জয়ন্ত মৃদু হাসি হেসে বললেন, সেকথা মন্দ নয় কিন্তু বলতে বলতেই আচম্বিতে তার মুখের ওপর থেকে হাসির আলো যেন দপ করে নিবে গেল এবং তার বদলে সেখানে ফুটে উঠল এমন ভয়ংকর নিরাশা ও বিভীষিকার ভাব যে, অবিনাশবাবু ও সদানন্দবাবু–দুজনেরই বুক যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল এবং উপরকার জানলাটাও সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল! কিন্তু তারা যেটুকু দেখেছিলেন সেইটুকুই যথেষ্ট, তারা সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারলেন না, দ্রুতপদে বাইরে বেরিয়ে এসো বাড়িখানাকে পিছনে ফেলে তাড়াতাড়ি অনেকটা এগিয়ে গেলেন!
তারপর অবিনাশবাবু আতঙ্কগ্রস্ত কণ্ঠে বললেন, কী ভয়ানক, কী ভয়ানক!
সদানন্দবাবু গম্ভীর মুখে কেবল মাথা নেড়েই সায় দিলেন।
.
অষ্টম । শেষ-রাত্রি
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর অবিনাশবাবু একখানা ইজিচেয়ারে শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন।
এমন সময় অতিশয় বিবর্ণ মুখে জয়ন্তের পুরোনো চাকর রামচরণ এসে হাজির!
তার মুখের দিকে তাকিয়েই অবিনাশবাবু সচমকে বললেন, কী রামচরণ, তোমার বাবুর কি অসুখ করেছে?
রামচরণ উদ্বিগ্নভাবে বললে, কী হয়েছে জানি না, কিন্তু একটা কিছু হয়েছেই।
অবিনাশবাবু বললেন, অমন করে বললে চলবে না। আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দাও।
রামচরণ বললে, বাবু আজকাল কীরকম মানুষ হয়েছেন আপনি তো সব জানেন। প্রায়ই তিনি ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে থাকেন। অন্য অন্য বারে বাবু মাঝে-মাঝে এক-আধ বার বাইরে বেরুতেন, কিন্তু আজ এক হপ্তার ভেতরে ঘরের দরজা তিনি একবারও খোলেননি! তাই আমার বড় ভয় হচ্ছে।
অবিনাশবাবু বললেন, ভয়! কীসের ভয়?
আমার মনে হয়, বাবুর কোনও অনিষ্ট হয়েছে!
আঃ, কী যে বলো তার ঠিক নেই! অনিষ্ট আবার কী হবে?
আমার বলতে ভরসা হচ্ছে না, বাবু! তার চেয়ে আপনি নিজেই গিয়ে বরং সব দেখে আসবেন চলুন!
অবিনাশবাবু আর দ্বিরুক্তি না করে তখনই উঠে জামাকাপড় পরে রামচরণের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন।
শীতের কনকনে রাত। চাঁদের মুখ মড়ার মতন হলদে। হাওয়া যেন বরফ-জলে স্নান করে কাঁদতে কাঁদতে বয়ে যাচ্ছে। ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে অবিনাশবাবু পথের পর পথ। পার হয়ে গেলেন, কিন্তু কোনও জনপ্রাণীর সাড়া নেই। আজকের এই কুয়াশামাখা শীতার্ত রাত্রি পৃথিবী থেকে যেন সমস্ত জীবনের চিহ্ন মুছে দিয়েছে। এই সমাধির স্তব্ধতা অবিনাশবাবুর ভালো লাগল না। শীত সওয়া যায়, এ মরণের নীরবতা অসহনীয়। এই স্তব্ধতা তার মনের ভিতরে যেন একটা অমঙ্গলের পূর্বাভাস এনে দিলে।
জয়ন্তর বাড়ির কাছে এসে রামচরণ বললে, মা কালী যেন মুখ তুলে চান, বাবু যেন ভালো থাকেন–এই বলে সে দরজায় করাঘাত করলে।
দরজাটা ভিতর থেকে খুলে একজন দারোয়ান দরজায় ফাঁক দিয়ে অত্যন্ত ভীত একখানা মুখ বার করলে।
রামচরণ বললে, ভয় নেই মঙ্গল সিং, আমরা এসেছি।
অবিনাশবাবু ভিতরে প্রবেশ করেই দেখলেন, বাড়ির অন্যান্য দাস-দাসী ও দারোয়ানরা সকলে মিলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে জটলা করছে,–প্রত্যেকেরই মুখে ব্যাকুল আতঙ্কের চিহ্ন।
রামচরণ বললে, তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে গোলমাল কোরো না। অবিনাশবাবুকে পথ ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াও।…বাবু, আপনি পা টিপে টিপে আমার সঙ্গে আসুন।
রামচরণের সঙ্গে-সঙ্গে অবিনাশবাবু যে বাড়িতে জয়ন্তের পরীক্ষাগার আছে সেই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন। দোতলায় উঠে দুজনে পরীক্ষাগারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
পরীক্ষাগারের দরজার সম্মুখে গিয়ে রামচরণ চেঁচিয়ে বললে, বাবু! অবিনাশবাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে বিরক্তিভরা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, তাকে বলো গে যাও আমি কারুর সঙ্গে দেখা করতে পারব না!
