সতীশবাবু বললেন, সে কী মশাই। রাজবাড়ির চায়ের নিন্দে!
মশাই কি সন্দেহ করেন যে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ চা তৈরি হয় কেবল রাজা-রাজড়ার বাড়িতেই? মোটেই নয়, মোটেই নয়! দামি আর খাঁটি চায়নার টি-পটে ঐশ্বর্যের সদর্প বিজ্ঞাপনথাকতে পারে, কিন্তু সুস্বাদু চা যে থাকবেই এমন কোনও বাঁধা আইন নেই। চা যে-সে হাতে তৈরি হয় না। ভালো চা তৈরি করার সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজানোর তুলনা চলে। ও দুটোই যেমন সহজ, তেমনি কঠিন। এ দুই ক্ষেত্রেই গুণী মেলে একশো-জনে একজন। আমার মধু চাকর হচ্ছে পয়লা নম্বরের চা-কর।
সতীশবাবু বললেন, আপাতত আপনার চায়ের ওপরে এই বক্তৃতাটা বন্ধ করলে ভালো হয় না?
চায়ে শেষ-চুমুক মেরে ইজিচেয়ারে হেলে পড়ে হেমন্ত অর্ধমুদিত নেত্রে বললে, ব্যস্ত হবেন না সতীশবাবু! আমার মুখে বাক্যধারা ঝরছে বটে, কিন্তু আমার মস্তিষ্কের ভেতরে উথলে উঠছে চিন্তার তরঙ্গমালা!
আমরা পুলিশ, প্রমাণ চাই।
প্রমাণ? বেশ, দিচ্ছি! আসছে কাল রাত দশটার সময়ে টালিগঞ্জের রেলওয়ে-ব্রিজের উপরে ছেলেচোরদের দূত আসবে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কমলাকান্তবাবুর লোক তার হাতে লক্ষ টাকার নোট সমর্পণ করবে।
তারপর?
আমাদের অর্থাৎ পুলিশের চর যাবে তার পিছনে পিছনে।
ধ্যেৎ, পর্বতের মুষিক প্রসব! চোরেদের চিঠিতে–
কি লেখা আছে আমি তা ভুলিনি মশাই, ভুলিনি। পুলিশের চর এমনভাবে দূতের পিছনে যাবে, সে একটুও সন্দেহ করতে পারবে না।
দূত যদি অন্ধ আর নির্বোধ না হয়, তাহলে সে ঠিক ধরতে পারবে, কে তার পিছু নিয়েছে।
না, ধরতে পারবে না। এখানে আপনারা বিলাতি পুলিশের পদ্ধতি অবলম্বন করুন।
পদ্ধতিটা কি, শুনি।
রাত দশটার ঢের আগে ঘটনাস্থলের চারিদিকে তফাতে তফাতে দলে দলে গুপ্তচর ঘোরাফেরা করবে। মনে রাখবেন, পাঁচ-দশ জনের কাজ নয়। তারপর যথাসময়ে চোরেদের দূত আসবে, টাকা নেবে, স্বস্থানের দিকে প্রস্থান করবে। দূর থেকে তাকে অনুসরণ করবে আমাদের প্রথম চর। দূতের লক্ষ্য নিশ্চয়ই তার উপরে পড়বে–পড়ুক, ক্ষতি নেই। আমাদের প্রথম চর খানিক এগিয়েই দেখতে পাবে আর-একজন নতুন লোককে–অর্থাৎ আমাদের দ্বিতীয় চরকে। প্রথম চর, দ্বিতীয়কে ইঙ্গিতে দূতকে দেখিয়ে দিয়ে নিজে পিছিয়ে পড়বে বা অন্য দিকে চলে। যাবে। চোরেদের দূত সেটা দেখে ভাববে, সে মিছেই সন্দেহ করেছিল। ওদিকে আমাদের দ্বিতীয় চর কতকটা পথ পার হয়েই পাবে আমাদের তৃতীয় চরকে। তখন সেও তৃতীয়ের উপরে কার্যভার দিয়ে নিজে সরে পড়বে। এই ভাবে তৃতীয়ের পর চতুর্থ, তারপর দরকার হলে পঞ্চম বা ষষ্ঠ চর চোরেদের দূতের পিছু নিলে সে কিছুই সন্দেহ করতে পারবে না।
চমকার আধুনিক পদ্ধতি। কিন্তু তারপর?
আমাদের আপাতত জানা দরকার কেবল চোরেদের কলকাতার আস্তানাটা। এখন কারুকে গ্রেপ্তার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ চোরেদের কবলে আছে তিন-তিনটি বালক। তারা যে কলকাতায় নেই এটা আমরা জানি। আগে তাদের ঠিকানা বার করি, তারপর অন্য কথা। কলকাতায় চোর ধরতে গিয়ে তাদের যদি মরণের মুখে এগিয়ে দি, তাহলে আমাদের অনুতাপ করতে হবে। রোগী মেরে রোগ সারানোর মানে হয় না।
.
