হ্যাঁ রবীনবাবু, এসব কি সত্যি? হরি আর হরের মতো আপনিও কি একসঙ্গে কবি আর cook?
আমি বললুম, হেমন্তের অত্যুক্তির কথা ছেড়ে দিন–ওর জীবনের সেরা আনন্দ হচ্ছে আমাকে নিয়ে রঙ্গ-ব্যঙ্গ করা। কিন্তু কবি আর লেখকরা যে রাঁধতে জানেন না, আপনার এমন বিশ্বাস কেন হল? ফ্রান্সের বিখ্যাত লেখক আলেকজান্ডার ডুমার নাম শুনেছেন?
ওই যিনি মন্টি ক্রিস্টো আর থ্রি মাস্কেটিয়ার্স লিখেছেন?
হ্যাঁ। তার এক হাতে থাকত কলম, আর এক হাতে হাতা। একসঙ্গে তিনি মনের আর দেহের প্রথম শ্রেণির খোরাক জোগাতে পারতেন!
ঠিক এই সময় আবার একখানা মোটর আমাদের বাড়ির দরজায় এসে থামল, সশব্দে। তারপরেই দ্রুতপদে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন মিঃ গাঙ্গুলির দৃষ্টি উদভ্রান্ত।
সতীশবাবু বললেন, মিঃ গাঙ্গুলি, আপনার মুখ-চোখ অমনধারা কেন?
গাঙ্গুলি বললেন, আপনাকে আমি চারিদিকে খুঁজে-খুঁজে বেড়াচ্ছি, আর আপনি কিনা, এখানে বসে ষড়যন্ত্র করছেন!
সতীশবাবু বললেন, ভুল হল মিঃ গাঙ্গুলি! পুলিশ ষড়যন্ত্র করে না, ষড়যন্ত্র ধরে! কিন্তু আপনাকে দেখে যে বিপদগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে!
গাঙ্গুলি একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ে বললেন, বিপদ বলে বিপদ। মহারাজাবাহাদুর একেবারে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন!
কেন, কেন?
হেমন্তবাবু, শেষটা আপনার কথাই সত্যি হল! হেমন্ত বিস্মিতকণ্ঠে বললে, আমার কথা সত্যি হল? সে আবার কী?
চোর ব্যাটারা পনেরো লক্ষ টাকার দাবি করে মহারাজাবাহাদুরকে বিষম এক পত্রাঘাত করেছে! ব্যাটারা খালি চোর নয়–গুন্ডা, খুনে, ডাকু!
সতীশবাবু লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ!
হেমন্ত কোনওরকম বিস্ময় প্রকাশ করলে না। খালি বললে, চিঠিখানা কোথায়?
এই যে, আমার কাছে। পকেট থেকে পত্র বার করে তিনি হেমন্তের হাতে দিলেন।
হেমন্ত চেঁচিয়ে ইংরেজিতে টাইপ করা যে চিঠিখানা পড়লে, তার বাংলা মানে দাঁড়ায় এই :
মহারাজাবাহাদুর,
যুবরাজকে যদি ফেরত চান তাহলে আগামী চব্বিশ তারিখে আমাদের দূতের হাতে পনেরো লক্ষ টাকা অর্পণ করবেন।
চব্বিশ তারিখে রাত্রি ঠিক বারোটার সময়ে গড়িয়াহাটা লেকের লেক ক্লাবের পিছনকার রাস্তায় আমাদের দূত অপেক্ষা করবে।
কিন্তু সাবধান, যদি পুলিশে খবর দেন, কিংবা আমাদের দূতকে ধরবার বা তার পিছনে আসবার চেষ্টা করেন, তাহলে আমরা যুবরাজকে হত্যা করতে বাধ্য হব।
পনেরো লক্ষ টাকা আমাদের হস্তগত হওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে। যুবরাজকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে পাবেন। আমরা টাকা না পেলে যুবরাজের জীবনাশঙ্কা আছে।
ইতি–
সতীশবাবু বললেন, প্রায় একই-রকম চিঠি। কেবল এখানা ইংরেজিতে লেখা আর টাইপ করা।
বিষম চমকে উঠে গাঙ্গুলি বললেন, ও বাবা, এরকম আরও চিঠি আপনারা পেয়েছেন নাকি?
হেমন্ত বললে, হ্যাঁ। এমনি এক চিঠি লিখে ভয় দেখিয়ে ছেলেধরারা শ্যামলপুরের জমিদারেরও কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে গেছে।
আর আপনারা হাত গুটিয়ে সঙের মতন দাঁড়িয়ে রইলেন?
