অবিনাশবাবু বললেন, এই হাতের লেখা যে জয়ন্তের তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই।
রামচরণ বললে, হা, হাতের লেখাটা তারই মতন দেখতে বটে। কিন্তু হাতের লেখাটা নিয়ে কী হবে, আমি যে লোকটাকে স্বচক্ষে দেখেছি!
অবিনাশবাবু সবিস্ময়ে বললেন, স্বচক্ষে দেখেছ?
রামচরণ বললে, হ্যাঁ। একদিন ঘরের দরজা দৈবগতিকে ভোলা ছিল। হঠাৎ আমি এইখানে এসে পড়ি। আমাদের বাবু আমার দিকে পিছন ফিরে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কতকগুলো ওষুধের আর আরকের শিশি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। তিনি আমার পায়ের শব্দে চমকে মুখ তুলে তাকিয়েই সাঁৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেলেন! আমি চকিতের জন্যে তাকে দেখেছিলুম– কিন্তু সেইটুকুর মধ্যেই যা দেখলুম তাতে আমার মাথার চুলগুলো পর্যন্ত ভয়ে খাড়া হয়ে উঠল। বাবু, তিনিই যদি আমাদের মনিব হবেন তাহলে মুখে তিনি মুখোশ পরেছিলেন কেন? তিনিই যদি আমাদের মনিব হবেন তাহলে আমার সুমুখ থেকে অমন ইঁদুরের মতন পালিয়ে যাবেন কেন? আমি কি তার পুরোনো চাকর নই? তারপর–বলতে বলতে থেমে পড়ে রামচরণ দুই হাতে তার মুখ ঢেকে ফেললে।
অবিনাশবাবু বললেন, ব্যাপারটা এতক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার বাবুর মুখে বোধহয় হঠাৎ কোনও রোগের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। সেইজন্যেই তিনি মুখোশ পরে আছেন, কারুর সঙ্গে দেখা করছেন না, আর ওষুধ আনবার জন্যে বারবার লোক পাঠাচ্ছেন। এছাড়া আর কিছু কারণ থাকতে পারে না। রামচরণ, মিছেই আমরা ভয় পেয়েছি।
রামচরণ মাথা নেড়ে বললে, না বাবু, তিনি কখনও আমাদের মনিব নন! আমাদের বাবু লম্বা-চওড়া আর এ লোকটা বেঁটে,–দেখতে ঠিক বামনের মতো। আপনি কি বলতে চান বিশ বছর এখানে থেকেও আমার বাবুকে দেখতে আমি ভুল করব?
অবিনাশবাবু বললেন, তুমি যখন এত জোর করে বলছ, তখন তোমার কথা আমাকে মানতেই হবে! বেশ, আমি না হয় পরীক্ষাগারের দরজা ভেঙে ফেলবারই ব্যবস্থা করছি!
রামচরণ উৎসাহিত স্বরে বললে, তাই করুন বাবু, তাই করুন! আমি এখনি আপনাকে কুড়ুল এনে দিচ্ছি!
রামচরণ তাড়াতাড়ি একখানা কুড়ুল নিয়ে এসে হাজির করলে।
অবিনাশবাবু বললেন, হ্যাঁ, আর এক কথা, তুমি যাকে দেখেছ তাকে চিনতে পেরেছ কি?
রামচরণ বললে, আপনি যখন জিজ্ঞাসা করছেন তখন বলতে হয়। সে আর কেউ নয়, তিনকড়ি বটব্যাল!
অবিনাশবাবু চমকে উঠে বললেন, কী বললে?
হ্যাঁ, ঘরের ভেতরে আমি তিনকড়ি বটব্যালকেই দেখেছি! তার ভাবভঙ্গি আর চলবার ধরন কীরকম অদ্ভুত তা তো আপনি জানেন? আমাকে দেখে ঘরের ভেতর থেকে সে যখন অদৃশ্য হল, তখন আমার মনে হল ঠিক যেন একটা বড়জাতের বাঁদর লাফ মেরে পালিয়ে গেল! বাবু, আমি হলফ করে বলতে পারি, সে ওই তিনকড়ি ছাড়া আর কেউ নয়!
