অবিনাশবাবুর সঙ্গে সকলে ধীরে-ধীরে ঘরের ভিতরে গিয়ে দাঁড়াল, দেখতে-দেখতে তাদের চোখের সামনেই মূর্তিটা একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেল। অবিনাশবাবু দেহটাকে চিত করে শুইয়ে দিলেন। সে দেহ তিনকড়ি বটব্যালের!
তিনকড়ির গায়ে রয়েছে জয়ন্তের জামা কাপড়। সে জামা-কাপড় তার ছোট ও বেঁটে দেহের পক্ষে একেবারেই মানানসই হয়নি। তার মুখ তখনও কুঁচকে কুঁচকে উঠছিল বটে, কিন্তু দেহে জীবনের কোনও লক্ষণই ছিল না। তার মুঠোর ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়েছে একটা ওষুধের শিশি!
অবিনাশবাবু বললেন, আমরা ঠিক সময়ে এসে পড়তে পারলুম না! একে আর আমরা বাঁচাতেও পারব না, শাস্তি দিতেও পারব না! তিনকড়ি বিষ খেয়েছে। এখন দেখা যাক জয়ন্তের দেহ কোথায় আছে।
তারপর জয়ন্তের দেহের জন্যে খোঁজাখুঁজি শুরু হল। টেবিলের তলা, আলমারি, দেরাজ ও সমস্ত অলি-গলি তন্নতন্ন করে খোঁজা হল, কিন্তু জয়ন্তের দেহ কোথাও পাওয়া গেল না।
অবিনাশবাবু বললেন, তাহলে জয়ন্ত হয়তো এখান থেকে পালিয়ে গেছে!
রামচরণ কাঁদো কাঁদো মুখে বললে, না, না–ওই শয়তান আমার বাবুর দেহকে কোথাও পুঁতে রেখেছে।
অবিনাশবাবুর দৃষ্টি হঠাৎ টেবিলের ওপরে পড়ল। টেবিলের ওপরে একটা বড় কাগজের মোড়ক রয়েছে তার ওপরে লেখা, শ্রীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র সেন!
অবিনাশবাবু তাড়াতাড়ি মোড়কটা খুলে ফেললেন। প্রথমেই তার নাম লেখা একখানা ছোট খাম ও সেইসঙ্গে একতাড়া কাগজ পাওয়া গেল। কাগজগুলোর ওপরে বড়-বড় হরফে লেখা রয়েছে–আমার উইল। সে উইলখানাও ঠিক আগেকার উইলের মতনই অদ্ভুত, আগেকার উইলের সব কথাই তার ভিতরে আছে, কেবল তিনকড়ি বটব্যালের নামের বদলে রয়েছে অবিনাশবাবুরই নিজের নাম! জয়ন্ত তাঁর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি অবিনাশবাবুকে দান করেছেন।
অবিনাশবাবুর মাথা ঘুরতে লাগল, আপন চোখকেও তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না! অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, এও কি সম্ভব? তিনকড়ি আজ সাত দিন এই ঘরে রয়েছে, তবু এ উইল সে ছিঁড়ে ফেলে দেয়নি?
