নিশ্চয়, নিশ্চয়! সতীশবাবু, ওই ট্যাক্সির ড্রাইভারকে দেখবার জন্যে আমারও দুই চক্ষু তৃষিত হয়েছে!.., ক্যানিং, ক্যানিং! গাড়িখানা সকালবেলায় ক্যানিংয়ের দিক থেকে ফিরছিল?
হ্যাঁ।
তারপরেই আরম্ভ সুন্দরবনের জলপথ, না সতীশবাবু?
হ্যাঁ। সে জলপথ সুন্দরবনের বুকের ভিতর দিয়ে একেবারে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পৌঁছেছে।
আচ্ছা, আসুন তাহলে আবার কল্পনার মালা গাঁথা যাক–এবারে দুজনে মিলে।
তার মানে?
প্রথমে না হয় ধরেই নেওয়া যাক, অপরাধীরা দুর্জয়গড়ের যুবরাজকে নিয়ে ওই ট্যাক্সিতে চড়েই পালাচ্ছিল। ধরুন, তারা ক্যানিংয়েই গিয়ে নেমেছে। আপনি কি মনে করেন, তারা এখনও সেখানেই আছে?
না। ক্যানিং, কলকাতা নয়। তার সমস্তটা তন্ন-তন্ন করে খোঁজা হয়েছে। কিন্তু কোথাও অপরাধীদের পাত্তা পাওয়া যায়নি।
ধরুন, স্থলপথ ছেড়ে অপরাধীরা অবলম্বন করেছে জলপথ। কিন্তু জলপথে তারা কোথায় যেতে পারে?
সতীশবাবু সচকিত স্বরে বললেন, তাইতো হেমন্তবাবু, আপনার ওই ইঙ্গিতটা যে অত্যন্ত মূল্যবান! এটা তো আমরা ভেবে দেখিনি!
তারা কোথায় যেতে পারে? সমুদ্রে?
সমুদ্রে গিয়ে তাদের লাভ? নৌকায় চড়ে অকূলে ভাসবার জন্যে তারা যুবরাজকে চুরি করেনি!
তবে?
হয়তো তারা কোনও দ্বীপে-টিপে গিয়ে উঠেছে, কিংবা জলপথে খানিকটা এগিয়ে পাশের কোন গাঁয়ে-টায়ে নেমে পড়েছে।
আমার, দৃঢ়বিশ্বাস, তারা উঠেছে কোনও দ্বীপের উপরেই।
আপনার দৃঢ়বিশ্বাসের কারণ কি?
আমি প্রমাণ পেয়েছি। অকাট্য প্রমাণ!
বলেন কি মশাই! এতক্ষণ তো আমায় কিছুই বলেননি?
বলি নি, তার কারণ এতক্ষণ আমার প্রমাণকে অকাট্য বলে মনে করতে পারিনি।
হেমন্ত তখন একে একে বিশ্বদর্পণের সেই বিজ্ঞাপন কাহিনির সমস্তটা বর্ণনা করলে। অপরাধীদের দলপতি সম্বন্ধে তার ধারণাও গোপন রাখলে না।
প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়ে সতীশবাবু বলে উঠলেন, বাহাদুর হেমন্তবাবু, বাহাদুর! দলে দলে পুলিশ দেশে দেশে ছুটোছুটি করে মরছে, আর আপনি এই ছোট্ট বৈঠকখানার চারদেওয়ালের মাঝখানে ইজি-চেয়ারে বসে এর মধ্যেই এতখানি অগ্রসর হতে পেরেছেন!
না মশাই, আমাকে একবার ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠে বিশ্বদর্পণের আপিসে ছুটতে হয়েছিল।
ওকে আবার ছোটা বলে নাকি? ও তো হাওয়া খেতে যাওয়া!
আমি বললুম, কিন্তু মোহনদ্বীপ কোথায়?
সতীশবাবু বললেন, ও-দ্বীপের নাম আমিও এই প্রথম শুনলুম।
হেমন্ত বললে, সমুদ্রের কাছে সুন্দরবনের নদীর মোহনায় আমি ছোট-বড় অনেক দ্বীপ দেখেছি। ছেলেচোরের দল হয়তো ওদেরই মধ্যে একটা কোনও অনামা দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আর নিজেদের মধ্যে তাকে ডাকতে শুরু করেছে এই নতুন নামে।
খুব সম্ভব তাই। কিন্তু ওখানকার সমস্ত দ্বীপের ভিতর থেকে এই বিশেষ দ্বীপটিকে খুঁজে বার করা তো বড় চারটিখানি কথা নয়!
