তাড়াতাড়ি একখানা গাড়ি ডাকলুম। আমার চেহারা ও কাপড়-চোপড় দেখে গাড়োয়ান তার হাসি চাপতে পারলে না। দুর্জয় ক্রোধে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আমি গাড়োয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখলুম–এবং তার ঠোঁট থেকে হাসির লীলা তখনই মিলিয়ে গেল। সে শিউরে উঠে ফিরে বসে তাড়াতাড়ি নিজের কাজে মন দিলে। ভালোই করলে, নইলে সে বাঁচত না।
একটা হোটেলে গিয়ে উঠলুম। হোটেলের চাকরগুলোও আমার চেহারা দেখে গেল চমকে ও ভড়কে। আবার আমার সেই খুনে-রাগ হতে লাগল, কিন্তু কোনওরকমে রাগ সামলে একটা ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিলুম। সেইখানে বসে করুণাকে একখানা ও আমার ভৃত্য রামচরণকে একখানা পত্র লিখলুম। তারপরের কথা এতক্ষণে তুমি নিশ্চয়ই জানতে পেরেছ, সুতরাং আমি আর বলবার চেষ্টা করব না।
…নিরাপদে নিজের বাড়িতে ফিরে এলুম বটে, কিন্তু তারপর থেকে জীবন আমার দুর্বহ ও দুঃসহ হয়ে উঠল। দুপুরবেলায় নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে দিবা-নিদ্রার একটু আয়োজন করছি, এমন সময়ে আমার প্রাণের ওপরে আবার সেইরকম একটা ধাক্কা লাগল। এবারে আগে থাকতেই সাবধান হলুম। বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ে দ্রুতপদে পরীক্ষাগারের দিকে ছুটলুম। পরীক্ষাগারের দরজা বন্ধ করে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আবার আমি তিনকড়ি হয়ে গিয়েছি!
এবারে খুব বেশিমাত্রায় ঔষুধ খেয়ে নিজের আগেকার মূর্তিকে ফের ফিরে পেলুম বটে– কিন্তু বৃথা! খানিক পরে আবার আমার প্রাণকে ধাক্কা মেরে তিনকড়ির পুনরাবির্ভাব হল! তারপর যতই ওষুধ খাই ও জয়ন্তের মূর্তি ধারণ করি, তিনকড়ি আর কিছুতেই আমাকে ছাড়ে না, একটু আনমনা হলেই সে এসে আমার ঘাড়ে চেপে বসে!
তারপর আমার ওষুধ গেল ফুরিয়ে! নিজে নানা কৌশলে আত্মগোপন করে রামচরণকে অনেক ডাক্তারখানায় পাঠালুম, কিন্তু সে সর্বনেশে ওষুধের গুড়ো আর কিছুতেই সংগ্রহ করা গেল না! দেখছি, তিনকড়ির ভূতকে ঘাড়ে করেই জীবনের শেষনিশ্বাস আমাকে ত্যাগ করতে হবে।
ওষুধের সামান্য একটুখানি অবশিষ্ট ছিল, তারই প্রভাবে শেষবারের জন্যে জয়ন্তের মূর্তি ধারণ করে তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি। অবিনাশ, আর আমার কোনও আশাই নেই। তিনকড়ির কী হবে? সে কি ফাঁসিকাঠে প্রাণ দেবে? ভগবান জানেন! আমার আর কিছুই জানবার আগ্রহ নেই। আমার যথার্থ আমিত্বের মৃত্যু হয়েছে, তিনকড়ির অদৃষ্টের সঙ্গে তার কোনওই সম্পর্ক নেই। তোমাকে চিঠি লিখে যখন আমি কলম তুলে রাখব, তখন থেকেই এই পৃথিবী হতে অভাগা জয়ন্তের জীবন একেবারেই সমাপ্ত হয়ে যাবে।
মুখ আর মুখোশ (উপন্যাস)
প্রথম । মানুষ-চুরি
চঞ্চল হয়ে উঠেছে কলকাতা শহর।
