কিন্তু তিনকড়ির মূর্তি ধারণ করে আমি যতই পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করি, তবু আমার পক্ষেও তাকে পছন্দ করা অসম্ভব। ডাক্তার জয়ন্ত–দেশের ও দশের মাঝখানে সকলেই তাকে সম্মান করে ও ভালোবাসে, তার বন্ধুবান্ধব, খ্যাতি-প্রতিপত্তি ও অর্থ-সৌভাগ্যের অভাব নেই,আর তিনকড়ি? তাকে এই পৃথিবীর সকলেই নরকের কীটের মতন মনে করে এবং তার গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেবার জন্যে সকলেই প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাকে যদি এই পৃথিবীতে বাঁচতে হয় তবে জয়ন্ত রূপেই বাঁচতে হবে, আর তিনকড়িকে পাঠাতে হবে চিরনির্বাসনে।
মনে-মনে এই দৃঢ় সংকল্প করলুম এবং এ সংকল্প স্থির রইল দুই মাস পর্যন্ত। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে যে, মাঝে দুই মাস আমি সকলের সঙ্গে মন খুলে মেলামেশা করছিলুম? কিন্তু তার পরেই আবার মন খুঁত খুঁত করতে লাগল। দিন-রাতই আমার হৃদয়কারাগারের ভিতর থেকে তিনকড়ির মুক্তি-প্রার্থনা শুনতে লাগলুম! তারপর আবার এক দুর্বল মুহূর্তে আমি সেই ঔষধ পান করলুম। আমার চরম দুর্ভাগ্যের সূত্রপাত এইখানেই।
অনেককাল মদ্যপান বন্ধ রেখে মাতাল যদি আবার নতুন করে মদ্যপান শুরু করে, তাহলে সে আর নেশার মাত্রা ঠিক রাখতে পারে না। আমারও অবস্থা হল সেই রকম। এতদিন আমার দেহহীন অসাধু প্রকৃতি যে নিষ্ফল আক্রোশে ও অবরুদ্ধ আবেগে নীরবে হাহাকার করছিল, আজ আবার নতুন করে দেহ ও স্বাধীনতা লাভ করে সে একেবারে দুর্দমনীয় হয়ে উঠল। তিনকড়ির মূর্তি ধারণ করে বিরাট এক পৈশাচিক উল্লাসে ও ভীষণ এক হিংসাপূর্ণ আনন্দে আমার সমস্ত দেহ-মন পরিপূর্ণ হয়ে গেল! সেই সময়েই হতভাগ্য কুমার মনোমোহনের সঙ্গে আমার দেখা। এবং তার পরিণাম তোমরা সকলেই জানো। …মনোমোহনের অচেতন দেহকে অসহায়ভাবে পথের ধুলোয় পড়ে থাকতে দেখেও আমার মনে কিছুমাত্র দয়ার সঞ্চার হল না–আমি তার ওপরে লাঠির পর লাঠির ঘা মারতে লাগলুম এবং যতবারই লাঠি মারি ততবারই আমার বুক তাণ্ডবের আনন্দে যেন নাচতে থাকে! মারতে-মারতে আমার অন্ধ আনন্দ হঠাৎ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পেলে! আচম্বিতে মনে পড়ে গেল, আমি এখন হত্যাকারী, ধরা পড়লে এখন আমার জীবনের কোনওই দাম নেই! বিষম আতঙ্কে আমার উন্মত্ত আনন্দ বিলুপ্ত হয়ে গেল–তিরের মতন সেখান থেকে পলায়ন করলুম।
ব্রজদুলাল স্ট্রিটের বাসায় গিয়ে তার বিরুদ্ধে সমস্ত প্রমাণ নষ্ট করে তিনকড়ি যখন নিশ্চিন্ত হয়ে ডাক্তার জয়ন্তের পরীক্ষাগারে ফিরে এল, তখন সে মহা ফুর্তিতে একটা টপ্পা গান শুরু করে দিলে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হাসিমুখে সে ঔষধ পান করলে এবং সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি ধারণ করলেন ডাক্তার জয়ন্ত! কিন্তু তার মুখে তখন আর হাসি ছিল না, তার চোখে ছিল অশ্রুজলের উচ্ছ্বাস।…অনুতাপে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছিল, আবার তিনকড়ি হয়ে আমি কী গুরুতর পাপই আজ করলুম! আর নয়–আজ থেকে তিনকড়ির সমাপ্তি! হে ভগবান, এ বন্যপশুকে আর কখনও পিঞ্জরের বাইরে আনব না,কখনও নয়, কখনও নয়!
