আমার এই চিঠি নিশ্চয়ই তুমি সন্ধ্যার সময় পাবে। তারপর গাড়ি করে আমার বাড়িতে গিয়ে ফিরে আসতে তোমার বেশিক্ষণ লাগবে না। সুতরাং আমি ধরে নিতে পারি দুপুর রাতে তুমি নিজের বাড়ির ভিতরেই থাকবে। এবং আশা করি তখন তোমার বাড়ির চাকরবাকর ও অন্যান্য লোকজন কেউ জেগে থাকবে না।
কিন্তু তুমি জেগে থেকো। আর একলা থেকো। রাত বারোটা বাজলেই আমার এক দূত তোমার কাছে গিয়ে হাজির হবে। এবং তোমার কাছে সে আমার নাম করলেই তুমি সেই কালো বাক্সটা তার হাতে সমর্পণ কোরো। এই কাজগুলি করলেই তোমার কর্তব্য শেষ হবে। সাবধান, এর মধ্যে যেন একটিও গলদ না হয়। কারণ তোমার সামান্য ভুলচুকেই আমার জীবন পর্যন্ত নষ্ট হতে পারে।
আমার এই অদ্ভুত প্রার্থনা শুনে তুমি বিস্মিত হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু বন্ধু, যতই বিস্মিত হও, আমার কথায় অবহেলা কোরো না। আমি এক অজানা অচেনা জায়গায় বিপদ সাগরে ভাসছি, একমাত্র তুমিই আমাকে কূলে এনে তুলতে পারো। করুণা, তোমার বন্ধুকে রক্ষা করো।
ইতি
তোমার বিপন্ন বন্ধু
জয়ন্ত
পত্রখানা পড়ে প্রথমে আমি ভাবলুম, জয়ন্ত একেবারে পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু তার পরেই মনে হল, এখনও যখন তার পাগলামির চাক্ষুষ পরিচয় পাইনি, তখন জয়ন্তের কথামতো কাজ আমাকে করতে হবেই। তখনই উঠে গাড়ি করে জয়ন্তের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলুম। রামচরণকে দেখে মনে হল সে যেন আমার পথ চেয়েই দাঁড়িয়ে আছে। তারপর জয়ন্তের ঘরে গিয়ে টেবিলের দেরাজ খুলে সেই কালো বাক্সটা নিয়ে আবার নিজের বাড়িতে ফিরে এলুম।
বাড়িতে এসে কেমন কৌতূহল হল, কালো বাক্সের ভিতরে কী আছে তা দেখবার জন্যে। বাক্সের ডালাটা খুলে ফেললুম। প্রথমেই চোখে পড়ল কতকগুলি শিশি। সেসব শিশির কোনওটার ভিতরে রয়েছে রক্তের মতো টকটকে লাল কী তরল পদার্থ আর কোনও কোনওটাতে বা সাদা কি অন্য রঙের গুঁড়ো ওষুধ। একখানা ছোট ডায়েরির মতো বইও দেখলুম, কিন্তু তার পাতাগুলো উলটে কিছুই বুঝতে পারলুম না। খালি কতকগুলো তারিখ আর কতকগুলো অঙ্ক! মাঝে-মাঝে কেবল এই দুটি কথা লেখা আছে–আমার প্রতিরূপ ও একেবারে ব্যর্থতা! এই দুটি কথা আমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুললে বটে, কিন্তু আসল কোনও জানবার কথা জানতে পারলুম না।
এই ওষুধের বাক্সটা আমার বাড়িতে থাকলেই যে জয়ন্তের জীবন ও সম্মান রক্ষা পাবে, এরকম কথার অর্থ কী? জয়ন্তের দূত আমার বাড়িতে এসে যখন বাক্সটা নিয়ে যেতে পারে, তখন তার নিজের বাড়িতেই সে তাকে পাঠালে না কেন? আর আমার সঙ্গে গভীর রাত্রে, সকলের অগোচরেই বা সে দেখা করতে আসবে কেন? সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে। মনে হল যেন মস্ত এক প্রহেলিকা! যা হোক, তবু জয়ন্তের কথামতো আমি বাড়ির সকলকে সেদিন সকাল সকাল ঘুমোতে যেতে বললুম।
ঘড়িতে বাজল রাত বারোটা। সঙ্গে-সঙ্গে শুনলুম সদর দরজায় কড়ানাড়ার শব্দ! আমি নিজেই নেমে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। দরজায় সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন বামনের মতন বেঁটে লোক।
শুধোলুম, আপনি কি জয়ন্ত ডাক্তারের কাছ থেকে আসছেন?
