খাম আর কাগজখানা বারবার উলটেপালটে দেখে আমি বললুম, বৃথা চেষ্টা করে হাস্যাস্পদ হতে ইচ্ছা করি না। যা বলবার, তুমিই বলো।
উত্তম। প্রথমে দ্যাখো, খাম আর কাগজ কত পুরু আর দামি। গৃহস্থ তো দূরের কথা, বাংলা দেশের বড় বড় ধনী পর্যন্ত ওরকম দামি খাম-কাগজ ব্যবহার করে না। যে ওই চিঠি লিখেছে সে ধনী কিনা জানি না, কিন্তু সে-যে অসাধারণ শৌখিন মানুষ তাতে আর সন্দেহ নেই। এটাও বোঝা যাচ্ছে, সাধারণ অপরাধীর মতন সে নিম্ন-স্তরের লোকও নয়। কেমন?
মানলুম।
চোখ আর আলোর মাঝখানে রেখে কাগজখানা পরীক্ষা কর।
ভিতরে সাদা অক্ষর ফুটে উঠল। বললুম, লেখা রয়েছে Made in California!
হুঁ। আমি যতদূর জানি, কালিফোর্নিয়ায় তৈরি ওরকম খাম আর চিঠির কাগজ কলকাতায় পাওয়া যায় না। এ-বিষয়ে ভালো করে খোঁজ নিয়ে সন্দেহ দূর করব। আপাতত ধরে নেওয়া যাক, এই খাম আর কাগজ কলকাতার নয়।
তাতে কি বোঝায়?
তাতে এই বোঝায় যে, ছেলেচোরদের দলপতি আমেরিকা-প্রত্যাগত।
তুমি কোন প্রমাণে এই পত্ৰলেখককে দলপতি ধরে নিচ্ছ?
এই লোকটা দলপতি না হলে, প্রথম পত্রের লেখক, এর কাছে তার কর্তব্য কি জানতে চাইত না।
ঠিক!
এখন কি দাঁড়াল দেখা যাক। আমেরিকা থেকে কলকাতায় এমন একজন লোক ফিরে এসেছে, সে ধনী আর খুব শৌখিন। আমেরিকায় kidnapping বা ধনীর ছেলেচুরি করা হচ্ছে একটা অত্যন্ত চলতি অপরাধ। বছরে বছরে সেখানে এমনি কত ছেলেই যে চুরি যায় তার আর সংখ্যা নেই। সেই দুষ্ট বুদ্ধি মাথায় নিয়ে আমেরিকা ফেরত এই লোকটি কলকাতায় এসে এক নতুন রকম অপরাধের সৃষ্টি করেছে। সে সাহেব বা ভারতের অন্য জাতের লোক নয়, কারণ বাংলায় চিঠি লিখতে পারে। নিশ্চয়ই সে ভদ্রলোক আর শিক্ষিত। সে নিজের একটি দল গঠন করেছে। খুব সম্ভব এই দলের অধিকাংশ লোকই পাকা আর দাগি অপরাধী বা নিম্নশ্রেণির সন্দেহজনক লোক, কারণ দলপতি প্রকাশ্যে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক নয়, পুলিশের নজরে পড়বার ভয়ে।
আমি চমৎকৃত কণ্ঠে বললুম, একটি তিন-চার লাইনের বিজ্ঞাপন তোমাকে এত কথা জানিয়ে দিলে!
হেমন্ত মাথা নেড়ে বললে, কিন্তু এ-সমস্তই মেঘের প্রাসাদ ভাই, মেঘের প্রাসাদ! বাস্তবের এক ঝড়ে এরা যে-কোনও মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে পারে। এসব এখনও প্রমাণরূপে ব্যবহার করা অসম্ভব, কারণ পরিণামে হয়তো দেখা যাবে, এর অনেক কিছুই আসল ব্যাপারের সঙ্গে মিলছে না!
আমি বললুম, তবু আশাকরি তুমি অনেকটা অগ্রসর হয়েছ।
হয়তো এগিয়ে গিয়েছি, কিন্তু অন্ধকারের ভিতরে। কে এই আমেরিকা ফেরত লোক? মোহনদ্বীপ কোথায়?…ঠিক, ঠিক! দেখতো গেজেটিয়ার-খানা খুঁজে!
