না।
মানুষও নয়? না। একটা ছোট পিপে। আমি বাধো বাধো স্বরে বললুম, একটা ছোট পিপে?
হ্যাঁ হুজুর। একটা ছোট পিপে। কে কবে দেখেছে, পিপে আবার জ্যান্ত হয়ে গড়িয়ে বেড়ায়?
হয়তো কেউ তোমাকে ভয় দেখাবার জন্যে পিপেটাকে ধাক্কা মেরে গড়িয়ে দিয়েছিল।
না হুজুর! আমি দিব্যি গেলে বলতে পারি, সেখানে আমি ছাড়া আর জনপ্রাণী ছিল । তারপর, আরও শুনুন। আমি বেশ ভালো করেই দেখেছি, সেই চলন্ত পিপেটার ভেতর থেকে দু-দুটো জ্বলন্ত রাক্ষুসে চোখ ভয়ানক ভাবে কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জলের বালতিটা সেখানেই ফেলে চো-চা দৌড় মেরে আমি পালিয়ে এসেছি। পিপে যেখানে হেঁটে বেড়ায় আর চোখ কটমটিয়ে তাকায়, সেখানে আর আমাদের থাকা চলে না। আমরা কাল সকালেই এ মুলুক ছেড়ে সরে পড়ব।–এই বলে সর্দার চলে গেল।
এবার আর সর্দারের কথা আমি হেসে উড়িয়ে দিতে পারতুম না। কারণ এই ডায়ারিখানা আমি পড়েছি। সর্দারের কথা মিথ্যা বললে, যিনি ডায়ারি লিখেছেন, তাঁকেও মিথ্যাবাদী বলতে হয়!
অবশ্য ডায়ারির অনেক জায়গায় চোখ বুলিয়ে আমার সন্দেহ হয়েছে বটে যে, আমি যেন কোনও ছেলে ভুলানো হাসির গল্প বা মজার রূপকথা পড়ছি, কিন্তু তবু লেখককে একেবারে অবিশ্বাস করতে পারছি না। হয়তো মাঝে-মাঝে বর্ণনার অত্যুক্তি বা অতিরঞ্জন আছে,সত্যিকার জীবনের কথা লিখতে বসেও অধিকাংশ লেখক যে লোভ সংবরণ করতে পারেন না! কিন্তু… কিন্তু, বিংশ শতাব্দীর কলেজে পড়া মোটরে চড়া বিজ্ঞান জানা সভ্য মানুষ আমি, একটা অসভ্য কাফ্রির কথা শুনে এবং একজন অচেনা মৃত ব্যক্তির ডায়ারির পাতা উলটে এমনধারা অদ্ভুত কাণ্ডকে ধ্রুবসত্য বলে একেবারে বিনা দ্বিধায় মেনে নেব?
কে জানে, ডায়ারি যিনি লিখেছিলেন, তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল কি না কে জানে? তিনি গালিভারের ভ্রমণ কাহিনির মতন একখানা কাল্পনিক উপন্যাস রচনা করে গেছেন কি না? হয়তো আজ তিনি এ-প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারতেন। কিন্তু মৃত্যু যাঁর মুখ বন্ধ করে দিয়েছে, তার কাছ থেকে আর কোনও উত্তর পাবারই আশা নেই।
তার পরেই মনে হল, তবু সর্দার আজ এখনই যে গল্প বলে গেল, তার সত্য-মিথ্যা তো আমি পরীক্ষা করে দেখতে পারি? ডায়ারির গল্পের সঙ্গে সর্দারের গল্পের কিছু কিছু মিল আছে। কেমন করে এমন মিল সম্ভবপর? সর্দারের গল্প যদি সত্য হয়, তাহলে ডায়ারির গল্প সত্য বলে মানা যেতে পারে। এমন একটা অসম্ভব বিস্ময়কর সত্যের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয়ের এই সুযোগ ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়!
