সতীশবাবু ভালো করেই হেমন্তকে চিনতেন, তিনি বেশ বুঝলেন তার ঘা লেগেছে। কোথায়। তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, মিঃ গাঙ্গুলি, হেমন্তবাবু আমাদের মতন পেশাদার নন, উনি এ-লাইনে এসেছেন স্রেফ শখের খাতিরে, টাকার লোভে কিছু করেন না!
মিঃ গাঙ্গুলি অপরাধীর মতো সঙ্কুচিত হয়ে বললেন, মাপ করবেন হেমন্তবাবু, আমি না জেনে আপনার সেন্টিমেন্টে আঘাত দিয়েছি।
মিঃ গাঙ্গুলির বিনীত মুখ ও ভীত কথা শুনে এক মুহূর্তে হেমন্তের রাগ জল হয়ে গেল। সে হো-হো করে হেসে উঠে বললে, মিঃ গাঙ্গুলি, কোনও ভয় নেই, আমার সেন্টিমেন্ট আপনার আঘাত সামলে নিয়েছে।..ওরে মধু, জলদি চা নিয়ে আয় রে, মিঃ গাঙ্গুলিকে বুঝিয়ে দে, তিনি কোনও অসভ্য গোঁয়ার-গোবিন্দের পাল্লায় এসে পড়েননি।
অনতিবিলম্বেই মধু এসে টেবিলের উপরে চায়ের সরঞ্জাম ও খাবারের থালা সাজিয়ে দিয়ে গেল।
চা-পর্ব শেষ হলে পর হেমন্ত বললে, মিঃ গাঙ্গুলি, খবরের কাগজে যুবরাজের অন্তর্ধান হওয়ার যে বিবরণ বেরিয়েছে, তার উপরে আমরা নির্ভর করতে পারি কি?
অনায়াসে। এমনকী কাগজওয়ালারা আমাদের নতুন কিছু বলবার ফাঁক রাখেনি।
ফাঁক নিশ্চয়ই আছে। কারণ কাগজওয়ালাদের কথা মানলে বিশ্বাস করতে হয় যে, যুবরাজের রক্ত-মাংসের দেহ সকলের অগোচরে হঠাৎ হাওয়া হয়ে শূন্যে মিলিয়ে গিয়েছে।
সতীশবাবু হেসে বললেন, না, অতটা বিশ্বাস করবার দরকার নেই। কারণ ঘটনাস্থলে আমি নিজে গিয়েছি। মহারাজাবাহাদুর গড়িয়াহাটা রোডের একখানা খুব মস্ত বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়েছেন। যুবরাজের ঘরবাড়ির শেষপ্রান্তে, দোতলায়। বাড়ির চারিদিকে আট ফুট উঁচু পাঁচিল। একে এই ব্ল্যাক-আউটের অন্ধকার, তায় কুয়াশা ভরা শীতের রাত। তার উপরে বাগানটাও পুরোনো গাছপালায় ঝুপসি। বাইরের কোনও লোক অনায়াসেই পাঁচিল টপকে সকলের অগোচরে যুবরাজের ঘরের তলায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
মিঃ গাঙ্গুলি বললেন, কিন্তু দোতলায় যুবরাজের ঘরের ভিতরে সে ঢুকবে কেমন করে?
অত্যন্ত সহজে।
সহজে? আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন, গঙ্গাবাঈ বলেছে, ঘরে ঢুকে সে দরজায় খিল লাগিয়ে। দিয়েছিল? আর সকালে উঠে খিল খুলেছিল নিজের হাতেই?
গঙ্গাবাঈয়ের সাবধানতা হয়েছিল একচক্ষু হরিণের মতো। যুবরাজের ঘরের সঙ্গে সংলগ্ন বাথরুমের দরজাটা ছিল ভোলা। বাগান থেকে মেথর আসবার জন্যে বাথরুমের পিছনে যে কাঠের সিঁড়িটা ছিল, বাইরের যে-কোনও লোক সেই সিঁড়ি বয়ে উঠে প্রথমে বাথরুমে, তারপর যুবরাজের ঘরে ঢুকতে পারে।
হেমন্ত বললে, যাক, যুবরাজের অন্তর্ধানের রহস্যটা যখন পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন এতদিন পরে আমার আর ঘটনাস্থলে যাওয়ার দরকার নেই। এখন কথা হচ্ছে, এ-চুরি করলে কে?
সতীশবাবু বললেন, অন্য সময় হলে আমি রাজবাড়ির লোককেই সন্দেহ করতুম, কিন্তু আপাতত সেটা করতে পারছি না।
হেমন্ত বললে, কেন?
এই মাসেই এর আগে কলকাতায় একই রকম আরও দুটো ঘটনা হয়ে গেছে। ও দুটো ঘটনা যখন ঘটে, দুর্জয়গড়ের মহারাজাবাহাদুর তখন কলকাতায় পদাপর্ণ করেননি। সুতরাং বেশ বোঝা যাচ্ছে, শহরে এমন একদল দুষ্টের আবির্ভাব হয়েছে, ছেলে চুরি করাই হচ্ছে যাদের প্রধান উদ্দেশ্য। আমার মতে, এই তিনটে ঘটনা একই দলের কীর্তি।
আমিও আপনার মতে সায় দি। কিন্তু চোর-চরিত্রের একটা রহস্য আমরা সকলেই জানি। প্রত্যেক শ্রেণির চোর নিজের বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগে হাত দিতে চায় না। যারা সাইকেল চুরি করে, বার বার ধরা পড়েও তারা চিরদিনই সাইকেল-চোরই থেকে যায়। আর একদলের বাঁধা অভ্যাস, রাতে গৃহস্থের ঘরে ঢুকে যা-কিছু পাওয়া যায় চুরি করে পালানো। এমনি নানা বিভাগের নানা বিশেষজ্ঞ চোর আছে, কদাচ তারা আপন আপন অভ্যাস ত্যাগ করে। কিন্তু এরকম ছেলেচোরের দল এদেশে নতুন নয় কি?
