তার অবস্থা দেখে আমার মায়া হল। টেবিলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আমি বললুম, বাক্সটা ওইখানেই আছে, দেখতে পাচ্ছেন তো?
সে এক লাফ টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার পরেই একটা টোক গিলে বুকের ওপরে হাত দিয়ে থেমে পড়ল। তার অবস্থা দেখে আমার ভয় হল, হয় সে এখনই মারা পড়বে, নয়তো পাগল হয়ে যাবে!
আমি বললুম, মশাই, নিজেকে সামলে নিন!
আমার পানে তাকিয়ে সে একটা ভীতিকর হাসি হাসলে। তারপর টেবিলের ওপর থেকে টপ করে বাক্সটা তুলে নিয়ে তার ডালাটা ফেললে খুলে। বাক্সের ভিতরে দৃষ্টিপাত করে বিপুল আনন্দে সে এমন চিৎকার করে উঠল যে, আমি একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলুম।
তারপর সে সহজভাবেই বললে, আপনার ঘরে একটা মেজার-গ্লাস আছে?
আমি তার প্রার্থনা পূর্ণ করলুম।
আমার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিপাত করে সে গেলাসের ভিতরে খানিকটা রাঙা তরল পদার্থ ঢেলে তাতে আবার কিছু সাদা গুঁড়ো মিশিয়ে দিলে। জলে সোডা ঢাললে যেমন হয়, গেলাসের ভিতরে তরল জিনিসটা তেমনি বুড়বুড়ি কাটতে লাগল। তারপর সেই রাঙা রংটা প্রথমে কমলা ও পরে পাতলা-সবুজে পরিণত হল। লোকটা এতক্ষণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে গেলাসের ভিতরে এই পরিবর্তন লক্ষ করছিল। এখন গেলাসটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে সে আমার দিকে চেয়ে চোখ তুলে মৃদু হাস্য করলে।
তারপর সে বললে, এখন আপনি কী করতে চান? এই গেলাসটা হাতে করে আমাকে কি বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে যেতে বলবেন? না, এর পরে আমি কী করব সেটা দেখবার জন্যে আপনার কৌতূহল হচ্ছে? বেশ করে ভেবে জবাব দিন, কারণ আপনি যা বলবেন আমি ঠিক তাই-ই করব! অবশ্য, আমি এখানে থাকি আর না থাকি, তাতে আপনার লাভও নেই অলাভও নেই। তবে যদি আপনি ইচ্ছা করেন তাহলে আমি এখুনি আপনার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিতে পারি!
আমি খুব কঠোর স্বরে কথা কইবার চেষ্টা করে বললুম, মশাই, আপনি হেঁয়ালির ভাষায় কথা কইছেন, ওরকম কথায় কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনাদের এই অদ্ভুত লুকোচুরির ভিতরে আমিও জড়িয়ে পড়েছি, এখন শেষ পর্যন্ত না দেখে আর ছাড়ব না।
লোকটা গম্ভীর স্বরে বললে, করুণা, বেশ কথা বলেছ! কিন্তু শোনো। এখনই যা দেখবে, সেটা কেবল তুমিই দেখবে,–সে কথা আর কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে! তুমি বড় অবিশ্বাসী, না করুণা? তোমার সঙ্কীর্ণ মন আমার বৈজ্ঞানিক মত মানেনি, দ্রব্যগুণের কথা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছ! আজ স্বচক্ষে বিজ্ঞানের শক্তি দ্যাখো!
ওষুধের গেলাসটা সে ঠোঁটের কাছে তুলে এক চুমুকেই শেষ করে ফেললে এবং আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল। তারপর সে ঘুরতে-ঘুরতে ও টলতে টলতে পড়ে যেতে যেতে টেবিলের একটা কোণ দুই হাতে চেপে ধরে নিজেকে কোনওরকমে সামলে নিলে এবং আড়ষ্ট চোখে ঘনঘন হাঁপাতে লাগল।
তারপর সে কী বীভৎস স্বপ্নই আমার চোখে জেগে উঠল! আমি যেন স্বচক্ষেই দেখলুম, তার দেহ ক্রমেই ফুলে বড় হয়ে উঠছে এবং তার আগেকার দেহের গড়ন যেন ক্রমেই বদলে মিলিয়ে যাচ্ছে। তারপরে যা দেখলুম, তাতে আমি আর স্থির থাকতে পারলুম না–চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের ওপরে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে ভীষণ আতঙ্কে আমি বারবার চাঁচাতে লাগলুম–ভগবান! ভগবান! ভগবান!
