তারপর দ্বিতীয় বার সেই ঔষধ গলায় ঢেলে আবার মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে করতে আমি নিজের আসল মূর্তি ফিরে পেলুম!
খুব ভেবে-চিন্তে আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত করতে লাগলুম। ব্রজদুলাল স্ট্রিটে একখানা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ঘরদোর সাজিয়ে ফেললুম। নিজের চাকরবাকরদের বলে দিলুম যে, তিনকড়ি বটব্যাল বলে কোনও লোক এ-বাড়িতে এলে তারা যেন তার হুকুমকে আমার হুকুম বলেই মনে করে। এমনকী নিজেই তিনকড়ির মূর্তি ধারণ করে বার কয়েক এ বাড়িতে এসে আমার এই নতুন চেহারাটা ভৃত্যদের কাছে সুপরিচিত করে তুললুম। ডাক্তার জয়ন্তের কোনও বিপদ হলে তিনকড়িও পাছে বিপদগ্রস্ত হয়, সেই ভয়ে তোমাকে দিয়ে একখানা নতুন উইল তৈরি করিয়ে রাখলুম। এইভাবে আট-ঘাট বেঁধে আমি আমার নতুন জীবনের জন্যে প্রস্তুত হলুম।
অনেকে নিজে নিরাপদে আড়ালে থাকবার জন্যে গুন্ডা ভাড়া করে অন্যায় কাজ করে। কিন্তু আমি হচ্ছি এই পৃথিবীর মধ্যে প্রথম লোক, আপনাকে নিরাপদে রাখবার জন্যে যাকে অন্যের অন্যায় সাহায্য নিতে হয়নি। ডাক্তার জয়ন্তরূপে সৎ লোকের সমাজে সাধু ভাবে মাথা তুলে বুক ফুলিয়ে আমি বেড়াতে পারি, আবার ইচ্ছা করলেই চোখের নিমেষে তিনকড়ি সেজে সকলের সামনে যা খুশি তাই করতে পারি। চুরি করি, জুয়াচুরি করি আর নরহত্যাই করি, কেউ আমার একগাছা কেশও স্পর্শ করতে পারবে না। আমাকে দু-মিনিট সময় দাও, একবার পরীক্ষাগারে ভিতরে যেতে দাও–তারপর? তারপর তিনকড়ি বটব্যাল উবে যাবে কর্পূরের মতন! পুলিশ নিয়ে সেইখানে গিয়ে হাজির হও এবং সবিস্ময়ে চেয়ে দ্যাখো, সেখানে সহাস্য মুখে দাঁড়িয়ে তোমাদের সকলকে সাদরে অভ্যর্থনা করছেন বিখ্যাত ডাক্তার জয়ন্তকুমার রায়, যাঁর সুনাম ও সুচরিত্রের কথা লোকের মুখে-মুখে ফিরছে দিনরাত!
তিনকড়ি রূপে শহরের পাড়ায় পাড়ায় আমি যেসব কাজ করে বেড়াতুম সত্যই তা হীন, নিষ্ঠুর ও ভয়ানক! কোনও মানুষই–যার প্রাণে মন্দের সঙ্গে এতটুকু ভালোও আছে– এমন সব জঘন্য কাজ করতে পারে না! সময়ে সময়ে তিনকড়ির কার্যকলাপ দেখে ডাক্তার জয়ন্ত পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে যেতেন। কিন্তু ক্রমেই এসব ব্যাপার তার কাছে সহজ হয়ে উঠল। এ জন্যে দায়ী তিনি নন, তিনকড়ি একলাই দোষী! জয়ন্ত যখন আকার ধারণ করেন তখন তার সাধুতার গায়ে তো কোনও আঁচ লাগে না! বরং তিনকড়ি কোনও ভুল করে ফেললে জয়ন্ত নিজের নামের জোরে আবার তা শুধরে নিতে লাগলেন। এই ভাবে তারও বিবেক বুদ্ধি ধীরে-ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।
ইতিমধ্যে একদিন এক কাণ্ডের পর সদানন্দবাবুর সঙ্গে তিনকড়ির পরিচয়! তারপর যে সব ঘটনা ঘটেছে তোমার তা মনে আছে, আমি তা নিয়ে আলোচনা করব না। কেবল একদিনের কথাই বলব।
একদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হল, আমি যেখানে আছি সেখানে থাকা আমার উচিত নয়! ব্রজদুলাল স্ট্রিটের বাড়িই হচ্ছে আমার আসল থাকবার ঠাই, কিন্তু তার বদলে এ যে দেখছি ডাক্তার জয়ন্তের ঘর ও বিছানা,–এ বিছানায় আমি কোনও দিনই তো শয়ন করতে অভ্যস্ত নই!