তখনই ক্যাম্প-খাট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালুম এবং শিকারের পূর্ণ পোশাক পরতে লাগলুম। পোশাক পরতে-পরতে মনের ভিতরে কেমন একটা বিপদের সাড়া জেগে উঠল। কিন্তু সে ভাবটাকে আমি মনের ভিতরে স্থায়ী হতে দিলুম না।
বাংলার সবুজ কোলের শাস্তি ছেড়ে যে-লোক সুদূর আফ্রিকার নিবিড় জঙ্গলে কালো অন্ধকারের ভিতরে সিংহ, হাতি, গন্ডারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছে নির্ভয়ে এবং যার হাতে আছে বুলেট-ভরা বন্দুক ও কোমরে আছে ছ-নলা রিভলভার আর শিকারের ছোরা, বিপদের সামনে যেতে সে কেন ইতস্তত করবে? এই বিপদের গভীর আনন্দকে সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় উপভোগ করতে পারে বলেই পৃথিবীতে মানুষ আজ শ্রেষ্ঠ জীব হতে পেরেছে! উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু, আমেরিকা, উড়োজাহাজ ও ডুবোজাহাজ প্রভৃতি আজ আবিষ্কৃত হয়েছে কেন? বিপদের দৌলতে! এইসব আবিষ্কারের জন্যে কত মানুষ হাসতে-হাসতে প্রাণ দিয়েছে এবং কত মানুষ হাসতে হাসতে মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে। অধিকাংশ আবিষ্কারের মূলেই আছে এই বিপদের আনন্দ! যে জাতি এই বিপদের সাধনা শিখতে পারে, সে জাতির উন্নতির পথে কোনও বাধাই টেকে না।
এমনি সব ভাবতে-ভাবতে পোশাক পরা শেষ হল। কোমরের বেল্টে একটা টর্চ তো গুঁজে নিলুমই, তার ওপরে পেট্রল-জুলা একটা স্থির বিদ্যুতের মতন অতি উজ্জ্বল আলোের লণ্ঠনও নিতে ভুললুম না! আধা অন্ধকারে অনেক সময়ে একটা বৃক্ষশাখার আবছায়া নড়লেও অন্য কিছু বলে ভ্রম হয়। স্পষ্ট আলো সন্দেহ দূর করে।
তাঁবুর বাইরে এসেই দেখি, কাফ্রি কুলিরা তাদের মোটমাট বাঁধতে বসেছে। সর্দারকে ডেকে শুধোলুম, এসব কী হচ্ছে?
সর্দার বললে, ওরা সবাই ভয় পেয়েছে। অনেকে আজ রাতেই পালাবে। কিন্তু আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
আমি বললুম, নদীর ধারে।
নদীর ধারে! কেন হুজুর?
তুমি আমার কাছে যা বলে এলে, তা সত্যি কী না দেখবার জন্যে!
সর্দারের মুখ দেখে মনে হল, সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না! খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বললে, হুজুর অমন কাজ করবেন না। নদীর ধারে আজ জুজুর অভিশাপ জেগে উঠেছে, জ্যান্ত মানুষ সেখানে গেলে আর ফিরবে না। আজ সেখানে একলা গেলে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত!
কেন, একলা কেন, তুমিই আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলো–কোনও ভয় নেই।
সর্দার আঁতকে উঠে বললে, আমি যাব আপনার সঙ্গে? বলেন কী হুজুর। আমি তো পাগল হইনি! ঘরে আমার বউ-ছেলে আছে, আমি কি শখ করে আত্মহত্যা করতে পারি?
বেশ, তুমি যেয়ো না। কিন্তু নদীর কোন পথে তুমি সেই ব্যাপারটা দেখেছিলে?
সর্দার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে, এই সামনের পথ দিয়েই চলে যান। নদী খুব কাছেই। কিন্তু হুজুর, এখনও আমার কথা শুনুন, মানুষ হয়ে জুজুর সামনে যাবেন না।