না। তার ওপরে ওভাবে খোঁজাখুঁজি করলে বিপদের সম্ভাবনা আছে।
কী বিপদ?
অপরাধীরা একবার যদি সন্দেহ করে যে, পুলিশের সন্দেহ গিয়েছে ওই দিকেই, তাহলে যুবরাজকে হত্যা করে তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ লুপ্ত করে দ্বীপ থেকে সরে পড়তে পারে!
তবেই তো!
তার চেয়ে আর-এক উপায়ে খোঁজ নেওয়া যাক। মনে হচ্ছে, ছেলেচোররা প্রায়ই ক্যানিং থেকে নৌকো ভাড়া নিয়ে ওই দ্বীপে যায়। আমার বিশ্বাস, ক্যানিংয়ের মাঝিদের কাছে গোপনে সন্ধান নিলে মোহনদ্বীপের পাত্তা পাওয়া অসম্ভব নয়।
সতীশবাবু উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বললেন, ঠিক, ঠিক, ঠিক!
সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় চলুক ছেলেচোরদের সর্দারের সন্ধান। কি বলেন?
আমাকে আর জিজ্ঞাসা করছেন কেন? যা বলবার তা তো আপনিই বাতলে দিচ্ছেন?
কিন্তু আপাতত আমাদের আবিষ্কার আমাদের মধ্যেই ধামাচাপা থাক।
.
ষষ্ঠ । দুর্জয়গড়ের উদারতা
তিনদিন কেটে গেল। ছেলেচোরদের সম্বন্ধে আর নতুন কিছুই জানা গেল না।
হেমন্তের সমস্ত মস্তিষ্ক-জগৎ জুড়ে বিরাজ করছে আমেরিকা-ফেরত এক অদেখা অজানা শৌখীন ব্যক্তি এবং মোহন-নামক কোনও অচেনা দ্বীপ!
কিন্তু অনেক মাথা খাঁটিয়েও কোনওরকম সুরাহা হল না; আমেরিকার ভদ্রলোক করতে লাগলেন পুরোদস্তুর অজ্ঞাতবাস এবং মোহনদ্বীপ হয়ে রইল রূপকথারই মায়া-দ্বীপের মতন মিথ্যা।
এর মধ্যে মিঃ গাঙ্গুলির আবির্ভাব হচ্ছে এবেলা-ওবেলা। দোটানায় পড়ে ভদ্রলোকের অবস্থা বড়ই কাহিল হয়ে উঠেছে। ওদিকে পুত্রশোকাতুর মহারাজা, আর এদিকে অচল অটল হেমন্ত। মহারাজা যতই ব্যস্ত হয়ে মিঃ গাঙ্গুলিকে পাঠিয়ে দেন নতুন কোনও আশাপ্রদ তথ্য জানবার জন্যে, হেমন্ত শোনায় ততই নিরাশার কথা, কিংবা কখনও কখনও হয়ে যায় অক্টোরলনি মনুমেন্টের মতন নিস্তব্ধ। বেশি পীড়াপিড়ি করলে শান্ত মুখে ফুটিয়ে তোলে দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার হাসি!
কাল বৈকালে এসে মিঃ গাঙ্গুলি একটা চমকপ্রদ সংবাদ দিয়ে গেছেন।
দুর্জয়গড়ের মহারাজাবাহাদুর পঁচিশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন! যুবরাজের সন্ধান যে দিতে পারবে ওই পুরস্কার হবে তারই প্রাপ্য।
হেমন্ত বললে,মিঃ গাঙ্গুলি, দুর্জয়গড়ের বার্ষিক আয় কত?
কুড়ি লক্ষ টাকা।
মহারাজ তাহলে দুর্জয়গড়ের যুবরাজের মূল্য স্থির করেছেন, পঁচিশ হাজার টাকা?
পঁচিশ হাজার টাকা! একি বড় দুটিখানি কথা! গাঙ্গুলি বললেন, দুই চক্ষু ছানাবড়ার মতন বিস্ফারিত করে।