অবিনাশবাবু বললেন, এতক্ষণে তোমার কথায় আমার বিশ্বাস হচ্ছে! রামচরণ, তিনকড়ি হচ্ছে মূর্তিমান শনি! সে যখুনি তোমার বাবুর সঙ্গে-সঙ্গে মিশেছিল, তখুনি আমি বুঝেছিলুম যে তোমার বাবুর অদৃষ্ট ভালো নয়! হ্যাঁ, তিনকড়ি নিশ্চয়ই আমার বন্ধুকে খুন করেছে। আর হয়তো কোনও গুঢ় কারণে জয়ন্তের ঘরেই লুকিয়ে আছে। এখন আমাদের যা কর্তব্য তাই করি এসো। লোকজনদের ডাকো!
রামচরণের হাঁকাহাঁকিতে দারোয়ান ও অন্যান্য ভৃত্যরা সেখানে এসে হাজির হল।
অবিনাশবাবু বললেন, তোমরা সবাই লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি হও। জনকয় লোক আমাদের সঙ্গে থাকো, বাকি সবাই এই বাড়ির খিড়কির দরজার কাছে গিয়ে পাহারা দিক। কেউ যেন সে দরজা দিয়ে বাইরে বেরুতে না পারে। এসো রামচরণ, আমরা আবার ওপরে যাই।
অবিনাশবাবু সকলকে নিয়ে দোতলায় উঠে আবার পরীক্ষাগারের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং সেইখান থেকেই শুনতে পেলেন, ঘরের ভিতরে কে এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত পায়চারি করে বেড়াচ্ছে!
রামচরণ বললে, দিনে-রাতে যখুনি এখানে আসি, তখুনি শুনি ওর পায়ের শব্দ! এ শব্দের আর বিরাম নেই! রাতেও ঘুমোয় না, ঘরময় চলে বেড়ায়! আপনি ভালো করে কান পেতে শুনে দেখুন, ও কি আমার বাবুর পায়ের শব্দ?
অবিনাশবাবু শুনে বুঝলেন, রামচরণের কথাই সত্য! জয়ন্তের পায়ের শব্দ অন্যরকমই বটে! তিনি বললেন, এই পায়ের শব্দ ছাড়া আর কিছু তোমরা শুনেছ?
রামচরণ বললে, শুনেছি। একদিন সে কাঁদছিল!
কাঁদছিল?
আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু, সে স্ত্রীলোকের মতন কাতরভাবে কাঁদছিল–যেন নরকযন্ত্রণা ভোগ। করছে! সে-কান্না কান পেতে শোনা যায় না!
অবিনাশবাবু গম্ভীর মুখে দরজায় কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর চেঁচিয়ে বললেন, জয়ন্ত! আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই!
ঘরের ভিতর থেকে সাড়া এল না।
অবিনাশবাবু আবার বললেন, জয়ন্ত, আমাদের মনে সন্দেহ হয়েছে! হয় তুমি দরজা খোলো, নয় আমরা দরজা ভেঙে ফেলব!
ঘরের ভিতর থেকে আকুলভাবে কে বলে উঠল, অবিনাশ, অবিনাশ! দয়া করো– দরজা ভেঙো না!
অবিনাশবাবু বললেন, এ তো জয়ন্তের গলা নয়–এ যে তিনকড়ির গলার আওয়াজ! রামচরণ, ভাঙো দরজা!
দরজার ওপরে কুড়লের পর কুড়ুলের ঘা পড়তে লাগল।
ঘরের ভিতরে কে দারুণ আতঙ্কে তীক্ষ্ণ স্বরে পশুর মতো আর্তনাদ করে উঠল! আরও বারকয়েক কুড়ুলের ঘা খেয়েই দরজাটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। সকলে সভয়ে উঁকি মেরে
ঘরের ভিতরটা দেখবার চেষ্টা করতে লাগল।
ঘরের ঠিক মাঝখানে কার্পেটের ওপরে একটা মূর্তি উপুড় হয়ে পড়ে তখনও কেন্নোর মতো কুঁকড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে।
