তুমি সাঙ্কেতিক শব্দে লেখা সেই বিজ্ঞাপনটার কথা বলছ বোধ হয়?
হ্যাঁ। এ মামলায় সেইটেই হচ্ছে starting point, দৈব যদি আমার সহায় হয়ে ওই সূত্রটাকে এগিয়ে না দিত, তাহলে আমি এ-মামলার কিনারা করবার কোনও আশাই করতে পারতুম না। খালি বুদ্ধি আর তীক্ষ্ণদৃষ্টি থাকলেই হয় না রবীন, সেইসঙ্গে চাই দৈবের দয়া। তুমি দেখে নিও, এই মামলার অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রধান প্রমাণ হবে সেই সাঙ্কেতিক বিজ্ঞাপনটাই।
অপরাধী যে ধরা পড়বে, এবিষয়ে তোমার কোনও সন্দেহই নেই?
এক তিলও না। যে-কোনও দেশের পুলিশের দপ্তর দেখলে তুমি আর-একটা সত্যকথা জানতে পারবে।
কী?
অতিরিক্ত চালাকি দেখাতে গিয়ে আজ পর্যন্ত কত বড় বড় অপরাধী পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। ধরো, এই ছেলে-চোরের কথা। ডাকঘরের সাহায্য নিলে আমাদের পক্ষে আজ একে আবিষ্কার করা অসম্ভব হত। ডাকের চিঠিতেও সে সাঙ্কেতিক শব্দ ব্যবহার করতে পারত, সে চিঠি ভুল ঠিকানায় গেলে বা পুলিশের হাতে পড়লেও খুব-সম্ভব কেউ তার পাঠোদ্ধার করবার চেষ্টা করত না।
ঠিক এই সময়ে রাস্তায় মোটর দাঁড়ানোর শব্দ হল। অনতিবিলম্বে ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়ালেন সতীশবাবু–চোখে-মুখে তার হাসির উচ্ছ্বাস!
কী মশাই, খবর কি? কেল্লা ফতে!
.
নবম । সর্দারের বাহাদুরি
হেমন্ত বললে, কেল্লা ফতে কীরকম? আপনি কি আসল আসামিকেও ধরে ফেলেছেন?
সতীশবাবু বললেন, পাগল! নিজের দিক না সামলে ভীমরুলের চাকে হাত দি কখনও?
তবে?
তাদের আড্ডা আবিষ্কার করেছি।
কী করে?
আপনার ফন্দিটা কাজে লাগিয়ে। হেমন্তবাবু, এমনই নবনবউন্মেষশালিনী বুদ্ধি দেখিয়েই তো আপনি আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছেন। আপনার ফন্দিটা কাজ করেছে ঘড়ির কাঁটার মতো, চোরেদের দূত কোনও সন্দেহ করতে পারেনি।
ফন্দিটা আমার নয় সতীশবাবু, ওটা আমি শিখে এসেছি বিলাত থেকে। কিন্তু যাক সে কথা। এখন আপনার কথা বলুন।
সতীশবাবু টুপি খুলে বসে পড়ে বললেন, ওদের দূত যথাস্থানেই এসেছিল।
তারপর সে টাকা নিয়েছে?
হ্যাঁ। তারপর আমাদের চরনা, চর বললে ঠিক হবে না–চরেরা তার পিছু নেয়।
সে কোনদিকে যায়?
রসা রোড ধরে আসে উত্তর দিকে। তারপর প্রায় রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের মোড়ের কাছে এসে একখানা মস্ত বাড়ির ভিতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়।
বাড়িখানার উপরে পাহারা বসিয়েছেন তো?
নিশ্চয়! বাড়িখানার নাম মনসা ম্যানস–অন্ধকার, বাহির থেকে মনে হয় না ভিতরে মানুষ আছে।
যে লোকটা এসেছিল তাকে দেখতে কেমন?
