কলকাতায় মাঝে মাঝে ছেলেধরার উৎপাত হয় শুনি। কিন্তু ছেলেধরারা ধনী গরিব বাছে বলে শুনিনি। তারা ছেলে ধরত নির্বিচারে এবং গরিবেরই ছেলেচুরি করবার সুযোগ পেত বেশি। এও শোনা কথা যে, সন্ন্যাসীরা নিজেদের চ্যালার সংখ্যা বাড়াবার ও বেদেরা নিজেদের দলবৃদ্ধি করবার জন্যেই ওভাবে ছেলেচুরি করে। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছেলেধরার গুজব যে বাজে হুজুগ বলে প্রমাণিত হয়েছে, এ-সত্যও কারুর জানতে বাকি নেই।
কিন্তু এবারের ঘটনাগুলো নতুনরকম। প্রথমত, চুরি যাচ্ছে কেবল ধনীদেরই সন্তান। দ্বিতীয়ত, তিনটি ছেলেই আপন আপন পিতার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। তৃতীয়ত, কেউ যে এদের ধরে নিয়ে গিয়েছে এমন কোনও প্রমাণও নেই।
হেমন্ত নিজের চিরদিনের অভ্যাস মতো ইজিচেয়ারে অর্ধ-শয়ান অবস্থায় দুই চোখ মুদে আমার কথা ও যুক্তি শুনে যাচ্ছিল নীরবে, হঠাৎ ঘরের কোণে ফোন-যন্ত্র বেজে উঠল, ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং!
হেমন্ত যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধেই চেয়ার ত্যাগ করে ঘরের কোণে গিয়ে রিসিভার তুলে নিয়ে বললে, হ্যালো! কে? ও! হ্যাঁ, আমি অধম হেমন্তই! প্রণত হই অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সাহেব! আপনার পদোন্নতির জন্যে কনগ্রাচুলেশন! তারপর? ব্যাপার কী, হঠাৎ ফোনের সাহায্য নিয়েছেন কেন? নতুন কোনও মামলা হাতে নেবার ইচ্ছা আমার আছে কিনা? দেখুন, মানুষের ইচ্ছা হচ্ছে অনন্ত, কিন্তু সাধ্য সীমাবদ্ধ। মামলাটা কি, আগে শুনি। দুর্জয়গড়ের হারা-যুবরাজের মামলা? না মশাই, স্বাধীনভাবে অতবড় মামলা হাতে নিতে আমার ভয় হচ্ছে। আপনাদের আড়ালে থেকে কাজ করি, সে হচ্ছে আলাদা কথা; কারণ সেটা দাবা-বোড়ের উপর-চাল বলে দেওয়ার মতন সোজা। আপনারা থাকতে আমি কেন? কি বললেন, খোদ মহারাজের ইচ্ছে, মামলাটা আমি গ্রহণ করি? বলেন কী, আমি এত বড় বিখ্যাত লোক হয়ে উঠেছি?…আমার কোনও আপত্তি শুনবেন না? দুর্জয়গড়ের প্রাইভেট সেক্রেটারির সঙ্গে দশ মিনিটের মধ্যে এখানে এসে আমাকে আক্রমণ করবেন? বেশ, আক্রমণ করুন, ক্ষতি নেই; কিন্তু আত্মরক্ষা করবার জন্যে যদি না বলবার প্রয়োজন হয়, তাহলে আমার মুখ বন্ধ থাকবে না, এটা কিন্তু আগে থাকতেই বলে রাখলুম!
.
দ্বিতীয় । দুর্জয়গড়ের মামলা
রিসিভারটা যথাস্থানে রেখে হেমন্ত আমার কাছে এসে বললে, রবীন, সব শুনলে তো?
হ্যাঁ। পুলিশের সতীশবাবু তাহলে তোমার ঘাড়েই মামলাটা চাপাতে চান?
হেমন্ত জবাব দিলে না। নিজের চেয়ারে বসে পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে কি ভাবতে লাগল। তারপর বললে, এ-মামলাটা ঘাড়ে নেওয়া কি আমার পক্ষে উচিত হবে?