সে শুধু বললে, হ্যাঁ।
তাকে বাড়ির ভিতরে আসতে বললুম। সে আমার কথায় কান না দিয়ে প্রথমটা একবার পিছন দিকে চোখ বুলিয়ে নিলে। একটা পাহারাওয়ালা পায়ে পায়ে এই দিকেই আসছিল। সে তাকে দেখে কেমন যেন চমকে উঠল। তারপর খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল।
তার এমনধারা রকম-সকম আমার ভালো লাগল না। ঘরের ভিতরে এসে উজ্জ্বল আলোতে আমি তাকে স্পষ্টভাবে দেখবার সুযোগ পেলুম। জীবনে তাকে আর কখনও দেখিনি। সে যে বেঁটে এ কথা আগেই বলেছি, তার গড়নও যেন কেমন হাড়গোড় ভাঙা দ-এর মতন। আর তার মুখটা দেখলেই বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে। এ রকম বিশ্রী, ভয়াল চেহারা খুব কমই নজরে পড়ে।
তার চেহারা দেখলে যেমন ঘৃণা হয়, তার পোশাক-পরিচ্ছদ দেখলেও তেমনি হাসি পায়। তার জামাকাপড় দামি ও বিলাসীর উপযোগী। কিন্তু সে জামাকাপড় তার চেয়েও ঢের বেশি ঢ্যাঙা কোনও লোকের গায়েই মানাত ভালো। এরকম বেঢপ দেহে এমন সুন্দর অথচ বেমানান জামাকাপড় পরে কোনও ভদ্রলোক যে রাস্তায় বেরুতে পারে, এ ধারণা আমার ছিল না। নিজের চারিদিকে কেমন–একটা ঘৃণ্য, ভয়াবহ ও রহস্যময় আবহাওয়া সৃষ্টি করে সেই কিম্ভুতকিমাকার জীবটা যেন ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়াল। এবং এটাও লক্ষ করলুম, একটা অস্বাভাবিক উত্তেজনায় তার মুখ-চোখ প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে!
সে ভাঙা-ভাঙা কর্কশ স্বরে আমাকে শুধোলে, বাক্সটা এনেছেন কি? বাক্সটা? বলতে বলতে অত্যন্ত অধীরভাবে হাত বাড়িয়ে আমার কাধ ধরে সে নাড়া দিতে লাগল।
তার হাতের ছোঁয়ায় আমার গায়ের ভিতর দিয়ে যেন খানিকটা বরফের স্রোত বয়ে গেল। আমি তার হাতখানা ধরে তাকে পিছনে সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত স্বরে বললুম, এতটা ব্যস্ত হবেন না মশাই, থামুন। আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় পর্যন্ত নেই। ইচ্ছা করেন তো বসতে পারেন।–বলে আমি নিজেই আগে আসন গ্রহণ করলুম।
লোকটা নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ ভদ্রভাবেই বললে, মাপ করুন করুণাবাবু, আমার অন্যায় হয়েছে। ব্যাপারটা এতই গুরুতর যে আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। বুঝতেই পারছেন তো, জয়ন্তবাবু কী জন্যে আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন… তাঁর টেবিলের দেরাজে…একটা কালো বাক্স বলতে-বলতে তার কণ্ঠস্বর যেন বন্ধ হয়ে এল।
