দেখুন মিঃ গাঙ্গুলি, পুরস্কারের ওই পঁচিশ হাজার টাকার ওপরে আমার লোভ হচ্ছে না, একথা বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু যদি কেউ অর্থলোভে যুবরাজকে চুরি করে থাকে তাহলে ওই পঁচিশ হাজার টাকাকে সে তুচ্ছ মনে করবে বোধহয়!
আমি কিন্তু তা মনে করতে পারছি না মশাই! সাধ হচ্ছে, আপনার মতন শখের ডিটেকটিভ সেজে আমিও যুবরাজের সন্ধানে কোমর বেঁধে লেগে যাই! আমার মতে পঁচিশ হাজার টাকাই জীবনকে রঙিন করে তোলবার পক্ষে যথেষ্ট!
মোটেই নয়, মোটেই নয়! যারা যুবরাজকে চুরি করেছে তারা যদি নিষ্ক্রয় আদায় করতে চায়, তাহলে চেয়ে বসবে হয়তো পাঁচ লক্ষ টাকা!
প্রায় কঁদো কাঁদো গলায় গাঙ্গুলি বললেন, এঁ-অ্যাঁ!
দিশ-পনেরো লাখ চাইলেও অবাক হব না!
বাপ! দুর্দান্ত বিস্ময়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় গাঙ্গুলি চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যান আর কি!
আমি হেসে ফেলে বললুম, ও কি মিঃ গাঙ্গুলি, চোরেরা নিষ্ক্রয় চাইলেও অতগুলো টাকা তো আপনার সিন্দুক থেকে বেরুবে না! আপনি অমন কাতর হচ্ছেন কেন?
আমি কাতর হচ্ছি, মহারাজের মুখ মনে করে।
কেন? যাঁর বিশ লাখ টাকা আয়–
আরে মশাই, এক কোটি টাকা আয় হলেও পঁচিশ হাজার পুরস্কার ঘোষণা করা আমাদের মহারাজের পক্ষে অশ্রুতপূর্ব উদারতা!
ও! তিনি বুঝি একটু
একটু নয় মশাই, একটু নয়,–ওর নাম কী–যতদূর হতে হয়! গেল-বছরে মহারাজা তার মাতৃশ্রাদ্ধ সেরেছিলেন তিন হাজার টাকায়! বুঝেছেন মশাই, মাত্র তিন হাজার টাকা– বাপ-মায়ের কাজে বাঙালি গৃহস্থরাও যা অনায়াসে ব্যয় করে থাকে!
আমি বিপুল বিস্ময়ে বললুম, কী বলছেন! এত বড় ডাকসাইটে মহারাজা—
ওই মশাই, ওই! নামের ডাকে গগন ফাটে, কিন্তু মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।
হেমন্ত বললে, কিন্তু, শুনেছি মহারাজাবাহাদুর প্রায় ফি-বছরেই ইউরোপ-আমেরিকার বেড়াতে যান। তার জন্যে তো কম টাকার শ্রাদ্ধ হয় না।
হ্যাঁ, আমাদের মহারাজার একটিমাত্র শখ আছে, আর তা হচ্ছে দেশ-বেড়ানো। কিন্তু কীরকম হাত টেনে, কত কম টাকায় তিনি যে তাঁর ওই শখ মেটান, শুনলে আপনারা বিশ্বাস করবেন না! আরে দাদা, ছছাঃ ছোঃ! বিলাতি মুল্লুকে গিয়ে তিনি প্রবাদবিখ্যাত Marvellous Eastern King-এর নামে রীতিমতো কলঙ্কলেপন করে আসেন।
তাই নাকি? এমন ব্যাপার!
তবে আর বলছি কি! যুবরাজের জন্যে কেউ যদি পাঁচ লাখ টাকা নিষ্ক্রয় চায়, তাহলে ব্লাড-প্রেশার বেড়ে আমাদের মহারাজ দাঁতকপাটি লেগে মুচ্ছিত হয়ে পড়বেন! আর দশ লাখ। টাকা চাইলে? তিনি হয়তো বলে বসবেন–যুবরাজকে আর ফিরিয়ে আনবার দরকার নেই! সুতরাং দুর্জয়গড়ের যুবরাজের জন্যে তিনি যে পঁচিশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন, এটা তো রূপকথার মতন অসম্ভব কথা!