রাতে ভালো করে তার চেহারা দেখা যায়নি। তবে সে খুব লম্বা-চওড়া আর তার পোশাক হিন্দুস্থানীর মতো।
এইবার গোপনে সন্ধান নিতে হবে যে, ও-বাড়িতে কে থাকে। তারপর–।
টেলিফোনের ঘণ্টা বেজে উঠল। নিজের কথা অসমাপ্ত রেখেই হেমন্ত উঠে গিয়ে রিসিভার নিয়ে মুহূর্ত-পরে মুখ ফিরিয়ে বললে, সতীশবাবু, থানা থেকে আপনাকে ডাকছে।
সতীশবাবু রিসিভার নিয়ে বললেন, হ্যালো! হ্যাঁ, আমি।…কি বললে? আঁ, বলো কী? বলো কী? তিনি অভিভূতের মতন আরও খানিকক্ষণ থানার কথা শুনলেন, তারপর বদ্ধ-স্বরে আচ্ছা বলে রিসিভারটা রেখে দিয়ে যখন আবার আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর চোখের আলো নিভে গেছে এবং ভাবভঙ্গি একেবারে অবসন্নের মতো।
হেমন্ত একবার তীক্ষ্ণ-দৃষ্টিতে সতীশবাবুর মুখের পানে তাকালে, কিন্তু কিছু বললে না।
সতীশবাবু ধপাস করে চেয়ারের উপরে বসে পড়ে করুণ স্বরে বললেন, হেমন্তবাবু, খাঁচা খালি–পাখি নেই!
পাখি উড়ল কখন?
তিক্তকণ্ঠে সতীশবাবু বললেন, আরে মশাই, পাখি ধরতে গিয়েছিলুম আমরা খালি খাঁচায়! আজ সকালে আমাদের চর খবর নিয়ে জেনেছে যে, মনসা-ম্যানসন হচ্ছে ভাড়াটে বাড়ি, কিন্তু আজ তিনমাস খালি পড়ে আছে!
অর্থাৎ চোরেদের দূত সদর দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে খিড়কির দরজা দিয়ে সরে পড়েছে। কেমন, এই তো?
ঠিক তাই। আমাদের কাদা ঘেঁটে মরাই সার হল!
সর্দারজি, শাবাশ!
সর্দার? সর্দার আবার কে?
এই ছেলেচোরদের সর্দার আর কি। বাহাদুর বটে সে! আমাদের এত শেয়ালের পরামর্শ, এত তোড়জোড়, এত ছুটোছুটি, সাফল্যের লাফালাফি, কালনেমির লঙ্কা ভাগ, তার এক ছেলেভোলানো সহজ চালে সব ব্যর্থ হয়ে গেল! শত্রুর চেয়ে নিজেদের বেশি বুদ্ধিমান মনে করার শাস্তি হচ্ছে এই! আমি মানস-নেত্রে বেশ নিরীক্ষণ করতে পারছি, আমাদের বোকামির দৌড় দেখে সর্দারজি মহাকৌতুক-হাস্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে দুই হাতে পেট চেপে কার্পেটের উপরে গড়াগড়ি খাচ্ছেন! হাস্যে সর্দারজি, হাস্যে! স্বীকার করছি আমরা গর্দভের নিকটাত্মীয়–আমরা হেরে ভূত!
সতীশবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, থামুন মশাই, থামুন! এটা ঠাট্টা-তামাশার বিষয় নয়!
হেমন্ত এইবারে জোরে অট্টহাস্য করে বললে, গোয়েন্দাগিরি হচ্ছে একটা বড় রকমের স্পোর্ট! পরাজয়কে আমি হাসিমুখেই গ্রহণ করতে পারি। যে কখনও পরাজিত হয়নি, সে বিজয়গৌরবেরও যথার্থ মর্যাদা বুঝতে পারে না।
সতীশবাবু ভার-ভার মুখে বললেন, খেলা? বেশ, কেমন খেলোয়াড় কে, দেখা যাবে। আপনার ওই সর্দারজি এখনও টের পাননি যে, আমাদের হাতের তাস এখনও ফুরিয়ে যায়নি! দেখি টেক্কা মারে কে!
হেমন্ত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললে, আমাদের হাতে এখনও কী কী তাস আছে মশাই? নতুন কোনও তাস পেয়েছেন নাকি?