সতীশবাবু বললেন, চোরের শর্তগুলো ভুলে যাচ্ছেন কেন? আমাদের কি হাত বার করবার উপায় আছে?
হুঁ, তাও বটে–তাও বটে! একটু গোলমাল করলেই ছুঁচোরা আবার ছেলে খুন করব। বলে ভয় দেখায়! তা পারে, বেটারা সব পারে–গুন্ডা, খুনে, ডাকু! এই এক চিঠিই আমাদের অতবড় মহারাজাবাহাদুরকে একদম কাত করে দিয়েছে–যাকে বলে প্রপাত ধরণীতলে আর কি!
সতীশবাবু বললেন, আজ ষোলোই। আর সাতদিন পরেই চব্বিশ।
হেমন্ত বললে, মহারাজা কি করবেন স্থির করেছেন? পুলিশে যখন খবর দিয়েছেন, তাঁর কি টাকা দেওয়ার ইচ্ছে নেই?
গাঙ্গুলি দুই চেখ বড় করে বললেন, ইচ্ছে? এক কথায় পনেরো লক্ষ টাকা জলে দেওয়ার ইচ্ছে হবে আমাদের মহারাজার? বলেন কি মশাই? কিন্তু এখন তাকে দেখলে আপনাদের দুঃখ হবে। একসঙ্গে ছেলে হারাবার আর টাকা হারাবার ভয়ে একেবারে তিনি ভেঙে পড়েছেন, কী করবেন বুঝতে না পেরে আপনাকে আর সতীশবাবুকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন।
সতীশবাবু বললেন, আমরা যাচ্ছি বটে, কিন্তু দিতে পারি খালি এক পরামর্শ। যুবরাজকে বাঁচাতে হলে টাকা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
কথাটা গাঙ্গুলির মনের মতো হল না। মাথা নেড়ে বললেন, না মশাই, ও-পাপীদের কথায় বিশ্বাস নেই। তারপর অতগুলো টাকা হাতিয়েও যুবরাজকে যদি ছেড়ে না দেয়?
হেমন্ত বললে, তবু ওদের কথামতোই কাজ করতে হবে।
.
একাদশ
ইস্টকময়ী কলিকাতা-নগরীর কঠোর বুকের ভিতর থেকে একেবারে এসে পড়েছি নদীর কল সঙ্গীতে জীবন্ত প্রকৃতির কোলে। চিরদিন কাব্যচর্চা করি। এখানে এসে মনে হচ্ছে, ফিরে এসেছি যেন স্বদেশে।
এর মধ্যে বলবার মতন ঘটনা কিছুই ঘটেনি। যতক্ষণ কলকাতায় ছিলুম, মহারাজাবাহাদুরের হাহুতাশ-বাণী বহন করে মিঃ গাঙ্গুলি এসে আক্রমণ করেছেন বারংবার এবং কালকের ও আজকের দুপুরের মধ্যে হেমন্তকে বাধ্য হয়ে রাজবাড়িতে ছুটতে হয়েছে পাঁচবার। মহারাজের কথা কিন্তু সেই একই : হয় লাখ-পাঁচেক টাকার বিনিময়ে যুবরাজকে ফিরিয়ে আনবার ব্যবস্থা করো, নয় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে যুবরাজকে উদ্ধার করে–পঁচিশ হাজার টাকা পুরস্কারের উপরেও আমি দেব আরও পঁচিশ হাজার টাকা।
মাঝখানে পড়ে গাঙ্গুলি-বেচারার অবস্থা যা হয়েছে। তাঁকে দেখলে দুঃখ হয়। তিনি হচ্ছেন ফিটফাট ব্যক্তি, ইস্তিরি করা পোশাকের প্রতি ভাঁজটি পর্যন্ত অটুট রেখে চলা-ফেরা ওঠা-বসা করেন পরম সাবধানে এবং জামার বোতাম-ঘরে থাকে সর্বদাই একটি করে টাটকা ফুল! কিন্তু ভীষণ অধীর মহারাজাবাহাদুরের ঘন ঘন হুমকি বা হুকুমের চোটে দিকবিদিক জ্ঞানহারার মতন দৌড়ধাপ করে করে মি. গাঙ্গুলির পোশাকের ইস্তিরি গেছে নষ্ট হয়ে এবং বোতামের ফুল গিয়েছে কোথায় ছিটকে পড়ে! যতবারই দেখেছি, ততবারই তিনি হাঁপাচ্ছেন এবং এই শীতেও রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলছেন, পাগলা-রাজার পাল্লায় পড়ে আত্মারাম বুঝি খাঁচা ছাড়া হয়–এ-চাকরি আমার পোষাবে না মশাই, পোষাবে না!