তখনি বই এনে খুঁজে দেখলুম। কিন্তু ভারতের কোথাও মোহন-দ্বীপের নাম পাওয়া গেল না।
হেমন্ত বললে, হয়তো ওটা স্থানীয় নাম। কিংবা ছেলেচোরের দল কোনও বিশেষ স্থানকে নিজেদের মধ্যে ওই নামে ডাকে।
বৈঠকখানার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
হেমন্ত বললে, সাবধান রবীন! তুমি বড় পেট-আলগা! বোধহয় সতীশবাবু আসছেন, তার কাছে এখন কোনও কথা নয় কারণ এখনও আমি নিজেই নিশ্চিত হইনি!
.
পঞ্চম । ঘন ঘন সাদা মোটর
হ্যাঁ, সতীশবাবুই বটে। ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করলেন, কী হেমন্তবাবু, ভেবে-চিন্তে হদিস পেলেন কিছু?
হেমন্ত হাসতে হাসতে বললে, হদিস? হুঁ-উ, পেয়েছি বইকী!
কী?
হদিশ পেয়েছি কল্পনার–যেটা কবিবর রবীনেরই একচেটে।
বুঝলুম না।
রবীনের মতন আমি কবিতা লিখছি না বটে, তবে কল্পনা-ঠাকুরানির আঁচল ধরে বাছা বাছা স্বপনের ছবি দেখছি। তাতে আমার সময় কাটছে, কিন্তু পুলিশের কোনও কাজে তারা লাগবে না।
আসন গ্রহণ করে সতীশবাবু বললেন, কিন্তু আমরা বহু কষ্টে দু-একটি তথ্য আবিষ্কার করেছি; দেখুন, আপনার কাজে লাগে কি না!
ধন্যবাদ। আমি উৎকর্ণ হয়ে রইলুম।
যে-রাত্রে দুর্জয়গড়ের যুবরাজ অন্তর্হিত হন, ঘাঁটির পাহারাওয়ালা দেখেছিল, রাত তিনটের সময় একখানা সাদারঙের বড় আর ঢাকা-মোটরগাড়ি গড়িয়াহাটা রোড দিয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটে যাচ্ছে।
এটা খুব বড় তথ্য নয়।
না। তারপর রাত প্রায় শ-তিনটের সময়ে ঠিক ওইরকম একখানা বড়, সাদা-রঙের আর ঢাকা-গাড়ি দেখেছিল টালিগঞ্জের কাছে আর-এক পাহারাওয়ালা।
তারপর?
রাত সাড়ে তিনটের কাছাকাছি ডায়মন্ডহারবার রোডে অবিকল ওইরকম একখানা গাড়ি যাচ্ছিল বলে জানা গিয়েছে।
সাদা-রঙের গাড়ি?
হ্যাঁ। তারপর রাত চারটের পর বাঁসড়ার কাছেও এক চৌকিদার ওইরকম একখানা গাড়ি যেতে দেখেছে।
তারপর, তারপর? হেমন্তের কণ্ঠ উত্তেজিত।
ভোরবেলায় দেখা যায়, ক্যানিং-এর দিক থেকে ওইরকম একখানা সাদা গাড়ি ফিরে আসছে। গাড়ির ভিতরে ছিল কেবল ড্রাইভার। সেখানা ট্যাক্সি।
হেমন্ত দাঁড়িয়ে উঠে সাগ্রহে বললে, সেই ট্যাক্সির কোনও খোঁজ পেয়েছেন?
না। তার নম্বর জানা যায়নি। তবে অনুসন্ধান চলছে।
এই তথ্যটাকে আপনি সন্দেহজনক মনে করছেন কেন?
রাত তিনটের পর থেকে সকাল পর্যন্ত, এই সময়টুকুর ভিতরে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে ক্যানিং পর্যন্ত চার-চারবার দেখা গেছে একইরকম সাদা-রঙের বড় গাড়ি। ওসব জায়গায় অত রাতে একে তো গাড়ি প্রায়ই চলে না, তার উপরে সাদা ট্যাক্সিও খুব সাধারণ নয়। সুতরাং সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক নয় কি?
