ওরা বোধহয় ডাকঘরকে নিরাপদ মনে করে না। হয়তো ভাবে, ডাকঘরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ থাকা অসম্ভব নয়।
যাকে চিঠি লেখা হচ্ছে তার সঙ্গে পত্ৰপ্রেরক নিজে মুখোমুখি দেখা করেও তো সব বলতে পারে?
তাও হয়তো নিরাপদ নয়। ধরো, দলপতিকেই সব জানানো দরকার। কিন্তু দলপতি থাকতে চায় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সকলের চোখের আড়ালে। যে-শ্রেণির সন্দেহজনক লোক তার পরামর্শে যুবরাজকে চুরি করেছে, ও-শ্রেণির সঙ্গে প্রকাশ্যে সম্পর্ক রেখে সে পুলিশের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে চায় না।…রবীন, আমাদের অনুমান যদি ভুল না হয় তাহলে বলতে হবে যে, বাংলা দেশের এই আধুনিক ছেলেধরা বিলাতি ক্রিমিনালদের অনুসরণ করতে চায়। বিলাতি অপরাধীরাও এইভাবে সাঙ্কেতিক লিপি লিখে খবরের কাগজের সাহায্যে পরস্পরের সঙ্গে কথা চালাচালি করে।..কিন্তু, কিন্তু, মোহনদ্বীপবাড়ি কোথায়?
ও-নাম এর আগে আমি কখনও শুনিনি।
হু; দ্বীপ..দ্বীপ–এ শব্দটার সঙ্গে যেন জলের সম্পর্ক আছে। দ্বীপবাড়ি মানে কী? দ্বীপের মধ্যে কোনও বাড়ি? তাহলে কথাটা কি এই দাঁড়াবে–অগ্রদ্বীপ বা কাকদ্বীপের মতন মোহন নামে দ্বীপের মধ্যেকার কোনও বাড়িতে আছেন এক রাজকুমার? কি বল হে?
হয়তো তাই।
ধেৎ, তোমার সঙ্গে পরামর্শ করাও বিড়ম্বনা, তুমি নিজে কিছু মাথা ঘামাবে না, খালি করবে আমার প্রতিধ্বনি!
তার বেশি সামর্থ্য আমার তো নেই ভাই!
হেমন্ত চিন্তিতমুখে কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইল। তারপর হঠাৎ সমুজ্জ্বল মুখে বলে উঠল, ঠিক, ঠিক! পত্রপ্রেরক কারুর কাছে জানতে চেয়েছে, অতঃপর তার কি করা কর্তব্য–কেমন?
হ্যাঁ।
তাহলে ওই খবরের কাগজের স্তম্ভেই এর উত্তরটাও তো প্রকাশিত হতে পারে?
সম্ভব।
রবীন, তুমি জানো, আমাদের বিশেষ বন্ধু চিন্তাহরণ চক্রবর্তী হচ্ছে বিশ্বদর্পণের সম্পাদক?
তা আবার জানি না, প্রত্যেক বছরেই বিশ্বদর্পণের বিশেষ বিশেষ সংখ্যার জন্যে আমাকে কবিতা আর গল্প লিখতে হয়!
তবে চিন্তাহরণই এবারে তার নামের সার্থকতা প্রমাণিত করবে।
মানে?
আমাদের চিন্তা হরণ করবে। অর্থাৎ এই সাঙ্কেতিক লিপির উত্তর বিশ্বদর্পণে এলেই সেখানা আমাদের হস্তগত হবে।
কিন্তু তাহলে কি চিন্তাহরণের সম্পাদকীয় কর্তব্যপালনে ত্রুটি হবে না?
আরে, রেখে দাও তোমার ওসব ঘেঁদো কথা! এমন বিপদজনক অপরাধী গ্রেপ্তারে সাহায্য করলে তার পুণ্য হবে হে, পুণ্য হবে! চললুম আমি চিন্তাহরণের কাছে!
.
চতুর্থ । মোহন নামক দ্বীপ
রবীন যখন বিশ্বদর্পণ কার্যালয় থেকে ফিরে এল, তখন বিপুল পুলকে নৃত্য করছে তার দুই হাসিমাখা চক্ষু!
