.
তৃতীয়। কোড
পরের দিন সকালবেলা। চা পানের পর হেমন্ত অন্যান্য দিনের মতন আমার সঙ্গে গল্প করলে না, ইজিচেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে দুই চোখ মুদে ফেললে। বুঝলুম, নতুন মামলাটা নিয়ে সে এখন মনে-মনে জল্পনা কল্পনায় নিযুক্ত।
টেবিলের উপর থেকে বিশ্বদর্পণ পত্রিকাখানা তুলে নিলুম। সমস্ত কাগজখানার উপরে চোখ বুলিয়ে গেলুম, কিন্তু পড়বার মতন খবরের একান্ত অভাব। এমনকী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বেধেছে ইউরোপে, তারও খবরগুলো কী একঘেয়ে! প্রতিদিনই যুদ্ধের খবর পড়ি আর মনে হয়, যেন কতকগুলো বাঁধা বুলিকেই বারংবার উলটেপালটে ব্যবহার করে টাটকা খবর বলে চালাবার চেষ্টা হচ্ছে।
বাংলা কাগজের সম্পাদকীয় স্তম্ভের রচনা পাঠ করা সময়ের অপব্যবহার মাত্র। তার ভাষা ভাব যুক্তি সমস্তই জাহির করে দেয় যে, সম্পাদক প্রাণপণে কলম চালিয়ে গেছেন কেবলমাত্র পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে। রোজ তাঁকে লিখতে হবেই, কারণ সম্পাদকীয় স্তম্ভগুলো হচ্ছে সংবাদপত্রের শোভার্থে এবং পাদপূরণের জন্যে।
তারপর বিজ্ঞাপনের পৃষ্ঠায় দৃষ্টিপাত করলুম। আমার মতে বাংলা সংবাদপত্রের সব চেয়ে সুখপাঠ্য বিষয় থাকে তার বিজ্ঞাপন-পৃষ্ঠাগুলোয়। তার প্রধান কারণ বোধহয় বাংলার কাগুঁজে-লেখক বা সহকারী সম্পাদকদের মসীকলঙ্কিত কলমগুলো এ-বিভাগে অবাধ বিচরণ করবার অধিকার থেকে বঞ্চিত।
ছত্রে ছত্রে কী বৈচিত্র্য! মানুষের মনোবৃত্তির কতরকম পরিচয়! কেউ বলছেন, চার আনায় এক সোনা বিক্রি করবেন। কেউবা এমন উদার যে, ট্র্যাকের কড়ি ফেলে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করবেন যে-কোনও দুরারোগ্য রোগের মহৌষধ! কেউ প্রচার করছেন, তিনি বুড়োকে ছোঁড়া করবার উপায় আবিষ্কার করে ফেলেছেন! কোথাও বৃদ্ধ পিতা পলাতক পুত্রকে অন্বেষণ করছেন। কোথাও প্রাচীন বর তৃতীয় পক্ষের বউ পাওয়ার জন্যে বলছেন, তিনি বরপণ চান না!…এসব পড়তে পড়তে চোখের সামনে কত রঙের কত মজার ছবি জেগে ওঠে! মনে হয়, দুনিয়া কী অপূর্ব!
হঠাৎ একটা বিজ্ঞাপনের দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। সেটি এই রাজকুমার, তুমি মোহনবাবুকে দ্বীপবাড়িতে লইয়া উপস্থিত হইয়ো। তাহার সঙ্গে পরে উৎসবের কর্তব্য, বাবুরা পত্রে সমস্ত জানাইবেন।
ভাষাটা লাগল কেমন কটমট, আড়ষ্ট। দেশে ডাকঘর ও সুলভ ডাকটিকিট থাকতে কেউ এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে অর্থ আর সময় নষ্ট করতে চায় কেন। সাধারণ পত্র তো এই খবরের কাগজের আগেই যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছোতে পারত।
বিজ্ঞাপনদাতাদের নির্বুদ্ধিতা দেখে নিজের মনেই বললুম, আশ্চর্য!
হেমন্ত চোখ খুলে বললে, কী আশ্চর্য, রবীন? আবার নতুন ছেলে চুরি গেল না কি?