মনে মনে হেসে খানিকক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে এই অদ্ভুত ভাবটা আমি মন থেকে মুছে ফেললুম…হঠাৎ নিজের হাতের দিকে আমার নজর পড়ল। ডাক্তার জয়ন্তের হাত হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, চ্যাটালো ও মসৃণ! কিন্তু ভোরের অপ্রখর আলোকে আমি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, এ-হাতখানা হচ্ছে মলিন, ছোট, রোগা, দড়ির মতন পাকানো ও কালো কালো লম্বা চুলে ভরা। এ হাত হচ্ছে তিনকড়ি বটব্যালের হাত!
প্রায় আধ মিনিট ধরে আমার হাতের দিকে নিষ্পলক নেত্রে আমি তাকিয়ে রইলুম! বিস্ময়ের প্রথম চমক কাটার সঙ্গে-সঙ্গেই দারুণ এক বিভীষিকার আমার মনটা যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল– খাট থেকে তড়াক করে লাফিয়ে পড়ে আমি আরশির সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। কী দেখলুম জানো? আরশির ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে তিনকড়ি বটব্যাল! ডাক্তার জয়ন্ত রূপে কাল রাত্রে আমি শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলুম, আর আজ সকালে জেগে উঠেছি তিনকড়ি বটব্যাল রূপে! এই অভাবিত পরিবর্তনটা হয়েছে আমার সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এবং অজ্ঞাতসারেই!
এখন উপায়? পরিবর্তনের কারণের কথা পরে ভাবা যেতে পারে, কিন্তু তিনকড়ি বটব্যাল এখন কী করবে? এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে আমার পরীক্ষাগারে যেতে গেলে অনেকটা পথ পার না হলে নয়। চাকর-বাকররা দেখে ফেললে কী মনে করবে?
তারপরেই বুঝতে পারলুম, তিনকড়িকে এ বাড়িতে দেখে-দেখে সকলে যখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, তখন এই অসময়েও তাকে দেখলে তারা বড়জোর খানিকক্ষণ অবাক হয়ে থাকবে। হলও তাই। ও-বাড়িতে যাবার সময় রামচরণ ও অন্যান্য সকলের বিস্মিত দৃষ্টি আমার চোখ এড়াল না।…দশ মিনিট পরে ডাক্তার জয়ন্ত রূপে আবার আমি নিজের ঘরে ফিরে এলুম।
সেদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা আমি প্রায় ভুলে গেলুম বললেই হয়। সারাক্ষণই দুর্ভাবনার ভিতর দিয়ে কাটতে লাগল। কারণ কী, কারণ কী? বিনা ঔষধে ডাক্তার জয়ন্তের দেহের ভিতর থেকে তিনকড়ির আবির্ভাবের কারণ কী? অনেক ভেবে আন্দাজ করলুম, ঘন ঘন রূপান্তর গ্রহণ করে আমি বোধহয় ডাক্তার জয়ন্তের চেয়ে তিনকড়ির দেহকেই সবল করে তুলেছি! এখন হয়তো তিনকড়ির মূর্তিই আমার স্বাভাবিক মূর্তি হয়ে ওঠবার উপক্রম হয়েছে!