কলকাতার চঞ্চলতা কিছু নতুন কথা নয়। বসন্ত, ডেঙ্গু, ক্ল, বেরিবেরি, প্লেগ, কলেরা ও টাইফয়েড প্রভৃতির জীবাণু প্রায়ই এখানে বেড়াতে এসে তাকে করে তোলে চঞ্চল। সাম্প্রদায়িক। দাঙ্গা-হাঙ্গামেও সে অচঞ্চল থাকতে পারে না। আজকাল উড়োজাহাজি-বোমার ভয়েও সে চঞ্চল হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। কিন্তু আমি ওরকম চঞ্চলতার কথা বলছি না।
মাসখানেক আগে শ্যামলপুরের বিখ্যাত জমিদার কমলকান্ত রায়চৌধুরী কলকাতার এসেছিলেন বড়দিনের উৎসব দেখবার জন্যে। তাঁর একমাত্র পুত্রের নাম বিমলাকান্ত। বয়স দশ বৎসর। একদিন সকালে সে বাড়ি-সংলগ্ন বাগানে খেলা করছিল। তারপর অদৃশ্য হয়েছে হঠাৎ।
লোহার ব্যবসায়ে বাবু পতিতপাবন নন্দী ক্রোড়পতি হয়েছেন বলে বিখ্যাত। তার টাকা অসংখ্য বটে, কিন্তু সন্তান-সংখ্যা মাত্র দুটি। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। ছেলেটির বয়স মোটে আট বৎসর। পাড়ারই ইস্কুলে সে পড়ে। কিন্তু একদিন ইস্কুলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তারপরদিনও না, তারও পরদিনও না। তারপর বিশ দিন কেটে গিয়েছে, আজ পর্যন্ত তার আর কোনও খবরই পাওয়া যায়নি।
দুর্জয়গড়ের করদ মহারাজা স্যার সুরেন্দ্রপ্রতাপ সিংহ বাহাদুর বড়দিনে বড়লাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্যে কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হচ্ছেন যুবরাজ বিজয়প্রতাপ, বয়স চার বৎসর মাত্র। গত পরশু রাত্রে ধাত্রী গঙ্গাবাঈ যুবরাজকে নিয়ে ঘুমোতে যায়। কিন্তু গেল কাল সকালে উঠে দেখে, বিছানায় যুবরাজ নেই। সারা রাজবাড়ি খুঁজেও যুবরাজকে পাওয়া যায়নি। রাত্রির অন্ধকার যুবরাজকে যেন নিঃশেষে গ্রাস করে ফেলেছে! গঙ্গাবাঈ কোনওরকম সন্দেহের অতীত। তার বয়স ষাট বৎসর; ওর মধ্যে পঞ্চাশ বৎসর কাটিয়েছে সে দুর্জয়গড়ের প্রাসাদে। বর্তমান মহারাজা পর্যন্ত তার হাতেই মানুষ।
সুতরাং অকারণেই কলকাতা চঞ্চল হয়ে ওঠেনি। এক মাসের মধ্যে তিনটি শ্রেষ্ঠ পরিবারের বংশধর অদৃশ্য! চারিদিকে বিষম সাড়া পড়ে গিয়েছে। ধনীরা শঙ্কিত, জনসাধারণ চমকিত, পুলিশরা ব্যতিব্যস্ত!
খবরের কাগজরা যো পেয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মহা আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। এমনকী গুজব শোনা যাচ্ছে যে, দুর্জয়গড়ের যুবরাজের অন্তর্ধানের পর গভর্মেন্টেরও টনক নড়েছে। সরকারের তরফ থেকে পুলিশের ওপরে এসেছে নাকি জোর হুমকি!
কিন্তু পুলিশ নতুন কোনও তথ্যই আবিষ্কার করতে পারেনি। সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারের তিন-তিনটি বংশধর একমাসের ভিতরে নিরুদ্দেশ হয়েছে ব্যস, এইখানেই সমস্ত খোঁজাখুঁজির শেষ। তারা কেন অদৃশ্য হয়েছে, কেমন করে অদৃশ্য হয়েছে এবং অদৃশ্য হয়ে আছেই-বা কোথায়, এ-সমস্তই রহস্যের ঘোর মায়াজালে ঢাকা।
