কান ফাটানো ভয়াবহ এক গর্জনে আমার তাঁবুর ভিতরটা পরিপূর্ণ হয়ে গেল–কোনও মানুষেরই কণ্ঠ সে রকম অমানুষী গর্জন করতে পারে না!
শিউরে উঠে বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি বন্দুকটা তুলে নিলুম এবং সেই মুহূর্তেই মূর্তিটা সাঁৎ করে তাঁবুর ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল!
এবং তার পরেই বাহির থেকে শুনলুম, ঘন ঘন হিংস্র গর্জন ও সর্দারের গলায় আর্তনাদের পর আর্তনাদ।
ঝড়ের বেগে বন্দুক নিয়ে বাইরে ছুটে গেলুম!
চাঁদের আলোয় সভয়ে দেখলুম, তাঁবুর দরজার সামনেই সর্দার মাটির ওপরে পড়ে গোঁ গোঁ ও ছটফট করছে এবং একটা ঘোর কালো বিভীষণা নগ্ন মূর্তি সর্দারের দেহ বৃহৎ সর্পের মতন দুই কৃষ্ণ বাহু দিয়ে চেপে রেখে তার টুটি কামড়ে ধরেছে প্রাণপণে! মূর্তিমতী হিংসা!
বন্দুক ছোড়বার উপায় নেই সর্দারের গায়ে গুলি লাগবার ভয়ে। বন্দুক তুলে আমি সেই ভীষণ মূর্তির মাথায় কুঁদো দিয়ে করলুম প্রচণ্ড এক আঘাত!
মূর্তিটা তীব্র–তীক্ষ স্বরে পশুর মতন একটা বিশ্রী আর্তনাদ করে ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল–তার মাথার এলানো আঁকড়া চুলগুলো চারিদিকে ঠিকরে পড়ল–তারপর সে আমাকে লক্ষ করে আহত কেউটের মতন এক লাফ মারলে–আমি দুই পা পিছিয়ে এলুম এবং সে আবার ঘুরে মাটির ওপরে আছাড় খেয়ে পড়ে মড়ার মতন স্থির হয়ে রইল।
সর্দারের কাছে দৌড়ে গেলুম, কিন্তু সে নিজেই উঠে বসল।
সর্দার, সর্দার, তোমার গলা দিয়ে রক্ত ঝরছে!
সর্দার কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে বললে, বেশি কামড়াতে পারেনি, কিন্তু আপনি আর একটু দেরি করলেই আমি মারা পড়তুম! কিন্তু কিন্তু–ও কীসের আওয়াজ? সে অত্যন্ত ভীত ভাবে চারিদিকে তাকাতে লাগল।
সত্য! নিঝুম রাত্রে আচম্বিতে অরণ্য যেন সজাগ হয়ে উঠেছে। মাটি থরথর করে কাঁপছে, বনের গাছ মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে, বাঁশঝাড় টলমল করে টলছে! সঙ্গে-সঙ্গে একটা একটানা অব্যক্ত, অদ্ভুত ও ভীতিময় সমবেত কণ্ঠধ্বনি ধীরে-ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
ততক্ষণে আমাদের সমস্ত কুলি ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়েছে। প্রায় পরিপূর্ণ চন্দ্র তখন মাঝ আকাশে সমুজ্জ্বল মহিমায় বিরাজ করছে, আলো আঁধারিমাখা অপূর্ব বনভূমির ধার দিয়ে। চকচকে রুপোলি পাড়ের মতন নদীটি আপন মনে বয়ে যাচ্ছে কলসংগীতে মুখর হয়ে, এবং তৃণশ্যামল ভূমির ওপরে আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে স্বপ্নময় জ্যোৎস্না!