না, কে একটা লোক কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজের নির্বুদ্ধিতা জাহির করেছে।
দেখি বলে হেমন্ত হাত বাড়ালে, কাগজখানা আমি তার দিকে এগিয়ে দিলুম।
হেমন্ত বিজ্ঞাপনটার দিকে তাকিয়ে প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট কাল স্থির ও নীরব হয়ে বসে রইল।
আমি বললুম, কি হে, তোমার ভাব দেখলে মনে হয়, তুমি যেন কোনও মহাকাব্যের রস আস্বাদন করছ!
হেমন্ত সোজা হয়ে উঠে বসে বললে, তাই করছি রবীন, তাই করছি! তবে কাব্য নয়, নাটক!
নাটক?
হ্যাঁ, একটি অপূর্ব নাটকের অভিনেতাদের কথা ভাবছি।
ওই বিজ্ঞাপন দেখে?
এটি সাধারণ বিজ্ঞাপন নয়।
তবে?
এটি হচ্ছে কোড-এ অর্থাৎ সাঙ্কেতিক শব্দে লেখা একখানি পত্র।
কী বলছ তুমি?
পৃথিবীতে কতরকম পদ্ধতিতে সাঙ্কেতিক লিপি রচনা করা যেতে পারে, সে-সম্বন্ধে খানকয় বই আমার লাইব্রেরিতে আছে। এই সাঙ্কেতিক লিপিতে খুব সহজ একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে।
আমাকে বুঝিয়ে দাও।
এই সাঙ্কেতিক লিপিতে প্রত্যেক শব্দের পরের শব্দকে ত্যাগ করলেই আসল অর্থ প্রকাশ পাবে। এর বিরাম-চিহ্নগুলো–অর্থাৎ কমা, দাঁড়ি, প্রভৃতি ধর্তব্য নয়, ওগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। কেবল বাইরের চোখকে ঠকাবার জন্যে। এখন পড়ে দেখো, বুঝতে পারো কি না!
কাগজখানা নিয়ে পড়লুমঃ
রাজকুমার মোহনদ্বীপবাড়িতে উপস্থিত। তাহার পরে কর্তব্য পত্রে জানাইবেন!
বললম, হেমন্ত, কথাগুলোর মানে বোঝা যাচ্ছে বটে। কিন্তু এই কথাগুলো বলবার জন্যে সাঙ্কেতিক শব্দের প্রয়োজন হল কেন?
হেমন্ত ভাবতে-ভাবতে ধীরে ধীরে বললে, এখনি ঠিক স্পষ্ট করে বুঝতে পারছি না। তবে খানিকটা আন্দাজ করলে ক্ষতি নেই। রাজকুমার অর্থে না হয় ধরলুম রাজার কুমার। কিন্তু মোহনদ্বীপবাড়ি বলতে কি বোঝাতে পারে? ওটা কি কোনও স্থান বা গ্রামের নাম? তা–
ধাঁ করে আমার মাথায় একটা সন্দেহ খেলে গেল, তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে আমি বলে উঠলুম, হেমন্ত! তুমি কি বলতে চাও, দুর্জয়গড়ের যুবরাজের অন্তর্ধানের সঙ্গে এই সাঙ্কেতিক পত্রের কোনও সম্পর্ক আছে?
এখনও অতটা নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে যুবরাজ অদৃশ্য হয়েছেন আজ তিন দিন আগে। এর মধ্যেই সাঙ্কেতিক লিপিতে রাজকুমার শব্দটি দেখে মনে খানিকটা খটকা লাগছে বইকী। চিঠিখানা পড়লে মনে হয়, কেউ যেন কারুকে গোপনে জানাতে চাইছে–রাজপুত্রকে আমরা মোহনদ্বীপবাড়িতে এনে হাজির করেছি। এর পর আমরা কী করব আপনি পত্রের দ্বারা জানাবেন। রবীন, আমার এ অনুমান অসঙ্গত কিনা, তা জানবার কোনওই উপায়। নেই।
আমি বললুম, কিন্তু ডাকঘর থাকতে এভাবে চিঠি লেখা কেন?
