আমি যে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাতে জীবনের অনেকদিন কাটিয়েছি, একথা তোমরা সকলেই জানো। আমি এমন সব অদ্ভুত বিষয় নিয়ে দীর্ঘকালব্যাপী পরীক্ষা করেছি, আর কোনও বৈজ্ঞানিক কখনও যা করেননি। আমার এই সব পরীক্ষা নিয়ে অনেকে অনেকরকম ঠাট্টা বিদ্রূপ করেছেন, কিন্তু আমি কোনওদিনই সেসব গায়ে মাখিনি। ওই অবিশ্বাসীদের মধ্যে আমাদের করুণা ছিল প্রধান একজন।
মানুষের প্রকৃতির ওই দুরকম ভাবকে দুটো সম্পূর্ণ স্বাধীন আলাদা অংশে বিভক্ত করা যায় কি না, এই নিয়ে অনেকদিন ধরে চিন্তা ও পরীক্ষা করে আসছি। আমার বিশ্বাস ছিল, সাধু প্রকৃতির সঙ্গে এই অসাধু প্রকৃতির মিলন পৃথিবীর সুখ-সৌভাগ্যের পক্ষে মঙ্গলজনক নয়। সাধুতা ও অসাধুতা যদি নিজের নিজের উপযোগী মূর্তি ধারণ করে আপন-আপন পথে আলাদা হয়ে চলতে পারে, তাহলে তারা অনেক অশান্তির কবল থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। সু, যোগ্য-রূপে পৃথিবীর মঙ্গলের জন্যে আত্মনিয়োগ করতে পারে, কু-র কুকার্যের জন্যে তাকে আর অনুতপ্ত ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয় না। কু নিজের মনের খুশিতে নরকের পথে এগিয়ে যেতে পারে, সু-র কাছ থেকে তাকে ধমক খেতে ও বাধা পেতেও হয় না। মনের ভিতরে সু ও কু-র দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রায় প্রতি কবিই অনেক কথা বলেছেন। সেই দ্বন্দ্ব যাতে বন্ধ হয় এবং সু আর কু আলাদা-আলাদা রূপ পায়, তাই নিয়ে আমি প্রাণপণ পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হলুম।
এই পরীক্ষার ভিতরের কথা নিয়ে আমি এখানে আলোচনা করতে চাই না। কারণ প্রথমত, যাঁরা বৈজ্ঞানিক নন তারা আমার কথা বুঝতে পারবেন না; দ্বিতীয়ত, আমার পরীক্ষা যে অসম্পূর্ণ এ কথা আজ নিজেই বুঝতে পারছি; এই অসম্পূর্ণ পরীক্ষার গুপ্তকথা প্রকাশ করে দিলে পৃথিবীতে ভীষণ বিপ্লব উপস্থিত হবে–কেন না জগতে দুষ্ট মানুষের কোনওই অভাব নেই।
আজ মনে হচ্ছে, পরীক্ষার এমন আংশিকভাবে সফল না হলেই, সেটা হত আমার পক্ষে মস্ত এক আশীর্বাদ। এই বিপুল পৃথিবী ও সমস্ত জীব যিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই শক্তিমান স্রষ্টার বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে আমার আত্মাকে আমি বিপদগ্রস্ত করেছি।
যেদিন আমার বিশ্বাস হল যে পরীক্ষায় আমি সফল হয়েছি, সেদিন আমার মনে খুবই আনন্দ হল বটে, কিন্তু নিজের ওপরে নিজের আবিষ্কৃত এই ঔষধটা প্রয়োগ করতে সাহস হল না সহজে। কারণ একই আত্মার দুই প্রকৃতির ভিতর থেকে সম্পূর্ণ বিভিন্ন দুটো দেহ আত্মপ্রকাশ করবে, এটা একটা সাধারণ ব্যাপার নয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই মৃত্যুর সম্ভাবনা। এমনি ইতস্তত করতে করতে অনেকদিন কেটে গেল। কিন্তু শেষটা এই অভাবিত আবিষ্কারের প্রলোভন আমি আর সামলাতে পারলুম না। এক অভিশপ্ত রাত্রে সমস্ত ভয়ভাবনায় জলাঞ্জলি দিয়ে দুর্জয় সাহসে আমি আমার আবিষ্কৃত এই ঔষধটা গলাধঃকরণ করলুম।
