নিশ্চয়। সে-খবরটাও আজ দিতে এসেছি। জবর খবর!
বলেন কী–বলেন কী? ঝাড়ুন আপনার জবর খবরের ঝুলি!
হেমন্তের উৎসাহ দেখে সতীশবাবুর ম্লান ভাবটা মুছে গেল ধীরে ধীরে। তিনি বললেন, এ খবরটা যে পেয়েছি তারও মূলে আছেন আপনি, কারণ এদিকেও আপনি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
হেমন্ত বলে উঠল ওহো, বুঝেছি!
না, কখনও বোঝেননি!
নিশ্চয় বুঝেছি!
কী করে বুঝলেন?
অনুমানে।
কী বুঝেছেন?
ক্যানিংয়ের এক মাঝির খোঁজ পেয়েছেন?
ঠিক!
জানি। কলকাতায় পাখির খাঁচা যখন খালি, জবর খবর আসতে পারে তখন কেবল ক্যানিং থেকেই।
তাই। খবরটা পেয়েছি কাল রাতেই।
খবরটা শুনি।
পুলিশ খোঁজাখুঁজি করে জলিল নামে এক বুড়ো মাঝিকে বার করেছে। সে নাকি আজ তিনমাসের ভিতরে চারবার এক-একদল লোককে নিয়ে সমুদ্রের মুখে জামিরা নদীর একটা দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। আবার আসবার সময়ে ওই দ্বীপ থেকেও যাত্রী তুলে এনেছে।
তারা যে সন্দেহজনক ব্যক্তি, এটা মনে করছেন কেন?
তারও কারণ আছে। প্রথমত, জলিল বলে, ও-অঞ্চলে সে আগেও গিয়েছে, কিন্তু ওই দ্বীপে যে মানুষ থাকে এটা তার জানা ছিল না। দ্বিতীয়ত, লোকগুলো যতবার গিয়েছে এসেছে, ততবারই তাকে প্রচুর বখশিশ দিয়ে বলেছে, তাদের কথা সে যেন আর কারুর কাছে প্রকাশ না করে। এটা কি সন্দেহজনক নয়?
এ প্রমাণ সন্দেহজনক হলেও খুব বেশি সন্তোষজনক নয়।
শুনুন, আরও আছে। গত দোসরা তারিখে দুর্জয়গড়ের যুবরাজ হারিয়ে গেছেন, একথা মনে আছে তো? তেসরা তারিখের খুব ভোরে–অর্থাৎ সূর্যোদয়ের আগেই চারজন লোক জামিরা নদীর ওই দ্বীপে যাওয়ার জন্যে জলিলের নৌকো ভাড়া করে। তাদের সঙ্গে ছিল। একটি বছর-চার বয়সের সুন্দর শিশু। জলিল বলে, শিশুটি ঘুমোচ্ছিল আর সারা পথ সে। তার সাড়া পায়নি, নৌকোর ভিতরেই তাকে লেপ চাপা দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। নৌকোর যাত্রীরা জলিলকে বলেছিল, শিশু অসুস্থ। কিন্তু আমার বিশ্বাস তাকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছিল কোনওরকম ঔষধ প্রয়োগেই। …কি বলেন হেমন্তবাবু, ওই শিশুই যে দুর্জয়গড়ের যুবরাজ, একথা কি আপনার মনে লাগে?
হেমন্তের মুখের ভাবান্তর হল না। সে মিনিট তিনেক স্থির হয়ে বসে রইল নিবাতনিষ্কম্প দীপশিখার মতো। তারপর আচম্বিতে আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে সতীশবাবুর একখানা হাত সজোরে চেপে ধরে বললে, উঠুন–উঠুন, এইবারে চাই action!
সতীশবাবু আর্তস্বরে বললেন, আরে মশাই, হাত ছাড়ুন–হাত ছাড়ুন, গেল যে! হাতখানার দফা-রফা হল যে!
