আমি হেসে উঠে বললুম, ভয় নেই, সেকথা আমরা মহারাজকে বলে দেব না!
গাঙ্গুলি প্রস্থান করলেন। হেমন্ত বিজ্ঞাপনটা তুলে নিয়ে পড়তে লাগল। মিনিট দুয়েক পরে তারিফ করে বললে, চমৎকার, চমৎকার।
আমি একটু গর্বিত স্বরে বললুম, কি হে, আমার বিজ্ঞাপনের ভাষাটা তাহলে তোমার ভালো লেগেছে?
আমার আত্মপ্রসাদের উপরে ঠান্ডা জল নিক্ষেপ করে হেমন্ত প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বললে, মোটেই না, মোটেই না!
তবে তুমি চমৎকার বললে বড় যে?
আমি মিঃ গাঙ্গুলির হাতের লেখা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। চমৎকার, চমৎকার!
রাগে আমার গা যেন জ্বলতে লাগল।
.
সপ্তম । ছেলে-ধরার লিখন
হেমন্তের সঙ্গে আজ আমিও মহারাজাবাহাদুরের ওখানে গিয়েছিলুম।
যুবরাজের জন্যে মহারাজা এমন অস্থির হয়ে উঠেছেন যে, হেমন্তকে বাধ্য হয়ে তার কাছে যেতে হল।
মহারাজা প্রথমেই জানতে চাইলেন, তদন্ত কতদূর অগ্রসর হয়েছে।
হেমন্ত গুপ্তকথা কিছুতেই ভাঙলে না। কেবল বললে, সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে এবং তার চেষ্টা হয়তো ব্যর্থ হবে না।
এরকম উড়ো কথায় মহারাজা খুশি হলেন না, রাগ করে বাঙালি পুলিশ ও গোয়েন্দাদের উপরে কতকগুলো মানহানিকর বিশেষণ প্রয়োগ করলেন।
পুত্রবিচ্ছেদে ব্যাকুল মহারাজার এই বিরক্তি হেমন্ত নিজের গায়ে মাখলে না, হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে এল।
হেমন্তের বাড়িতে এসে দেখি, তার বৈঠকখানার ভিতরে সতীশবাবু ঠিক পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের মতোই এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত ছুটোছুটি করছেন।
হেমন্তকে দেখেই বলে উঠলেন, বেশ মশাই, বেশ! এদিকে এই ভয়ানক কাণ্ড, আর ওদিকে আপনি দিব্যি হাওয়া খেয়ে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন?
হেমন্ত হেসে বললে, হাওয়া খেতে নয় সতীশবাবু, গালাগাল খেতে গিয়েছিলুম!
মানে?
মানে, দুর্জয়গড়ের মহারাজাবাহাদুরের মতে দুনিয়ায় অকর্মণ্যতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ হচ্ছে বাঙালি পুলিশ আর
আরে, রেখে দিন আপনার দুর্জয়গড়ের তর্জন-গর্জন! এদিকে ব্যাপার কি জানেন?
প্রকাশ করুন।
আপনার ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হল। শ্যামলপুরের জমিদারের কাছে ছেলেচোরদের চিঠি এসেছে।
কমলাকান্ত রায়চৌধুরীর কাছে? তারই একমাত্র পুত্র তো সর্বপ্রথমে চুরি যায়?