তারপর, সে কী ভয়ংকর যন্ত্রণা! আমার দেহের সমস্ত হাড় ও মাংস যেন কে জাঁতাকলে ফেলে পেষণ করতে লাগল–চোখের সুমুখ থেকে পৃথিবীর সমস্ত দীপ্তি ধীরে ধীরে নিবে গেল!…ক্রমে ধীরে ধীরে যন্ত্রণা আবার কমে এল এবং আমার মনে হল যেন আমি এক সাংঘাতিক ব্যাধির কবল থেকে মুক্তিলাভ করলুম! অনুভব করলুম, আমার ভিতরে যেন এক অবর্ণনীয়, বিস্ময়কর ও অপূর্ব মধুর নূতনত্বের সঞ্চার হয়েছে। আমার দেহ যেন ঢের বেশি হালকা, তরুণ ও সুখী হয়ে উঠেছে! আমি যেন এখন অকুতোভয়ে পৃথিবীর বুকের ওপর দিয়ে দুর্দমনীয় বেগে ছুটোছুটি করতে পারি। সেই সঙ্গে এটাও আমি বুঝতে পারলুম যে, আমার প্রাণ এখন দানবের মতন নিষ্ঠুর ও হিংসুক হয়ে উঠেছে, কিন্তু তা জেনেও আমার মন দুঃখিত হল না মোটেই! দু-দিকে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে আমার এই তাজা আনন্দটাকে উপভোগ করতে গিয়ে হঠাৎ আমি টের পেলুম, আমার দেহ আকারে আরও ছোট হয়ে গিয়েছে!
তাড়াতাড়ি একখানা বড় আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম এবং দেখলুম সেই জীবটাকে সর্বপ্রথমে, তোমরা সবাই যাকে তিনকড়ি বটব্যাল বলে জানো!
পরে আমার এই আকারের ক্ষুদ্রতার কারণ বুঝেছিলুম। আমার ভিতরে যে দুষ্ট প্রকৃতি লুকিয়েছিল, আমার সাধু-প্রকৃতির মতন সেটা বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান ও পূর্ণর্গঠন হতে পারেনি। আমার জীবনের বেশি দিন কেটেছে সাধুভাবেই, কাজেই এই অসাধু ভাবটা খুব বেশি প্রবল হয়ে ওঠবার সুযোগ পায়নি কোনওদিনই। এইজন্যেই ডাক্তার জয়ন্তের চেয়ে তিনকড়ি বটব্যালের দেহ হয়েছে আরও তরুণ, আরও হালকা ও আরও ক্ষুদ্র! ডাক্তার জয়ন্তের মুখে আঁকা আছে যেমন সাধুতার প্রতিচ্ছবি, তিনকড়ি বটব্যালের মুখের উপরেও ফুটে উঠেছে তেমনি কুৎসিত ভাবের জ্বলন্ত ইতিহাস!
কিন্তু আয়নায় নিজের চেহারা দেখে আমার মনে কোনওরকম ঘৃণা বা লজ্জা হল না। ওই তিনকড়িও তো আর কেউ নয়, ও যে আমিই নিজে! পরে আমি নিজের মূর্তি ধারণ করে অনেকবারই শুনেছি যে, তিনকড়ি বটব্যালের চেহারা দেখে সকলেরই প্রাণে আতঙ্কের উদয় হয়। এর কারণ আর কিছু নয়, সকল মানুষের দেহই ভালোয় ও মন্দে গড়া,–কিন্তু একমাত্র তিনকড়ি বটব্যালেরই দেহ হচ্ছে, সম্পূর্ণভাবে মন্দ দিয়ে গড়া!
সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলুম, ডাক্তার জয়ন্তের বাড়িতে তিনকড়ি বটব্যালের ঠাই হতে পারে না। তিনকড়ি যখন মূর্তি ধারণ করবে, তখন তাকে অন্য কোথাও গিয়ে বাস করতে হবে।
