গুহাটা ছোট। কিন্তু কী ভীষণ স্থান! মাথার ওপরে কালো পাথর, আশেপাশে কালো পাথর, পায়ের তলায় কালো পাথর–আর তাদের গায়ে মাখানো কালো অন্ধকার! সেই কালোর ঘরে চারিদিকে বিশ্রী ভয়াবহ ভাব সৃষ্টি করে মেঝের ওপরে সাদা ধবধবে যে জিনিসগুলো পড়ে রয়েছে, সেগুলো মাংসহীন হাড় ছাড়া আর কিছুই নয়! হয়তো তার ভিতরে মানুষেরও হাড়ের অভাব নেই!
মানুষের কথা মনে হতেই আর একটা জিনিস আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে।
গুহার কোণে হাড়ের রাশির সঙ্গে কালো রঙের কী একটা পড়ে রয়েছে। বন্দুকের নল দিয়ে নেড়েচেড়ে বোঝা গেল সেটা একটা জামা ছাড়া আর কিছুই নয়।
জামা! কোট! তাহলে এ সিংহটার মানুষ খাওয়ার অভ্যাস ছিল।
বন্দুকের সাহায্যে কোটটাকে ওপরে তুলতেই কী একটা জিনিস তার ভিতর থেকে মাটিতে পড়ে গেল।
হেঁট হয়ে দেখি, একখানা পকেট বই! সিংহের আক্রমণে যার প্রাণের প্রদীপ নিবে গেছে, নিশ্চয়ই এটি সেই হতভাগ্যেরই সম্পত্তি!
খুব সম্ভব এটি কোনও শ্বেতাঙ্গ শিকারির জিনিস। ওর ভিতরে হয়তো তার পরিচয় লেখা আছে, এই ভেবে আমি পকেট বইখানা কৌতূহলী হয়ে কুড়িয়ে নিলুম।
পকেট বইখানা খুলে, তার ওপরে টর্চের আলো ফেলেই চমকে উঠলুম!
এর পাতায় পাতায় যে বাংলাতে অনেক কথা লেখা রয়েছে।
আমার মন বিপুল বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল! কোথায় বাংলাদেশ, আর কোথায় উগান্ডার সিংহ-বিবর! ঘরমুখো বাঙালি এতদূরে ছুটে এসেছে নিষ্ঠুর সিংহের ক্ষুধার খোরাক। জোগাবার জন্যে!
তার পরেই মনে হল,–এ ব্যাপারে আর যে কেহ অবাক হতে পারে, কিন্তু আমার আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। কারণ, আমিও তো বাঙালি–এবং আমিও তো আজকেই সিংহের খোরাক হলেও হতে পারতুম! তারপর ওই হতভাগ্যের মতন আমারও হাড়গুলো হয়তো এখানকার অস্থিস্তূপকে আরও কিছু উঁচু করে দিত। সে হাড়গুলো দেখে কেউ আমার কোনও পরিচয়ই জানতে পারত না!
সেই ভীষণ গুহার হিংসার ও হত্যার গুহার এবং তার সামনেকার জঙ্গলের ভিতর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে বাইরের খোলা হাওয়ায় এসে দাঁড়ালুম।
তার পরেই মনে পড়ল কাফ্রিদের ভয়ের কথা শিকারের উত্তেজনায় এতক্ষণ যে কথা ভুলে গিয়েছিলুম!
ওরা এই পাহাড়টাকে জুজু পাহাড় নাম দিয়েছে! কেন? ওরা বলে, এখানে যারা থাকে, তাদের দেখলেই মানুষ মরে যায়। কেন? এ মুল্লুকের কোনও মানুষই এ পাহাড়ের ত্রিসীমানায় আসে না। কেন?
তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে তাকিয়ে এইসব কেনর জবাব খোঁজবার চেষ্টা করলুম। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই আবিষ্কার করতে পারলুম না। নির্জন পথ, নির্জন পাহাড়, নির্জন অরণ্য! নিস্তব্ধতা ও নির্জনতার ওপরে ধীরে ধীরে গোধুলির ম্লান আলো নেমে আসছে! এই নিস্তব্ধতা ও নির্জনতা কেমন অস্বাভাবিক বলে মনে হল। তা ছাড়া আমার মনে কোনওরকম ভয়ের ভাবই জাগল না।
সন্ধ্যা আসছে,এখানে আর অপেক্ষা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। তাড়াতাড়ি পাহাড় থেকে নেমে এলুম।
কাফ্রিদের সর্দারের মুখের ভাব দেখেই বুঝলুম, আমি যে আবার ফিরে আসব, এ আশা সে করেনি!
আমি হেসে বললুম, সর্দার, আমার মুখের পানে অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছ কেন? ভয় নেই, এখনও আমি ভূত হয়নি!
সর্দার খুব ভীত কণ্ঠে খুব মৃদুস্বরে বললে, আপনি তাদের দেখেছেন?
কাদের?
যারা মানুষ নয়?
হ্যাঁ, মানুষ নয় এমন জীবকে আমি দেখেছি বটে!
সর্দার ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল, তার মুখ দিয়ে আর কথা বেরুল না!
তার ভাব দেখে আমি হো-হো করে হেসে উঠে বললুম, হ্যাঁ সর্দার! মানুষ নয় এমন একটা জীবকে আমি সত্যিই দেখেছি–আর সে জীবটা হচ্ছে আমাদেরই সেই আহত সিংহটা। একটা গুহার ভেতরে সে মরে কাঠ হয়ে আছে।
সর্দারের যেন বিশ্বাস হল না। থেমে থেমে বললে, আর কিছুই দেখেননি হুজুর?
কিছু না কিছু না–একটা নেংটি ইঁদুর পর্যন্ত না!
সর্দার তখন আশ্বস্ত হয়ে বললে, তাহলে আপনি ভাগ্যবান পুরুষ। ও পাহাড়ে যারা যায়, তারা আর ফেরে না।
আমি বললুম, আচ্ছা সর্দার, বলতে পারো, আমার আগে ও পাহাড়ে আর কোনও বাঙালি কখনও গিয়েছিল?
হ্যাঁ হুজুর, গিয়েছিল। ঠিক এক বছর আগে! আমিই তাকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিলুম। আপনার মতন সেও আমার কথা শোনেনি। আমার মানা না মেনেই সেই বাবু ওই পাহাড়ের ভেতরে যায়। কিন্তু সে বাবু আর ফিরে আসেনি।
আমি বললুম, কেমন করে সে ফিরবে? তার হাড় সে সিংহের গর্তের ভিতরে পড়ে রয়েছে!
কিন্তু সেই বাঙালিবাবুর প্রাণ গেছে যে সিংহের কবলে, সর্দার একথা বিশ্বাস করতে চাইলে না। সে শয়তান, জুজু ও আরও কত কী নাম করে নানান কথা বলতে লাগল– কিন্তু সেসব কথায় আমি আর কান পাতলুম না।
পকেটবুকখানা এখন আমার পকেটেই আছে। ঠিক করলুম ক্যাম্পে ফিরেই সেখানা ভালো করে পড়ে মৃত বাঙালিটির পরিচয় জানবার চেষ্টা করব।
আহা, বেচারি! হয়তো তার মৃত্যু সংবাদ এখনও তার আত্মীয়স্বজনরা জানতেও পারেনি।
.
চতুর্থ । পিপের চোখ
খাওয়াদাওয়ার পর রাত্রে ক্যাম্প খাটে শুয়ে সেই পকেটবুক বা ডায়ারিখানা পড়তে শুরু করলুম।
যতই পড়ি, অবাক হয়ে যাই! এ এক অদ্ভুত, বিচিত্র, অমানুষিক ইতিহাস বা আত্মকাহিনি, গোড়ার পাতা পড়তে আরম্ভ করলে শেষ পাতায় না গিয়ে থামা যায় না। এমন আশ্চর্য কাহিনি জীবনে আর কখনও আমি শুনিনি–শুনব বলে কল্পনাও করিনি!