অবিনাশ, তুমি জানো সেই হত্যাকাণ্ডের পরে আমি কীভাবে জীবনযাপন করেছি? তোমাদের সঙ্গে আলাপ, ধর্মালোচনা ও পরোপকার ছাড়া আর কোনওদিকেই আমি মনকে নিযুক্ত রাখিনি। সমস্ত অন্যায় আনন্দকে আমার মন থেকে তাড়িয়ে দিয়ে আমি আমার সাধুপ্রকৃতির ভিতর থেকে শান্তি ও সুখের খোরাক খুঁজে পেলুম এবং ধীরে ধীরে আমার মন থেকে অনুতাপের ভাবটা আবার মিলিয়ে গেল।
কিন্তু তারপর থেকেই বুকের ভিতরে নিত্যই আমার অসাধু প্রকৃতির গর্জন আবার শুনতে পেলুম! কে যেন রুদ্ধস্বরে বলছে–ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও–তোমার ভালোকে নিয়ে তুমি থাকো, আমাকে নিজের পথে যেতে দাও! এত সাধুতা আমার সইছে না! যদিও নরকের উৎকট আনন্দ বারে বারে আমাকে ডাকতে লাগল, তবু সে প্রলোভনকে প্রাণপণে আমি দমন করতে লাগলুম। তিনকড়ির জাগরণ আর অসম্ভব! এবার জাগলে তাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হবে।
সেদিন সকালে এক কোম্পানির বাগানে একটি বসেছিলুম। কচি রোদের সোনার জলে গাছের সবুজ পাতাগুলি ঝলমল করছে, চারিদিকে পাখিদের প্রভাতি বীণার গান শোনা যাচ্ছে, আকাশের উদার নীলিমায় মেঘের ছায়া নেই। এই শান্ত প্রভাতে আমার মনের ভিতর থেকে হারানো সুখস্মৃতির কেমন একটা দীর্ঘশ্বাস জেগে উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রাণের ওপরে যেন কীসের একটা ধাক্কা লাগল! মাথাটা যেন ঘুরতে লাগল এবং চোখের সুমুখ দিয়ে একটা অন্ধকারের বন্যা ছুটে গেল! তারপরই দেহের ভিতরে অনুভব করলুম, নবীন যৌবনের উদ্দাম আবেগকে! হেঁট হয়ে তাকিয়ে দেখলুম; আমার জামা-কাপড়গুলো ঢিলে হয়ে দেহের ওপর থেকে ঝুলে পড়েছে এবং আমার দুই হাঁটুর ওপরে আছে দুখানা পাকানো লোমশ হাত! আবার আমি তিনকড়ি বটব্যাল! এক মুহূর্ত আগে ছিলুম আমি পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ ও বরেণ্য এবং এক মুহূর্ত পরেই হলুম সমাজ থেকে বিতাড়িত কঁসির আসামি!
কিন্তু এখন ভাববার বা ভয় পাবারও সময় নেই। আমার ঔষধ আছে পরীক্ষাগারের ভিতরে, কিন্তু সেখানে যাব কেমন করে? তিনকড়িরূপে বাড়িতে ঢোকবার চেষ্টা করলে আমার ভৃত্যরাই এখন পুলিশ ডেকে আমাকে ধরিয়ে দেবে। তাহলে কী করি?…তখন মনে পড়ল করুণাকে। বাগান থেকে বেরিয়ে আসছি, একটা বুড়ি ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সুমুখে এসে দাঁড়াল। তার হাতের ডালায় কতগুলো দেশলাইয়ের বাক্স। বুড়ি ভিখারির মতো স্বরে কাকুতি মিনতি করে বললে, বাবা, একবাক্স দেশলাই কিনবে বাবা? অকারণে রাগে আমার সর্বশরীর জ্বলে গেল এবং বুড়ির মুখে আমি সজোরে চপেটাঘাত করলুম। হাউমাউ করে কেঁদে ককিয়ে বুড়ি তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