কেন হবে না।
স্বাধীনভাবে কখনও কাজ বা এরকম মামলা নিয়ে কখনও নাড়াচাড়া করিনি।
তাতে কি হয়েছে, শনৈঃ পর্বতলঙঘন!
তুমি ভুল করছ রবীন! আমি ঠিক গোয়েন্দা নই, অপরাধ-বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্র। যদিও এই বিশেষ বিজ্ঞানটিকে আমি গ্রহণ করেছি একশ্রেণির আর্ট হিসাবেই। হয়তো তুমি বলবে বিজ্ঞানের সঙ্গে আর্টের বা কলার সম্পর্ক নেই, কিন্তু ভুলে যেও না যেন, প্রাচীন ভারতে চৌর্যবৃত্তিকেও চৌষট্টি কলার অন্যতম কলা বলে গ্রহণ করা হত। চুরি করা যদি আর্ট হয়, চোর-ধরাও আর্ট হবে না কেন? সুতরাং এক হিসাবে আমি আর্টেরই সেবক। গোয়েন্দারূপে নাম কেনবার জন্যে আমার মনে একটুও লোভ নেই–যদিও অপরাধ-বিজ্ঞান হচ্ছে আমার একমাত্র hobby বা ব্যসন! পুলিশের সঙ্গে থাকি, কেন না হাতেনাতে পরীক্ষা করবার সুযোগ পাই, এইমাত্র! পেশাদার গোয়েন্দার মতন দুর্জয়গড়ের মহারাজাবাহাদুরের হুকুম তামিল করতে যাব কেন?
হেমন্ত আরও কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাড়ির সামনে রাস্তায় একখানা মোটর এসে দাঁড়ানোর শব্দ শুনে চুপ মেরে গেল!
মিনিট-খানেক পরেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন, অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার সতীশবাবুর সঙ্গে একটি সাহেবি পোশাক পরা ভদ্রলোক–তাঁর মুখখানি হাসিখুশিমাখা, সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা। বয়স চল্লিশের ভিতরেই।
সতীশবাবু বললেন, মিঃ গাঙ্গুলি, ইনিই হচ্ছেন হেমন্তবাবু, আর উনি ওঁর বন্ধু রবীনবাবু।..
…হেমন্তবাবু, ইনি হচ্ছেন মিঃ গাঙ্গুলি, দুর্জয়গড়ের মহারাজাবাহাদুরের প্রাইভেট সেক্রেটারি।
অভিবাদনের পালা শেষ হল।
মিঃ গাঙ্গুলি বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, হেমন্তবাবু, আপনার বয়স এত অল্প! এই বয়সেই আপনি এমন নাম কিনেছেন!
হেমন্ত হাসিমুখে বললে, আমি যে নাম কিনেছি, আমার পক্ষেই এটা আশ্চর্য সংবাদ!
মিঃ গাঙ্গুলি বললেন, বিলক্ষণ! আপনি নাম না কিনলে মহারাজাবাহাদুর আপনাকে নিযুক্ত করবার জন্যে এত বেশি আগ্রহ প্রকাশ করতেন না।
মিঃ গাঙ্গুলি সরলভাবে হেমন্তের সুখ্যাতি করবার জন্যেই কথাগুলো বললেন, কিন্তু ফল হল উলটো। হেমন্তের মুখ লাল হয়ে উঠল। রূঢ়স্বরে সে বললে, নিযুক্ত? নিযুক্ত মানে কী?
মিঃ গাঙ্গুলি বললেন, যুবরাজের মামলাটা মহারাজাবাহাদুর আপনার হাতেই অর্পণ করতে চান। এজন্যে তিনি প্রচুর পারিশ্রমিক দিতে রাজি আছেন। মামলার কিনারা হলে যথেষ্ট পুরস্কারও–
ক্রুদ্ধস্বরে বাধা দিয়ে হেমন্ত বলে উঠল, ধন্যবাদ! মিঃ গাঙ্গুলি, মহারাজাবাহাদুরকে গিয়ে জানাবেন, হেমন্ত চৌধুরী জীবনে পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের লোভে কোনও কাজ করেনি! সতীশবাবু, এ-মামলার সঙ্গে আমি কোনও সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছা করি না।