বললুম, কী হে, ভারী খুশি যে!
রবীন ধপাস করে তার ইজিচেয়ারের উপরে বসে পড়ে বললে, চেয়েছিলুম মেঘ, পেয়ে গেলুম জল!
অর্থাৎ!
শোনো। ভেবেছিলুম, চিন্তাহরণকে আজ খালি ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে বলে আসব যে, এধরনের কোনও সাঙ্কেতিক পত্র এলেই সে যেন তার কথাগুলো লিখে নিয়ে মূল চিঠিখানা আমাকে দেয়। কারণ এত তাড়াতাড়ি উত্তর আসবার কল্পনা আমি করিনি। কিন্তু আমি যাওয়ার মিনিট পাঁচেক আগেই একজন দ্বারবান এসে সাঙ্কেতিক লিপির উত্তর আর বিজ্ঞাপনের টাকা দিয়ে গেছে! যদি আর-একটু আগে যেতে পারতুম!
তাহলে কী হত?
আমিও যেতে পারতুম দ্বারবানের পিছনে পিছনে। তার ঠিকানা পেলে তো আর ভাবনাই ছিল না, তবে যেটুকু পেয়েছি তাই-ই যথেষ্ট।
উত্তরটা দেখবার জন্যে আমি সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে দিলুম। হেমন্ত আমার হাতে দিলে একখানা খুব পুরু, খুব বড় আর খুব দামি খাম। তার ভিতরে ছিল এই চিঠি।
রাজকুমার, নব-দ্বীপেই জবানবন্দি দেওয়া হউক। জানিও, তোমার এই কলিকাতায় ছাপাখানার কাজ বন্ধ নাই।
পড়লে?
হুঁ। কিন্তু নবদ্বীপেই সব গুলিয়ে যাচ্ছে যে।
কিচ্ছু গুলোবে না। নবদ্বীপ আর জবানবন্দির মাঝে হাইফেন আছে দেখছ না, তার মানে নব আর জবান আলাদা আলাদা শব্দ বলে ধরা হয়েছে। এইবার একটা অন্তর বাজে শব্দ ফেলে দিয়ে পড়ো দেখি!
এবারে পড়লুম:
রাজকুমার দ্বীপেই বন্দি হউক। তোমার কলিকাতায় কাজ নাই।
রবীন, দুটো বিজ্ঞাপনেরই পাঠ উদ্ধার করলে তো? এখন তোমার মত কি?
আমি উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠলুম, বন্ধু, তোমাকে বন্ধু বলে ডাকতে পারাও সৌভাগ্য! কী তোমার সূক্ষ্মদৃষ্টি! এই বিজ্ঞাপনের প্রথমটা হাজার হাজার লোকের চোখে পড়েছে, তাদের মধ্যে কত পুলিশের লোকও আছে–যারা চোর ধরবার জন্যে মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছে সাত পৃথিবী! কিন্তু পাঠোদ্ধার করতে পেরেছ একমাত্র তুমি!
আমাকে একেবারে সপ্তম স্বর্গে তুলে দিও না রবীন, পৃথিবীর জ্যান্ত মানুষকে স্বর্গে পাঠানো শুভাকাঙ্ক্ষীর কাজ নয়। আগেই বলেছি, এ কোডটা হচ্ছে অত্যন্ত সহজ। যে কোনও লোক লক্ষ করলেই আসল অর্থ আবিষ্কার করতে পারে। কিন্তু তা না পারবার একমাত্র কারণ হবে, অধিকাংশ লোকই বিজ্ঞাপনটা হয়তো পড়বেই না, যারা পড়বে তারাও এর গুঢ় অর্থ বোঝবার চেষ্টা করবে না।… এখন কাজের কথা থোক। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, আমার অনুমানই সত্য। বিজ্ঞাপনের রাজকুমারই হচ্ছেন, দুর্জয়গড়ের যুবরাজ?
তাতে আর সন্দেহই নেই।
আর যুবরাজকে কোনও দ্বীপে বন্দি করে রাখা হয়েছে সম্ভবত তার নাম মোহন দ্বীপ।
তারপর?
তারপর আরও কিছু জানতে চাও তো, ওই চিঠির কাগজ আর খামখানা পরীক্ষা করো।