তাহলে বলতে হবে, যুবরাজের জন্যে মহারাজের বিশেষ প্রাণের টান নেই!
টান আছে মশাই, টান আছে! পুত্রের শোকে তিনি পাগলের মতন হয়ে গেছেন! তবে ছেলের শোকে বড়জোর তিনি পাগল হতে পারেন, কিন্তু টাকার শোকে তার মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব নয়!
আপনারা নিয়মিত মাইনে-টাইনে পান তো?
তা পাইনা বললে পাপ হবে। মহারাজা যাকে যা দেব বলেন, ঠিক নিয়মিতভাবেই দেন। কিন্তু অতবড় করদ মহারাজার প্রাইভেট সেক্রেটারি আমি, মাইনে কত পাই জানেন? মাসে দেড়শোটি টাকা!
তারপর খানিকক্ষণ আমরা কেউ কোনও কথা কইলুম না।
গাঙ্গুলি বললেন, আজ আবার আর-এক ফাসাদে পড়েছি মশাই! রবীনবাবু হয়তো আমার একটু উপকার করতে পারবেন।
আমি বললুম, আদেশ করুন।
আদেশ নয়, অনুরোধ। মহারাজা বাংলা কাগজগুলোয় ওই পঁচিশ হাজার পুরস্কারের জন্যে একটা বিজ্ঞাপন দিতে চান। সেটা লেখবার ভার পড়েছে, আমার ওপরে। রবীনবাবু তো মস্ত লেখক, খুব অল্প কথায় কীভাবে লিখলে বিজ্ঞাপনটা বড় না হয়–অর্থাৎ খরচ হয় কম–সেটা উনি নিশ্চয়ই বলে দিতে পারবেন। আমি মশাই মাতৃভাষায় একেবারে বিদ্যাদিগজ, কলম ধরেছি কি গলদঘর্ম হয়ে উঠেছি!
আমি হেসে বললুম, বেশ তো, আমি বলে যাই–আপনি লিখে যান!
আমি মুখে-মুখে বিজ্ঞাপন রচনা করতে লাগলুম, গাঙ্গুলি সেটা লিখে নিয়ে বললেন, তার পরেও আর-এক বিপদ আছে। মহারাজার হুকুম হয়েছে, বাংলাদেশের সমস্ত প্রধান প্রধান দৈনিক আর সাপ্তাহিকে এই বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু কাগজওয়ালারা হচ্ছে অন্য জগতের বাসিন্দা, সব কাগজের নাম-ধাম আমি জানি না তো!
আমি বললুম, তা শহরে প্রধান প্রধান দৈনিক আর সাপ্তাহিকের সংখ্যা পনেরো-বিশখানার কম নয়। তাদের নামধামও আমি জানি।
গাঙ্গুলি সভয়ে বলে উঠলেন, এই রে, তবেই সেরেছে!
কী ব্যাপার? ভয় পেলেন কেন?
ভয় পাব না, বলেন কী? দুর্জয়গড় তো বাংলাদেশ নয়, সেখানে বাঙালি কর্মচারী বলতে সবে ধন নীলমণি একমাত্র আমি। পনেরো বিশখানা বিজ্ঞাপন আমাকে যদি নিজের হাতে copy করতে হয়–
হেমন্ত হেসে বললে, নির্ভয় হোন্ মিঃ গাঙ্গুলি! বিজ্ঞাপনটা এখানেই রেখে যান, copy করবার লোক আমার আছে!
একগাল হেসে মিঃ গাঙ্গুলি বললেন, আঃ বাঁচলুম! আপনার মঙ্গল হোক! এই টেবিলের ওপরে রইল কাগজখানা। বৈকালে এর copyগুলো আর কাগজের নাম ঠিকানা নেওয়ার জন্যে আমি তোক পাঠিয়ে দেব। তাহলে আসি এখন? নমস্কার!
গাঙ্গুলি দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, কিন্তু দেখবেন মশাই, আমার মুখে মহারাজার যে চরিত্র-বিশ্লেষণ শুনলেন, সেটা যেন–
