একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি মাটির ওপরে বসে পড়লুম।
শ্রান্ত স্বরে বললুম, ওরা কারা আসছিল?
গরিলারা।
গরিলারা? কেন?
টানাকে নিয়ে যাবার জন্যে।
টানা আবার কে?
যে চুরি করতে রোজ আপনার তাঁবুর ভিতরে ঢুকত!
সর্দার, তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছ? তুমি কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না!
হুজুর, টানা হচ্ছে মানুষের মেয়ে। তার বয়স যখন এক বছর, গরিলারা তখন তাকে চুরি করে নিয়ে পালায়। সে আজ পনেরো বছর আগেকার কথা! সেইদিন থেকেই সে গরিলাদের সঙ্গে-সঙ্গে আছে, মানুষ হলেও তার ব্যবহার এখন গরিলারই মতন। অনেকদিন আগে আমি এই গল্প শুনেছিলুম, কিন্তু টানাকে আজ প্রথম দেখলুম। আল্লার কাছে প্রার্থনা তাকে যেন আর কখনও না দেখতে হয়!
চন্দ্রলেখায় সুদূর বনভূমিকে পরিপুরীর মতন দেখাচ্ছে। মানুষের মেয়ে টানা, কিন্তু মানুষ এখন তার কাছে শত্রুর জাতি! হয়তো বনের ভিতরে বসে টানার গরিলা অভিভাবকরা এখন তার মাথায় ব্যথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছন্নের মতন বনের দিকে তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে বসে রইলুম! কী বিস্ময়কর এই বিচিত্র জগৎ।
.
তৃতীয় । সিংহের গহ্বরে
আমি তখন আফ্রিকার উগান্ডা প্রদেশে।
একটা সিংহ আমার বন্দুকের গুলিতে জখম হয়ে পালিয়ে গিয়েছে,–মাটির ওপরে রক্তের দীর্ঘ রেখা রেখে। সেই রক্তের দাগ দেখে দেখে আমি সিংহের খোঁজে এগিয়ে চলেছি। আমার সঙ্গে আছে কাফ্রি জাতের কয়েকজন লোক।
সামনেই মস্ত এক পাহাড়। একটা পথ সমতল ক্ষেত্র থেকে পাহাড়ের ওপরে উঠে মিলিয়ে গেছে। সেই পথ দিয়েই যে সিংহটা পলায়ন করেছে, তার স্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পেলুম।
আমি পাহাড়ের ওপরে ওঠবার উপক্রম করছি, এমন সময়ে কাফ্রিদের দলের সর্দার আমাকে বাধা দিয়ে বললে, হুজুর, ও পাহাড়ে উঠবেন না!
কেন?
ও হচ্ছে শয়তানেরে পাহাড়!
বিস্মিত হয়ে বললুম, শয়তানের পাহাড়! সে আবার কী?
সর্দার মুখখানা বেজায় গম্ভীর করে বললে, ও পাহাড়ের শেষ নেই। ওর ভেতরে কারা থাকে তা আমি দেখিনি, কিন্তু শুনেছি তারা মানুষ নয়।
তা আর আশ্চর্য কী? বনেজঙ্গলে তো মানুষের বাস না থাকবারই কথা। আর আমি তো এখানে মানুষ শিকার করতে আসিনি!
না, হুজুর! আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন না! ও পাহাড়ের ভেতরে আছে। জুজুদের রাজ্য। তাদের চেহারা দেখলেই মানুষের প্রাণ বেরিয়ে যায়!
কী বলছ সর্দার, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! জুজু-টুজু আমি মানি না,আমি ওখানে যাবই! এসো আমার সঙ্গে!
সর্দার ভয়ে আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে বললে, আমি? এত তাড়াতাড়ি মরতে রাজি নই! আমার দলের কেউই ওখানে যাবে না, হুজুর বরং নিজেই জিজ্ঞাসা করে দেখুন!
আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও হল না দলের সবাই একবাক্যে বলে উঠল, আমরা কেউ যাব না!