–আমার চোখের সুমুখে দাঁড়িয়ে যেন মৃত্যুর ভিতর থেকে জীবনলাভ করেই, বিবর্ণমুখে অন্ধের মতো শূন্যে দুই হাত বাড়িয়ে যে-মূর্তি একটা অবলম্বন খুঁজছে, সে আর কেউ নয়– আমার বন্ধু জয়ন্ত!
…তারপর জয়ন্ত আমার কাছে বসে তার যে দীর্ঘ কাহিনি বর্ণনা করলে, তা প্রকাশ করবার ভাষা আমার নেই। আমি যা দেখেছি, যা শুনেছি, আমার সমস্ত আত্মা এখনও সঙ্কুচিত হয়ে আছে। আমি যা দেখেছি আর শুনেছি তা বিশ্বাস করব কি না জানি না। কিন্তু আমার জীবনের ভিত্তি পর্যন্ত আলগা হয়ে গেছে। রাত্রে আমি ঘুমোতে পারি না–চোখের সামনে যেন একটা দারুণ আতঙ্ক সর্বদাই মূর্তি ধরে বসে থাকে আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে, তবু আমাকে বোধহয় অবিশ্বাসী হয়েই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে।
অবিনাশ, কিন্তু তোমাকে একটা কথা আমি বলে রাখি। নিশুত রাতে আমার ঘরে সেদিন যে-জীবটার আবির্ভাব ঘটেছিল, নরহত্যাকারী তিনকড়ি নামেই সে তোমাদের সকলের কাছে পরিচিত!
.
দশম। জয়ন্তের আত্মকাহিনি
অবিনাশ, জন্ম আমার বড়লোকের ঘরে। কিন্তু ধনীর ছেলে হলেও আমার লেখাপড়ার কোনও ত্রুটিই হয়নি। লেখাপড়া সাঙ্গ করে যখন আসল জীবন শুরু করলুম, তখন আমার ভবিষ্যৎ ছিল খুবই উজ্জ্বল।
আমার প্রকৃতিটা ছিল অদ্ভুত। একদিকে আমি ছিলুম যেমন আমোদপ্রিয় ও চপলস্বভাব, অন্যদিকে তেমনি গম্ভীর। এই চপলতা ও গাম্ভীর্যকে আমি কখনও এক করে ফেলতুম না। আমোদের বেঁকে আমি এমন সব অন্যায় কাজ করে ফেলেছি, আমার প্রকৃতির গাম্ভীর্য কোনওদিন তাতে সায় দেয়নি। কিন্তু লোকের কাছে আমার এই চপল স্বভাবকে বরাবরই আমি লুকিয়ে এসেছি। লোকে বরাবরই জানে যে আমি হচ্ছি একজন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ, হালকা আমোদপ্রমোদ মেতে কখনও কোনও অন্যায় কাজ করতে পারি না। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুও আমার এই গুপ্ত আমুদে স্বভাবের পরিচয় পাননি। এইখানে সকলের চোখে এতদিন ধুলো দিয়ে এসেছি।
আদিম কাল থেকেই মানুষের এই দুর্বলতা আছে। সে নিজের চরিত্রের সমস্তটা কোনওদিনই সকলের সামনে খুলে দেখায়নি। সুন্দর মুখোশ পরে সে তার চরিত্রের কদর্যতা গোপন করেছে। যে শয়তান, সে সাধুর ছদ্মবেশে দশজনের মাঝখানে আনাগোনা করে। মানুষ এই লুকোচুরি বিদ্যাতে পাকা হয়ে উঠেছে।