হেমন্ত তাড়াতাড়ি সতীশবাবুর হাত ছেড়ে দিলে।
সতীশবাবু হাতখানা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, ওঃ! আপনারা দুই বন্ধু যে ভদ্র-গুন্ডা, তা আমি জানি মশাই, জানি! কুস্তিতে, বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, তাও খবরের কাগজে পড়েছি। কিন্তু যত তাল আমার ওপরে কেন, আমি কি জামিরা নদীর মোহনদ্বীপের ছেলে-ধরা?…কি রবীনবাবু, মুখ টিপে টিপে হাসা হচ্ছে যে বড়? আপনিও এগিয়ে আসুন না, action বলে গর্জন করে আমার আর-একখানা হাত ভেঙে দিন না!
আমি হেসে ফেলে বললুম, ও-অভিপ্রায় আমার আছে বলে মনে হচ্ছে না!
হেমন্ত লজ্জিতমুখে বললে, ক্ষমা করবেন সতীশবাবু, মনের আবেগটা আমার হাত দিয়ে বেরিয়ে গেল!
বাপ! ভবিষ্যতে মনের আবেগ মনের মধ্যেই চেপে রাখলে বাধিত হব।…হ্যাঁ, এখন কি বলতে চান, বলুন! কিন্তু কাছে আসবেন না, আপনি উত্তেজিত হয়েছেন!
হেমন্ত বললে, আজই মোহনদ্বীপের দিকে নৌকো ভাসাতে হবে!
.
দশম । শাপভ্রষ্ট দ্রৌপদী
সতীশবাবু একটু ভাবলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, তা হয় না হেমন্তবাবু।
কেন হয় না?
কেবল যে যাত্রার আয়োজন করতে হবে, তা নয়। আমার হাতে আরও গুরুতর কাজ আছে, সেগুলোর ব্যবস্থা না করে আমার কলকাতা ছাড়া অসম্ভব!
তবে কবে যেতে পারবেন?
চেষ্টা করলে কাল যেতে পারি।
বেশ, তাই। কিন্তু সঙ্গে বেশি লোকজন নেবেন না।
যাচ্ছি বাঘের বাসায়, বেশি লোকজন নেব না মানে?
অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট। শত্রুদেরও চর থাকতে পারে, তারাও আমাদের ওপরে যে নজর রাখছে না, একথা বলা যায় না। একটা বিপুল জনতা যদি ক্যানিংয়ের ওপরে ভেঙে পড়ে, তাহলে মোহনদ্বীপেও গিয়ে হয়তো দেখব, পাখিরা বাসা ছেড়ে উড়ে পালিয়েছে!
সেকথা সত্যি। কিন্তু দলে হালকা হয়েও সেখানে যাওয়া তো নিরাপদ নয়! কে জানে তারা কত লোক সেখানে আছে?
ভারে কাটার চেয়ে ধরে কাটা ভালো। আমরা কাল রাতের অন্ধকারে গা ঢেকে জন-বারো লোক মিলে দুখানা নৌকোর চেপে যাত্রা করব। আপনি সেই ব্যবস্থা করুন। সঙ্গে যাদের নেবেন তারা যেন বাছা-বাছা হয়। অবশ্য সকলকেই সশস্ত্র হয়ে যেতে হবে।
কিন্তু চাকর-বামুনও তো নিয়ে যাওয়া দরকার? আমাদের কাজ করবে কে?
চাকর-বামুন? খেপেছেন নাকি? আমরা নিজেরাই হব নিজেদের চাকর, আর রান্নার ভার নেবে, রবীন।
রবীনবাবু? উনি তো কবি, খালি কলম নাড়েন, হাতা-খুন্তি নাড়বার শক্তি ওঁর আছে নাকি?
ভয় নেই সতীশবাবু, হাতা-খুন্তি নেড়ে রবীন যে হাঁড়ি কড়ার ভেতরেই বস্তুহীন কবিতা রচনার চেষ্টা করবে না, সেকথা আমি জোর-গলায় বলতে পারি। রবীনকে চেনেন না বলেই আপনি এত ভাবছেন! কিন্তু ও খালি গোলাপফুল দেখে গোলাপি ছড়া বাঁধে না, কুমড়ো ফুল চয়ন করে বেসম সহযোগে ফুলুরি বানাতেও ও কম ওস্তাদ নয়! ও বোধহয় সাপভ্রষ্ট দ্রৌপদী, পুরুষ দেহ নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে মর্ত্যধামে!