মিঃ গাঙ্গুলি বললেন, শুনেছি, আমেরিকায় এরকম ছেলেচোরের উৎপাত অত্যন্ত বেশি!
সতীশবাবু বললেন, হ্যাঁ, কাগজে আমিও পড়েছি বটে।
হেমন্ত বললে, সতীশবাবু, আপনি কল্পনা করতে পারবেন না যে, আমেরিকার ধনকুবেররা এইসব ছেলেচোরের ভয়ে কতটা তটস্থ হয়ে থাকে। তাদের ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে ফেরে মাইনে করা প্রাইভেট ডিটেকটিভরা। তবু প্রায় নিত্যই শোনা যায়, এক-এক ধনকুবেরের ছেলে চুরি যাচ্ছে আর চোরেদের কাছ থেকে চিঠি আসছে হয় এত টাকা দাও, নয় তোমার ছেলেকে মেরে ফেলব!
সতীশবাবু বললেন, কিন্তু আমাদের এই চোরের দলের উদ্দেশ্য কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তিন-তিনটি ধনীর বংশধর চুরি গেল, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রয়ের টাকা আদায় করবার জন্যে চিঠি আসেনি!
হেমন্ত বললে, এখনও আসেনি বটে, কিন্তু শীঘ্রই আসবে বোধহয়।
একথা কেন বলছেন?
আমার যা বিশ্বাস, শুনুন বলি। এই ছেলে চুরিগুলো যে একজনের কাজ নয়, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কারণ লক্ষ করলেই আন্দাজ করা যায়, প্রত্যেক ক্ষেত্রে গৃহস্থদের অভ্যাস প্রভৃতির দিকে ভালো করে নজর রেখেই কাজ করা হয়েছে। এজন্যে দীর্ঘ কাল আর একাধিক লোকের দরকার। কিন্তু মূলে আছে যে একজনেরই মস্তিষ্ক তাতেও আর সন্দেহ নেই। সে নিশ্চয়ই এদেশে নতুন কিংবা অপরাধের ক্ষেত্রে নেমেছে এই প্রথম। কারণ এ-শ্রেণির অপরাধ কলকাতার। আগে ছিল না। সেই লোকটিই একদল লোক সংগ্রহ করে বেছে বেছে ছেলেচুরি আরম্ভ করেছে। তার বাছাইয়ের মধ্যেও তীক্ষ্ণদৃষ্টির পরিচয় আছে। গরিবের ছেলে নয়, সাধারণ ধনীর ছেলেও নয়–যারা অদৃশ্য হয়েছে তারা প্রত্যেকেই পিতার একমাত্র পুত্র। এই নির্বাচন-ব্যাপারেও একমাত্র মস্তিষ্কের সন্ধান পাওয়া যায়। হ্যাঁ, সতীশবাবুর একটা কথা মানতেই হবে। এ-চোর দুর্জয়গড়ের রাজবাড়ি সম্পর্কীয় লোক না হতেও পারে। কারণ মহারাজা সদলবলে কলকাতার আসবার অনেক আগেই ঠিক একই-রকম ট্রেডমার্ক মারা আরও দুটো ছেলেচুরি হয়ে গেছে। সতীশবাবু বলছেন, চোরের উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু আমার মতে, চেষ্টা করলেই সেটা বোঝা যায়। এই ছেলেচোরদের দলপতি বড়ই চতুর ব্যক্তি। অপরাধ-ক্ষেত্রে সে নতুন পথ অবলম্বন করেছে বলেই সন্দেহ হচ্ছে, হয়তো সে রীতিমতো শিক্ষিত ব্যক্তি। এখনও সে যে নিজের উদ্দেশ্য জাহির করেনি, তার একমাত্র কারণ হচ্ছে, পুলিশকে সে গোলকধাঁধায় ফেলে রাখতে চায়। চোর যে নিষ্ক্রয়ের টাকা আদায়ের লোভেই চুরি করছে এ-সত্য গোড়াতেই প্রকাশ করতে সে রাজি নয়। কারণ এই সুক্ষ্মবুদ্ধি শিক্ষিত চোর জানে, প্রথমেই পুলিশ আর জনসাধারণ ছেলেচুরির উদ্দেশ্য ধরে ফেললে, কেবল তার স্বার্থসিদ্ধির পথই সংকীর্ণ হয়ে আসবে না, তার ধরা পড়বার সম্ভাবনাও থাকবে যথেষ্ট। তাই সে পুলিশ আর জনসাধারণের অন্ধতা দূর করতে চায়নি। কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই জানবেন, আজ হোক কাল হোক চোরের উদ্দেশ্য আর বেশিদিন গোপন হয়ে থাকবে না। সতীশবাবু, আজ এই পর্যন্ত। আমাকে আরও কিছু ভাববার সময় দিন। কাল সকালে একবার বেড়াতে বেড়াতে এদিকে আসতে পারবেন? আপনার সঙ্গে আমার গোপন পরামর্শ আছে।