রামচরণ অবিনাশবাবুকে নিয়ে আবার নীচে নেমে এল। তারপর আবার বললে, এখন বলুন তো বাবু, ঘরের ভিতর থেকে যে গলার আওয়াজটা শুনলেন, সেটা কি আমাদের বাবুর গলার আওয়াজ?
অবিনাশবাবু বললেন, জয়ন্তের গলার আওয়াজ অন্যরকম শোনাল বটে।
রামচরণ বললে, অন্যরকম? হ্যাঁ, অন্যরকম শোনাবেই তো! আজ বিশ বছর এখানে চাকরি করছি, বাবুর গলার আওয়াজ আমি চিনি না? ও কখনওই আমার বাবুর গলার আওয়াজ নয়!
অবিনাশবাবু বললেন, এ ভারি আশ্চর্য কথা! ধরো তোমার কথাই যদি সত্য হয়, জয়ন্তকে যদি কেউ খুনই করে থাকে, তাহলে খুনি পালিয়ে না গিয়ে এই ঘরের ভিতরেই বসে থাকবে কেন? রামচরণ, তোমার সন্দেহের কোনও মানেই হয় না!
রামচরণ বললে, বাবু, দেখছি আপনি সহজে আমার কথায় বিশ্বাস করবেন না! বেশ, তাহলে আরও শুনুন, বাবু–কিংবা বাবুর নামে যে হতভাগা লোকটা ওই ঘরের ভেতরে আছে, সে আজ সাত দিন ধরে খালি ওষুধ ওষুধ বলে চিৎকার করছে। জানলা গলিয়ে ওষুধের নাম লিখে রোজই সে কাগজের পর কাগজ ফেলে দেয়, আর তাই নিয়ে সারা শহরের সমস্ত ওষুধের দোকানে ছুটোছুটি করে আমাকে মরতে হয়। কিন্তু কোনও ওষুধই ও লোকটার পছন্দ হয় না।
অবিনাশবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ও রকম কোনও কাগজ তোমার কাছে আছে?
রামচরণ নিজের ফতুয়ার পকেটের ভিতর থেকে একখানা কাগজ বার করে দিলে। কাগজখানা নিয়ে অবিনাশবাবু খুব মন দিয়ে পড়তে লাগলেন। জয়ন্ত কোনও ঔষধালয়ের মালিককে লিখেছেন : আপনি যে ঔষুধটি পাঠিয়েছেন তা একেবারেই অকেজো। দু-বছর আগে আমার ফরমাসে আপনি এই ঔষধটাই অনেক বেশি পরিমাণে আনিয়ে রেখেছিলেন। সেবারে যেখান থেকে ঔষধ আনানো হয়েছিল আবার সেইখানেই ভালো করে খোঁজ নিন। একেবারে খাঁটি ঔষধ না হলে আমার চলবে না। এ ঔষধ যে আমার কতটা দরকারি, সে কথা বোধহয়। আপনি ভালো করে বুঝতে পারেননি। এই ঔষধই আমি চাই, যেখান থেকে পারেন আনিয়ে দিন, এজন্যে যত টাকা খরচ করতে হয় তা করতে আমি রাজি আছি।