অষ্টম । গল্পস্বল্প
কাল গেছে পনেরোই তারিখ। রাত দশটার সময়ে কাল টালিগঞ্জে নিশ্চয়ই একটা কিছু রোমাঞ্চকর নাট্যাভিনয় হয়ে গেছে। খবরটা জানবার জন্যে উৎসুক হয়ে আছে মন।
সতীশবাবু কাল রাতেই খবর দিতে আসবার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু হেমন্ত রাজি হয়নি। সে বললে, আপনি হয়তো আসবেন রাত বারোটার সময়ে। কিন্তু আপনার খবরের চেয়ে। আমার ঘুমকে আমি বেশি মূল্যবান মনে করি। রাতের পর সকাল আছে, এর মধ্যেই খবরটা বাসি হয়ে যাবে না নিশ্চয়।
যথাসময়ে শয্যাত্যাগ, আহার ও নিদ্রা–হেমন্ত সাধ্যমতো এ-নিয়ম রক্ষা করবার চেষ্টা করত। অথচ জরুরি কাজের চাপ পড়লে তাকেই দেখেছি দুই-তিন রাত্রি বিনা নিদ্রায় অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে।
সে বলত, নিয়ম মেনে শরীরধর্ম পালন করি বলেই আমার দেহের মধ্যে সঞ্চিত হয়ে আছে reserved শক্তি। যারা অনিয়মের মধ্যেই জীবন কাটায় তাদের দেহে কেবল রোগ এসেই বাসা বাঁধে না–reserved শক্তি থেকেও তারা হয় বঞ্চিত।
সকালে বসে হেমন্তের সঙ্গে গল্প করছিলুম। হেমন্ত বলছিল, মানুষের জীবনে দৈবের প্রভাব যে কতখানি, আমরা কেউই সেটা ভেবে দেখবার চেষ্টা করি না। গোটাকয়েক দৃষ্টান্ত দি, দেখ। প্রথমে ধর–আলেকজান্ডার দি গ্রেটের কথা। তিনি মারা গিয়েছিলেন যৌবনেই। অল্প বয়সে সিংহাসন পেয়েছিলেন বলে হাতে পেলেন তিনি অসীম ক্ষমতা আর তাঁর পিতার হাতে তৈরি সুশিক্ষিত সৈন্যদল। তাঁর পিতা রাজা ফিলিপ অসময়ে দৈবগতিকে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ দেন। সে-সময়ে তিনি যদি হঠাৎ মারা না যেতেন, যদি বৃদ্ধবয়স পর্যন্ত রাজ্যচালনা করতেন, তাহলে আলেকজান্ডার কখনও দিগ্বিজয়ী নাম কেনবার অবসর পেতেন কিনা সন্দেহ! …ভেবে দেখ, বিলাতের বালক কবি চ্যাটার্টনের কথা। সবাই বলে, দরিদ্রের ঘরে না জন্মালে তিনি তখনকার ইংলন্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হতে পারতেন। পৃথিবীর অনেক কবিই ধনী বা রাজার কৃপাদৃষ্টি লাভ করে লক্ষ্মীকে প্রসন্ন করে সরস্বতীর সেবা করে গেছেন যোড়শোপচারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও চ্যাটার্টন দৈবের সাহায্য লাভ করেননি। ফলে অনাহারের জ্বালা সইতে না পেরে বালক-বয়সেই তিনি করলেন আত্মহত্যা–অতবড় প্রতিভার ফুল শুকিয়ে গেল ফোটবার আগেই।… রোম সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী থিয়োডোরার কথা মনে করো। তিনি ছিলেন অজানা অনামা বংশের মেয়ে, পথের ধুলোয় পড়ে কাটত তার দিন। দৈবের মহিমায় হঠাৎ একদিন সম্রাটের সুনজরে পড়ে থিয়োডোরা হলেন সম্রাজ্ঞী! এমনই কত আর নাম করব? রবীন, আজ যাদের তুমি নিম্নশ্রেণির অপরাধী বলে জানো, খোঁজ নিলে দেখবে–তাদের অনেকেই হয়তো দৈবের হাতের খেলনা হয়ে এমন ঘৃণ্য নাম কিনেছে। দৈবগতিকে তাদের অজ্ঞাতসারেই তারা যদি একটি বিশেষ ঘটনার আবর্তের মধ্যে গিয়ে না পড়ত তাহলে আজ তারা বাস করতে পারত সমাজের উচ্চ-স্তরেই। আবার দেখ, আমাদের দলের অনেকেই বিখ্যাত ডিটেকটিভ হয়ে ওঠে, খুব রহস্যময় মামলারও কিনারা করে ফেলে, কিন্তু তারও মূলে থাকে দৈবের খেলাই। আপাতত যে-মামলাটা আমরা হাতে নিয়েছি, এখনও সেটার কোনও কিনারা হয়নি বটে, কিন্তু এখনই দৈব আমাদের সহায়। হয়েছে।