ফাঁপরে পড়ে গেলুম। যে সিংহটার পিছু নিয়েছি, তেমন প্রকাণ্ড সিংহ বড় একটা চোখে পড়ে না। বন্দুকের গুলিতে সে এমন সাংঘাতিক ভাবে আহত হয়েছে যে, আর বেশিদূর পালাতে পারবে বলেও মনে হয় না। এমন একটা শিকারকে হাতছাড়া করব?
যা থাকে কপালে, এগিয়ে পড়ি! এই ভেবে বললুম, আচ্ছা সর্দার, তোমরা তবে আমার জন্যে এইখানেই অপেক্ষা করো,আমি সিংহটাকে শেষ করে ফিরে আসছি!
সর্দার বললে, হুজুর আমার কথা শুনুন, ওই জুজু পাহাড়ে গেলে কোনও মানুষ আর বাঁচে না!
অসভ্যদের কুসংস্কার দেখে আমার হাসি পেল। আমি আর কোনও জবাব না দিয়ে, রক্তের চিহ্ন ধরে ধীরে ধীরে পাহাড়ের পথ বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলুম।
আহত ব্যাঘ্র বা সিংহ যে কী বিপজ্জনক জীব প্রত্যেক শিকারিই তা জানে। কাজেই খুব হুশিয়ার হয়ে বন্দুক তৈরি রেখেই আমি এগিয়ে চলেছি।
প্রায় তিনশো ফুট ওপরে উঠে দেখলুম, রক্তের দাগ হঠাৎ পথ ছেড়ে ডান দিকের এক জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে ঢুকেছে। সে এমন ঘন জঙ্গল যে, তার ভিতরে সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই অসম্ভব।
আমাকে তখন শিকারের নেশায় পেয়ে বসেছে। একটুও ইতস্তত না করে আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লুম, তারপর হামাগুড়ি দিয়ে জঙ্গল ভেদ করে অগ্রসর হলুম। জঙ্গলের নিবিড়তা দেখে বেশ বোঝা গেল, এ তল্লাটে কোনওদিন কোনও মানুষের পা পড়েনি। চারদিক ভয়ানক নির্জন। যেখান দিয়ে যাচ্ছি, দিনের বেলাতেও সেখানে আলো ঢোকে না।
হঠাৎ বাধা পেলুম। পাহাড়ের গায়ে সুমুখেই একটা গুহা রয়েছে এবং রক্তের দাগ গিয়ে ঢুকেছে সেই গুহার মধ্যেই।
আহত সিংহটা আছে তাহলে ওই গুহার ভিতরেই? হয়তো ওই গুহাটাই হচ্ছে তার বাসা!
গুহার ভিতরে কী অন্ধকার! অনেক উঁকিঝুঁকি মেরেও কিছুই দেখতে পেলুম না। সিংহটারও কোনও সাড়া নেই। হয়তো ভিতরে বসে সেও আমার গতিবিধি লক্ষ করছে! হয়তো আচম্বিতে মহা ক্রোধে আমার ওপরে সে লাফিয়ে পড়বে!
কাছে ইলেকট্রিক টর্চ ছিল। টর্চটা জ্বেলে গুহার ভিতরে আলো ফেললুম। সঙ্গে সঙ্গে দেখলুম, গুহার মুখ থেকে হাত-পাঁচেক তফাতেই প্রকাণ্ড একটা সিংহের দেহ মেঝের ওপরে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে!
টর্চের তীব্র আলোতেও সিংহটা একটুও নড়ল না! খানিকক্ষণ লক্ষ করতেই বুঝলুম, তার দেহ শ্বাসপ্রশ্বাসেরও লক্ষণ নেই! সিংহটা মরেছে!
কিন্তু সাবধানের মার নেই। আহত জন্তুরা অনেক সময়ে এমনি মরণের ভান করে। তারপর হঠাৎ শিকারির ঘাড়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরণকামড় বসিয়ে দেয়। কাজেই টর্চটা কৌশলে জ্বেলে রেখেই সিংহটার দেহের ওপরে আরও দু-দুটো গুলিবৃষ্টি করলুম। তার দেহ তবু একটুও নড়ল না। তখন নিশ্চিন্ত হয়ে আমি গুহার ভিতরে প্রবেশ করলুম। এত কষ্ট সার্থক হল বলে আমার প্রাণ তখন আমোদে মেতে উঠেছে।