হ্যাঁ। এই দেখুন।
সতীশবাবুর হাত থেকে পত্ৰখানা নিয়ে হেমন্ত তার কাগজ পরীক্ষা করে বললে, সেই একই কাগজ–Made in Kalifornia! ভালো।
চিঠিখানা সে উচ্চস্বরে পাঠ করলে :
শ্ৰীযুক্ত কমলাকান্ত রায়চৌধুরী
সমীপেষু—
মহাশয়,
আমরা দুরাশয় নই। আপনার পুত্র আমাদেরই কাছে আছে। তাহার সমস্ত কুশল।
কিন্তু তাহাকে আর অধিক দিন আমাদের কাছে রাখিতে ইচ্ছা করি না।
পুত্রের মূল্যস্বরূপ মহাশয়কে এক লক্ষ মাত্র টাকা দিতে হইবে। চেক নয়, দশ হাজার টাকার দশখানি নোট দিলেই চলিবে।
আগামী পনেরোই তারিখে রাত্রি দশটার সময়ে টালিগঞ্জের রেলওয়ে ব্রিজের উপরে আমাদের লোক আপনার টাকার জন্য অপেক্ষা করিবে।
মনে রাখিবেন, আপনি যদি পুলিশে খবর দেন এবং আমাদের লোক ধরা পড়ে কিংবা কেহ তাহার পশ্চাৎ-অনুসরণ করে, তাহা হইলে আপনার পুত্রকে হত্যা করিতে আমরা একটুও ইতস্তত করিব না।
যদি যথাসময়ে টাকা পাই, তবে তাহার পর সাত-আট দিনের মধ্যেই আপনার পুত্রকে আমরা বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিয়া আসিব। এইটুকু বিশ্বাস আমাদের করিতেই হইবে।
আগামী পনেরোই তারিখে টাকা না পাইলে বুঝিব, মহাশয়ের পুত্রকে ফিরাইয়া লইবার ইচ্ছা নাই। তাহার পর আপনার পুত্রের ভালো-মন্দের জন্যে আমরা দায়ী হইব না।
ইতি–
হেমন্ত বললে, চিঠির তলায় নাম নেই। এ-শ্রেণির ভদ্রলোকেরা বিনয়ের অবতার। নিজেদের নাম জাহির করবার জন্যে মোটেই লালায়িত নন।
সতীশবাবু বললেন, এখন উপায় কি বলুন দেখি?
পনেরোই তো আসছে কাল। কমলাকান্তবাবুর টাকা দেওয়ার শক্তি আছে?
আছে। টাকা তিনি দিতেও চান। কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি চান ছেলেচোরদের ধরতেও। সেটা কী করে সম্ভব হয়? চিঠিখানা পড়লেন তো?
হুঁ। চোরদের দূত ধরা পড়লে বা কেউ তার পিছু নিলে কমলাকান্তবাবুর ছেলে বাঁচবে না।
কিন্তু কমলাকান্তবাবু ছেলেকেও বাঁচাতে, অপরাধীদেরও ধরতে চান। এ কিন্তু অসম্ভব বলে বোধ হচ্ছে। কারণ এটাও তিনি বলেছেন যে, ছেলে যতদিন চোরদের হস্তগত থাকবে, ততদিন আমরা কিছুই করতে পারব না।
তাহলে তাদের দূতকে ছেড়ে দিতে হয়।
হ্যাঁ। তারপর যেদিন তারা ছেলে ফিরিয়ে দিতে আসবে সেই দিনের জন্যে অপেক্ষা করতে হয়।
না সতীশবাবু, সেটা আরও অনিশ্চিত। অপরাধীরা বড় চালাক। তারা কবে, কখন, কি উপায়ে ছেলে ফিরিয়ে দেবে, সেসব কিছুই জানায়নি। হয়তো তারা বখশিশ দিয়ে পথের কোনও লোককে ডেকে, কমলাকান্তবাবুর ঠিকানায় তার ছেলেকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। তাকে গ্রেপ্তার করেও আমাদের কোনও লাভ হবে না। যদি আমাদের কিছু করতেই হয়, তবে কাল– অর্থাৎ পনেরোই তারিখেই করতে হবে।
তাহলে অপরাধীদের দূত ধরা পড়বে, কমলাকান্তবাবুর লক্ষ টাকা বাঁচবে, কিন্তু তার ছেলেকে রক্ষা করবে কে?
মাথা খাটালে পৃথিবীর যে-কোনও বিপদ থেকে উদ্ধারলাভের উপায় আবিষ্কার করা যায়। একটু সবুর করুন সতীশবাবু, আগে চা আসুক, প্রাণ-মন স্নিগ্ধ হোক, তারপর চায়ের পেয়ালায় তুমুল তরঙ্গ তুলতে কতক্ষণ!…ওরে মধু, চা!
যথাসময়ে চা এল। একটা পেয়ালা তুলে নিয়ে এক সেঁক পান করে হেমন্ত বললে, আ, বাঁচলুম! সক্কালবেলায় দুর্জয়গড়ের চা পান করে দেহের অবস্থা কি কাহিলই হয়ে পড়েছিল!
