কাছে বেজে উঠছে অনবরত। কাছে, দুরে আরও দুরে বনের মাটি কাঁপয়ে ঘনঘন বজ্রধ্বনির মতন সিংহদের ক্ষুধার্ত গর্জন শোনা যাচ্ছে, সভয়ে দুদুড়িয়ে জেব্রার দল পলায়ন করছে তাদের অসংখ্য ক্ষুরের শব্দ! হায়েনারা থেকে থেকে রাক্ষুসে অট্টহাসি হাসছে! গাছের ওপরে বানরদের পাড়ায় কিচিরমিচির আওয়াজ এবং হয়তো সাপের মুখে পড়ে কোনও পাখি মৃত্যুযাতনায় আর্তনাদ করে উঠল ও তাই শুনে আশপাশের পাখিরা সচকিত হয়ে ডানা ঝাঁপটা দিলে! মাঝে-মাঝে তক্ষকের মতন কী-একটা জীব ডেকে উঠে যেন জানিয়ে দিচ্ছে, এই জীবনযুদ্ধক্ষেত্রে সেও একজন যোদ্ধা! পাচারা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে উড়ে যাচ্ছে রাত্রিকে যে বিষাক্ত করে! এইসব শব্দ রেখার মতন এসে পড়ছে যেন শব্দময় আর একখানা বিরাট পটের ওপরে এবং তা হচ্ছে অনন্ত অরণ্যের অশ্রান্ত, অব্যক্ত ধ্বনি! শব্দ-পটের ওপরে শব্দ রেখা পড়ে এঁকে যাচ্ছে এক বিচিত্র শব্দচিত্র!
তাঁবুর দরজা থেকে অল্প তফাতে হিংস্র পশুদের ভয় দেখাবার জন্যে আগুন জ্বেলে, বসে বসে গল্প করছে কাফ্রি বেয়ারা ও কুলিরা। তাদের কালো কালো মুখগুলোর খানিক খানিক অংশ আগুনের আভায় লাল দেখাচ্ছে। তাদের ভাষা জানি না, তারা কী গল্প করছে তাও জানি না, তবে একটা বিশেষ কথা বারবার আমার কানের কাছে বাজতে লাগল। তারা বারংবার উত্তেজিত স্বরে বলে বলে উঠছে, জুজু! জুজু! জুজু!
বুঝলুম, এখনও তাদের ভিতরে ওই জুজু-পাহাড় নিয়েই আলোচনা চলছে। এরা হচ্ছে সরল অসভ্য মানুষ,শহুরে সভ্য মানুষের মনের মতন এদের মন নানা চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়ে নেই, তাই এদের মাথার ভিতরে একটা কোনও বিশেষ নতুন চিন্তা ঢুকলে এরা সহজে আর সেটা ভুলতে পারে না।
কিন্তু জুজু-পাহাড়ের যে বিভীষিকা এদের মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে, সত্য-সত্যই সেটা কি কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়?
এই অজানা বাঙালির লেখা ডায়েরিখানা পড়বার পর সে কথা তো আর জোর করে বলতে পারি না! এ ডায়ারি যিনি লিখেছেন তিনি ওদের মতন অসভ্য নন। লেখার ভাষা দেখেই বুঝেছি, তিনি সুশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি যে-কোনও ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের বর্ণনা দেননি, লেখা পড়লে তাও জানা যায়। কিন্তু যেসব কথা তিনি লিখেছেন–
হঠাৎ তাঁবুর পরদা ঠেলে কাফ্রিদের সর্দার ভিতরে প্রবেশ করল। তার মুখে ভয় ও উদ্বেগের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কী ব্যাপার, সর্দার?
সে বললে, আপনি কি এখানে শিকারের জন্যে আরও কিছুদিন থাকবেন?
হ্যাঁ। এখানে দেখছি খুব সহজেই শিকার পাওয়া যায়। দিন পনেরো এখানেই থেকে যাব মনে করছি।
সর্দার বললে, তাহলে আমাদের বিদায় দিন। আমরা কাল সকালেই এখান থেকে পালাতে চাই!
আশ্চর্য হয়ে বললুম, সে কী! কেন?
সর্দার বললে, এ জায়গায় জ্যান্ত মানুষের থাকা উচিত নয়! এখানকার ইট-কাঠ-পাথরের ওপরেও জুজুর অভিশাপ আছে!
আমি হেসে উঠে বললুম, সর্দার! আবার তুমি পাগলামি শুরু করলে?
সর্দার মাথা নেড়ে বললে, না হুজুর, না! পাগলামির কথা নয়। আজ এইমাত্র স্বচক্ষে যা দেখলুম!
কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, স্বচক্ষে কী তুমি দেখেছ? ভূত? জুজু? পেতনি? না রাক্ষস?
সর্দার অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললে, না হুজুর, না! এসব ব্যাপার নিয়ে ঠাট্টা করা ভালো নয়। আজ আমি স্বচক্ষে যা দেখেছি, আর একবার তা দেখলে আমি আর বাঁচব না।
অধীর ভাবে বললুম, কিন্তু তুমি কী দেখেছ, আগে সেই কথাটাই বলো না।
আমরা জানতুম হুজুর, জুজুরা ওই পাহাড়ের বাইরে আসে না। তাই আমরা নির্ভয়ে এদিকে-ওদিকে চলাফেরা করে বেড়াচ্ছিলুম। কিন্তু আজ দেখছি, জুজুরা পাহাড় ছেড়ে নীচেও নামে। বোধহয় এটা আপনার দোষেই। আপনি আমাদের বারণ শুনলেন না। মানুষ হয়েও পাহাড়ে উঠে জুজু-পাহাড়ের পবিত্রতা নষ্ট করলেন। তাই আপনাকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে তারা পাহাড় ছেড়ে নেমে এসেছে।
আমি শুয়েছিলুম। এইবারে উঠে বসে বিরক্ত স্বরে বললুম, সর্দার! হয় তুমি কি দেখেছ বলো, নয় এখান থেকে চলে যাও! তোমার বাজে বকুনি শোনবার সময় আমার নেই।
সর্দার বললে, একটু আগে আমি নদী থেকে এক বালতি জল আনতে গিয়েছিলুম। ফেরবার সময়ে ঠিক আমার সুমুখ দিয়েই একটা জিনিস গড়াতে গড়াতে তিরবেগে এধার থেকে পথ পার হয়ে ও-ধারের জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেল। ধবধবে চাঁদের আলোয় সে জিনিসটাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম।
সে জিনিসটা কী? কোনও জন্তু-টন্তু?