আপনাকে সামলে নিয়ে অবিনাশবাবু তাঁর নাম লেখা খামখানা ছিঁড়ে ফেললেন। চিঠিখানা খুলে তার তারিখ দেখেই তিনি সচকিত স্বরে বলে উঠলেন, রামচরণ, রামচরণ! জয়ন্ত বেঁচে আছে! এ-চিঠির ওপরে আজকেরই তারিখ লেখা রয়েছে! জয়ন্ত যদি আজকেই মারা যেত, তাহলে তিনকড়ি এর মধ্যেই তার দেহকে কখনও সরিয়ে ফেলতে পারত না। কিন্তু জয়ন্ত কেন পালাল? তিনকড়ি কেন আত্মহত্যা করলে? সমস্তই যে ধাঁধার মতন মনে হচ্ছে।
খানিকক্ষণ চিন্তিতমুখে বসে থাকবার পর অবিনাশবাবু চিঠিখানা পড়তে লাগলেন। চিঠিখানা ছোট। তাতে লেখা রয়েছেঃ
ভাই অবিনাশ,
এ চিঠি যখন তোমার হাতে পড়বে, তখন তুমি আর আমাকে খুঁজে পাবে না। কী কারণে এবং কেমন করে আমি যে অদৃশ্য হব, সেটা এখনও বুঝতে পারছি না। তবে আমার পরিণাম যে ঘনিয়ে এসেছে, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। করুণার মুখে শুনেছি, আমার সম্বন্ধে যা সত্য কথা, সেটা সে লিখে তোমার কাছে পাঠিয়েছে; এবং আমি বর্তমান থাকতে সে-ইতিহাস তোমাকে পাঠ করতে নিষেধ করে গেছে। আমার অনুরোধ, তুমি আগে সেই ইতিহাস পাঠ করো। তাতেও যদি তোমার সন্দেহ দূর না হয়, তাহলে এই মোড়কের ভিতরে আমি আমার যে স্বীকার-উক্তি লিখে রেখে গেলুম, তা পড়ে দেখলেই তোমার কাছে সমস্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইতি।
তোমার অসুখী ও অভাগা বন্ধু
জয়ন্ত
অবিনাশবাবু মোড়কের ভিতরে আর একতাড়া কাগজ পেলেন। সেইগুলো হাতে করে নিয়ে তিনি বললেন, রামচরণ, এ কাগজগুলো অত্যন্ত গোপনীয়। এর কথা কারুর কাছে বলবার দরকার নেই। আগে এগুলো আমি পড়ে দেখি, তারপরে পুলিশে খবর দিলেই চলবে।
.
নবম । করুণার কাহিনি
করুণার আত্মকাহিনি বার করে অবিনাশবাবু পড়তে লাগলেনঃ
দিন-চারেক আগে, একদিন সন্ধেবেলায় আমি একখানা রেজিস্টারি করা চিঠি পেলুম। চিঠিখানা এসেছে আমার বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী জয়ন্তের কাছে থেকে। চিঠি পেয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলুম। কারণ, তার আগের রাত্রেই জয়ন্তের বাড়িতে বসে তার সঙ্গে গল্পস্বল্প করে ফিরে এসেছি। হঠাৎ এরই মধ্যে এমন কী ব্যাপার ঘটল যে, আমাকে রেজিস্টারি করে চিঠি লেখবার দরকার হল? চিঠিখানা পড়ে আমার বিস্ময় আবার আরও বেড়ে উঠল। কারণ চিঠিতে জয়ন্ত এই কথাগুলি লিখেছিলেনঃ
ভাই করুণা,
আমার পুরোনো বন্ধুদের ভিতরে তুমি হচ্ছ প্রধান একজন। কোনও কোনও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক মতভেদ হয়েছে বটে, কিন্তু আমাদের মধ্যে স্নেহ ও ভালোবাসার অভাব হয়নি কোনওদিন।
তুমি যদি কোনওদিন এসে আমাকে বলতে যে, জয়ন্ত, আমার জীবন আর সম্মান বিপন্ন হয়েছে, তুমি আমাকে রক্ষা করো, তাহলে আমি আমার সর্বস্ব তোমাকে দান করতে পারতুম। করুণা, আমারই জীবন ও সম্মান বিপন্ন হয়েছে, তুমি আমাকে রক্ষা করো! তুমি যদি আমার কথায় কান না পাতো, তাহলে আমার সর্বনাশ হবে। অবশ্য তোমার কাছ থেকে আমি যা প্রার্থনা করছি তা অন্যায় কি না, তুমি নিজেই বিচার করে দ্যাখো।
আজ সন্ধ্যায় যদি তোমার কোনও কাজ থাকে, তার কথা একেবারে ভুলে যাও। আজ তোমাকে ভারতসম্রাট আমন্ত্রণ করলেও বাড়ি থেকে তুমি এক পা বেরিয়ো না। যে চিঠিখানা তুমি এখন পড়ছ, সেইখানা হাতে করে তুমি সিধে আমার বাড়িতে গিয়ে হাজির হবে। সেখানে রামচরণ আছে–সে ও আমার হুকুম পেয়েছে। রামচরণ তোমাকে আমার পরীক্ষাগারে নিয়ে যাবে। সেই ঘরে গিয়ে তুমি টেবিলের ডান দিকের দেরাজটা খুলে ফেলবে। দেরাজের নীচের তাকে একটি কালো রঙের বাক্স আছে। সেই বাক্সটি নিয়ে খুব সাবধানে তুমি আবার তোমার নিজের বাড়িতে ফিরে আসবে। এই কথাগুলি তুমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করো।