কিন্তু এই সমস্ত সৌন্দর্যকেই ব্যর্থ করে দিলে সেই ক্রমবর্ধমান অজ্ঞাত সম্মিলিত কণ্ঠের ভয় জাগানো কোলাহল! আমরা সকলে মিলে কী একটা আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় অভিভূত হয়ে আড়ষ্ট নেত্রে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম,–সর্দারও তাড়াতাড়ি উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়াল তার চোখদুটো তখন ভয়ে যেন ঠিকরে পড়ছে।
পূর্বদিকের অরণ্যের ভিতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ভীত পাখিরা ব্যাকুল স্বরে চিৎকার করে বাস ছেড়ে উড়ে পালাল, গোটাকয়েক সোনালি বানর ও একটা চিতাবাঘ সামনের জমি পার হয়ে পশ্চিম দিকে বেগে দৌড় দিলে!
সর্দার অস্ফুট স্বরে কাঁপতে কাঁপতে বললে, হুজুর, ওইদিকে! ওইদিকে থেকেই ওরা আসছে!
অভাবিত কোনও বিভীষিকায় আমার গলা শুকিয়ে এসেছিল, কোনওরকমে জিজ্ঞাসা করলুম, ওরা? ওরা মানে কারা?
কিন্তু সর্দারের গলা দিয়ে আর কোনও কথা বেরুল না,–তার মুখ মড়ার মতন সাদা।
সেই বিপুল–অথচ অব্যক্ত কোলাহল তখন খুব কাছে এসে পড়েছে এবং মাটিতে তখন লেগেছে যেন ভূমিকম্পের ধাক্কা! আমি এমন অপার্থিব কোলাহল আর কখনও শুনিনি–এ মানুষের কোলাহল নয়, কিন্তু এরকম কোলাহল তুলতে পারে এমন কোনও জন্তুও পৃথিবীতে আছে বলে জানি না।
হঠাৎ পূর্ব দিকের বাঁশঝাড়ে যে ঝড়ের মতন লাগলকতকগুলো খুব বড় বাঁশ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গেল!
তার পরেই–ও কী ও? ওরা কারা? জ্যোত্সাময় রাত্রে অরণ্যের স্বচ্ছ ছায়ায় দেখা যাচ্ছে এক জমাট অন্ধকারের জীবন্ত প্রাচীর!
স্তম্ভিত নেত্রে ভালো করে তাকিয়ে দেখলুম, সেই অন্ধকার প্রাচীরের যেন অসংখ্য বাহু আছে বাহুগুলো মানুষের বাহুর মতন!
এমন সময়ে আমার পাশ থেকে একটা কালো বীভৎস মূর্তি বিদ্যুতের মতন ছুটে বেরিয়ে গেল–সে ছুটছে ওই অগণ্য বাহুকণ্টকিত জীবন্ত অন্ধকার প্রাচীরের দিকেই!
এক পলকের জন্যে ফিরে দেখলুম, মাটির ওপরে সেই অচেতন দানবী মুর্তিটা আর নেই কখন তার জ্ঞান হয়েছে আমরা কেউ দেখতে পাইনি, দেখবার সময়ও ছিল না!
দেখতে-দেখতে মূর্তিটা সেই বিরাট অন্ধকার প্রাচীরের ভিতরে মিলিয়ে গেল!
আমি সেইদিকে লক্ষ করে বন্দুক তুলে গুলির পর গুলি ছুঁড়তে লাগলুম,–উত্তেজনায়, দুর্ভাবনায়, ভয়ে ও বিস্ময়ে আমি যেন পাগলের মতন হয়ে উঠলুম কাল রাত্রে টোটার মালা পরেই শুয়েছিলুম–বন্দুকে গুলি ভরি, আর ছুড়ি! নৈশ আকাশ আমার বন্দুকের ঘন ঘন গর্জনে বিদীর্ণ হয়ে যেতে লাগল, কতবার যে বন্দুক ছুড়লুম তা আমি জানি না!
হঠাৎ সর্দার আমার হাত চেপে ধরে বললে, হুজুর, মিথ্যে আর টোটা নষ্ট করছেন কেন?
তখন আমার হুঁশ হল! চক্ষের উদভ্রান্ত ভাব কেটে গেল, পূর্ব দিকে তাকিয়ে আর সেই জীবন্ত অন্ধকার প্রাচীরকে দেখতে পেলাম না! সেই অব্যক্ত ভীম কোলাহলের বিভীষিকাও আর নেই এবং বাঁশঝাড়ও আঁকা ছবির মতন একেবারে স্থির!
