যাক, মহারাজার কবল থেকে মুক্তিলাভ করে আমরাও যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি। তাকে কোনও খবর না দিয়েই সরে পড়েছি। কেবল মি. গাঙ্গুলিকে চুপিচুপি বলে এসেছি, সতীশবাবু ছুটি পেয়ে চেঞ্জে যাচ্ছেন, তার সঙ্গে আমরাও দু-চার দিনের জন্যে হাওয়াটা একটু বদলে আসছি।
গাঙ্গুলি অত্যন্ত দমে গিয়ে বললেন, আঁা, এই দুঃসময়ে একলা আমাকে মহারাজার খপ্পরে ফেলে আপনারা দেবেন পিঠটান? আমার অবস্থাটা কী হবে ভেবে দেখেছেন কি?
আমাদের ভাববার দরকার নেই। জীবের স্বধর্ম আত্মরক্ষা করা। আপনিও আত্মরক্ষা করুন।
আর দুর্জয়গড়ের মামলা?
মহারাজকে বলুন, টাকা দিয়ে যুবরাজকে ফিরিয়ে আনতে। আমরা দু-চারদিনে পরেই এসে আসামিকে ধরবার চেষ্টা করব।
গাঙ্গুলি গজগজ করতে করতে চলে গেলেন, আসামির কথা নিয়ে আপনারা মাথা ঘামাতে চান, ঘামাবেন। আমার আর সহ্য হচ্ছে না। এ-চাকরি আমি ছেড়ে দেব-বাপ!
যথাসময়ে সদলবলে কলকাতায় ধুলো-ধোঁয়া ধুমধাড়াক্কা পিছনে ফেলে শহর-ছাড়া বিজন পথে এগিয়ে চললুম।
রাত-আঁধারে চুপিচুপি কালো জলে ভাসল আমাদের দুই নৌকো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনাই ঘটেনি–এমনকী আমরা যে-কোনও অপ্রীতিকর ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করিনি, এ-বিষয়েও কিছুমাত্র সন্দেহ নাস্তি।
জনতার সাড়া নেই, তীরতরুর মর্মর-ছন্দে তাল রেখে বনবাসী বাতাস শোনায় স্নিগ্ধ মাটির আর ঘন-সবুজের গন্ধমাখানো নতুন নতুন গান এবং নদীর জলসায় জলে জলে দুলে দুলে ওঠে কূল-হারানো গতি-বীণার তান। কান পেতে শুনলে মনে হয়, অনন্ত নীলাকাশও তার লুকিয়ে রাখা নীরব বীণার রন্ধ্রে জাগিয়ে তুলছে কল্পলোকের কোন মৌন-রাগিণীর আলাপ! পৃথিবীর ধুলোর ঠুলিতে যার কান কালা, এ অপূর্ব আলাপ সে শুনতে পায় না তাই এর মর্ম বোঝে, শুধু কবি আর শিশু, ফুলপরি আর পাপিয়া!
এই শীতের ঠান্ডা রাতের সঙ্গে আজ পাপিয়ারা ভাব করতে আসেনি! ফুলপরিরাও কোন তীরে কোনও বনে কোন শিশির-ভিজানো বিছানায় ঘুমিয়ে আছে আর ঠিকানা জানি না, কিন্তু আমার মনের ভিতরে জাগল চিরন্তন শিশুর উল্লাসকলরোল।
নৌকো চলেছে অন্ধকারের কালো-চাদরে গা মুড়ে,–চলেছে নৌকো। দাঁড়ে-দাঁড়ে তালে তালে বাজিয়ে চলেছে নৌকো জলতরঙ্গ-বাজনা। দুকুলের কাহিনি ভুলিয়ে, সামনে অকূলের ইঙ্গিত জাগিয়ে চলেছে নৌকো, ঘুমের দেশে ঘুম-ভাঙানো সংগীতের সুর বুনতে-বুনতে।
তারপর। চাঁদ উঠল দূর-বনের ফাঁকে। মনে হল, পূর্ণপ্রকাশের আগে যেন গাছের ঝিলিমিলির আড়াল থেকে চাঁদ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে নিতে চায়, পৃথিবীর উৎসব-আসরে আজ কত দর্শকের সমাগম হয়েছে!
ছড়িয়ে দিলে কে জলে-জলে মুঠো-মুঠো হিরের কণা! ওপারে নজর চলে না, এপারে দেখা যায় নীল-স্বপ্নমাখানো বন আর বন! কত কত দূর থেকে কোন একলা-পথিকের বাঁশের বাঁশির মৃদু মেঠো-সুর ভেসে আসে যেন আমাদের সঙ্গে কথা কইতে। চাঁদ উঠছে উপরে– আরও উপরে। তার মুখে শীতের মেয়ে কুহেলিকার আদর-মাখা চুমোর ছোঁয়া! যত রাত হয় নদীর আমোদ বাড়ে তত–তার জলের নুপুর বাজে তত জোরে!
দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে অবশেষে জড়িয়ে এল আমার চোখের পাতা।
.
দ্বাদশ । দ্বীপ।
জামিরা নদী। এটা কি নদী, না সমুদ্র?
চেষ্টা করে দেখলে বহুদূরে চোখে পড়ে তীরের ক্ষীণ রেখা। কোনও কোনও দিকে তাও নেই–সেখানে অনন্ত আসন জুড়ে বসেছে অসীম শূন্যতা।
জলে নেই মাটির রং। সমুদ্রের রঙের আভাসে জল-বসন ছুবিয়ে জামিরা চাইছে নতুন রঙে রঙিন হতে।
জলিল উঠে দাঁড়িয়ে বললে, উই! উই সেই দ্বীপ কর্তা, উই সেই দ্বীপ!
আমি শুধলুম, হ্যাঁ জলিল, ও দ্বীপের নাম কি?
জানি না তো!
জানো না?
ও-দ্বীপের নাম নেই।
ঝোপ-জঙ্গল, বড় বড় গাছ। দ্বীপের দিকে তাকালে আর কিছু দেখা যায় না–আর কিছু দেখবার আশাও আমরা করিনি।
হেমন্ত বললে, ওখানে নৌকো লাগাবার ঘাট আছে?
জলিল মাথা নেড়ে জানালে, না!
যারা তোমায় এখানে নিয়ে আসে, তারা কোথায় নামে?
জলিল আবার মাথা নাড়ে। অর্থাৎ তারও কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই!
আমরা যেখানে খুশি নামব?
হ্যাঁ কর্তা।
আমাদের নৌকো দুখানা দ্বীপের খুব কাছে এসে পড়ল।
সতীশবাবু বললেন, দ্বীপটা কত বড়, তাও তো বুঝতে পারছি না! ওই নিবিড় জঙ্গলের ভেতরে আসল জায়গাটা খুঁজে বার করতে কতক্ষণ লাগবে, কে জানে!
পরে পরে দুখানা নৌকোই তীরে এসে লাগল। প্রথম নৌকোয় ছিলুম আমরা তিনজন– অর্থাৎ আমি, হেমন্ত আর সতীশবাবু। অস্ত্রশস্ত্র, রসদ ও অন্যান্য সমস্ত মালই ঠাসা ছিল আমাদের নৌকোতেই। দ্বিতীয় নৌকোয় ছিল একজন ইনস্পেক্টার, একজন সাব-ইনস্পেক্টার, একজন জমাদার ও আট জল মিলিটারি-পাহারাওয়ালা।
তখন অপরাহ্ন কাল–চারিদিকে সমুজ্জ্বল সূর্যকিরণ। পথের অভাবে খুব বেশি অসুবিধায় পড়তে হল না, জঙ্গলের আশপাশ দিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে পাওয়া গেল একটা মাঠ, লম্বায় চওড়ায় আধ-মাইলের কম হবে না। চারিদিকেই তার উঁচু বনের প্রাচীর।
কিন্তু মানুষের চিহ্ন কোথাও নেই। গাছপালায় বাতাসের নিশ্বাস আর বনে বনে পাখিদের ডাক ছাড়া একটা অমানুষিক নিস্তব্ধতা সর্বত্র এমন একটা অজানা ভাবের সৃষ্টি করেছে যে, এ-দ্বীপ কখনও মানুষের কণ্ঠ শুনেছে বলে মনে হয় না।
সতীশবাবু জমাদারকে ডেকে বললেন, সুজন সিং, যেখান দিয়ে যাচ্ছি ভালো করে চিনে রাখো। কারুর সঙ্গে দেখা না হলে ফিরতে হবে, আবার কারুর সঙ্গে দেখা হলেও
