অবিনাশবাবু মনে করলেন, করুণার সঙ্গে জয়ন্তের নিশ্চয়ই খুব ঝগড়া হয়েছে। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, ছিঃ করুণা, পাগলামি কোরো না! জয়ন্তের সঙ্গে যদি তোমার কিছু মনোমালিন্য হয়ে থাকে, তাহলে দুদিনেই তা দূর হয়ে যাবে! কী হয়েছে সব আমাকে খুলে বলো।
কী হয়েছে, সেকথা তুমি তাকেই জিজ্ঞাসা করে দ্যাখো।
জয়ন্ত আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি নয়।
এ কথা শুনে আমি আশ্চর্য হলুম না। কিন্তু আমি তোমাকে কিছুই বলতে পারব । আমার মৃত্যুর পরে তুমি হয়তো সব কথাই জানতে পারবে, কিন্তু এখন নয়। অবিনাশ, তুমি বোসো। অন্য কথা কও। কিন্তু দোহাই তোমার! জয়ন্তের নাম আমার কাছে কোরো না–আমি কিছুতেই তা সইতে পারব না!
সেদিন বাড়িতে ফিরে এসে অবিনাশবাবু জয়ন্তকে একখানা চিঠি লিখে জানতে চাইলেন যে, করুণার সঙ্গে কী নিয়ে তাঁর মনান্তর হয়েছে, আর কেনই বা তিনি কারুর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে চাইছেন না?
উত্তরে জয়ন্তের কাছ থেকে এই করুণ পত্রখানি এলঃ
ভাই অবিনাশ,
আমাকে তুমি ক্ষমা করো। করুণার সঙ্গে কেন যে আমার মনান্তর হয়েছে, তার কারণ আমি তোমাকেও বলতে পারব না। তবে এইটুকু জেনে রেখো, আমাদের এই মনোমালিন্য এ জীবনে আর দূর হবার নয়। করুণাকে আমি কোনও কিছুর জন্যেই দায়ী করছি না। কিন্তু তার সঙ্গে আমার আর দেখা না হওয়াই দুজনের পক্ষেই মঙ্গল।
এখন থেকে আমি সকলকার চোখের আড়ালেই বাস করব। যদি তোমার সঙ্গে দেখা না হয় তাহলে তুমি আমার বন্ধুত্বে যেন সন্দেহ কোরো না। আমাকে তুমি অবাধে নিজের পথে এগিয়ে যেতে দাও। আমি এখন স্বখাত-সলিলে ডুবে মরছি–যে বিভীষিকা আর যে যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে আমার নিশিদিন কাটছে, পৃথিবীতে তা অসম্ভব বলেই মনে হয়। আমি যদি পাপী হই তবে পাপের শাস্তিও ভোগ করছি আমিই। এর পরে তুমি আমার এই উপকারটি কেবল করতে পারো। আমার মৌনব্রত ভাঙবার চেষ্টা কোরো না।
চিঠিখানা হাতে করে অবিনাশবাবু অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন? এ আবার কী হল! আপদ তিনকড়ি তো কোন চুলোয় দূর হয়েছে, জয়ন্ত আবার আগেকার মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তার মুখ আবার হাসিখুশি ও শান্তিতে ভরে উঠেছিল, কিন্তু আচম্বিতে আবার এই অভাবিত পরিবর্তন কীসের জন্যে? জয়ন্ত উন্মাদ রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি তো? কিন্তু তাই বা কেমন করে হবে? করুণার কথা শুনে বেশ বোঝা যায়, এর ভিতরে অন্য কোনও রহস্যময় কারণ আছে!
এক সপ্তাহ পরে অবিনাশবাবু স্তম্ভিতভাবে শ্রবণ করলেন, করুণার মৃত্যু হয়েছে।
পরদিন সকালে করুণার বাড়ি থেকে তার নামে একখানা সিলকরা চিঠি এল। তার ওপরে করুণার হাতে লেখা রয়েছে, এই পত্ৰ শ্ৰীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র সেন ছাড়া আর কেউ খুলতে পারবেন না। কিন্তু এই পত্র তাঁর হাতে যাবার আগে যদি তার মৃত্যু হয়, তাহলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
অবিনাশবাবু সিলমোহর ভেঙে মোড়কটা খুলে ফেললেন। তার ভিতরেও সিলমোহর করা আর একখানা পত্র এবং তার ওপরে লেখা–ডাক্তার জয়ন্তকুমার রায় যেদিন পরলোকগত অথবা অদৃশ্য হবেন, তার আগে এই পত্র কেউ পাঠ করতে পারবেন না।
অবিনাশবাবু বিস্ময়ের আর সীমা রইল না। জয়ন্তের অদ্ভুত উইলেও তাঁর অদৃশ্য হওয়ার সম্ভাবনার কথা আছে। করুণাও আবার সেই অদৃশ্য হওয়ার কথাই লিখেছে! এর কী সঙ্গ ত কারণ থাকতে পারে? জয়ন্ত কেন অদৃশ্য হবে? আর এই রহস্যময় লুকোচুরিরই বা কী হেতু আছে?
অবিনাশবাবুর মনে একটা প্রবল প্রলোভন জেগে উঠল, সিল ভেঙে করুণার পত্ৰখানা আদ্যপ্রান্ত পড়ে দেখবার জন্যে। কিন্তু তিনি অ্যাটর্নি মানুষ, শিক্ষার গুণে এই দুর্দান্ত প্রলোভনকেও সংবরণ করলেন।
.
সপ্তম। জানলার ধারে
সে এক রবিবার। বৈকালের কিছু পরে সদানন্দবাবুর সঙ্গে অবিনাশবাবু তাঁদের নিয়মিত ভ্রমণে বেরিয়েছেন। বেড়াতে-বেড়াতে তাঁরা আবার সেই অদ্ভুত বাড়িখানার সামনে এসে পড়লেন।
সদানন্দবাবু বললেন, আমার গল্প ফুরিয়ে গেল! আর তিনকড়ির দেখা পাওয়া যাবে না।
অবিনাশবাবু বললেন, বোধহয় নয়।
আচ্ছা অবিনাশ, এই বাড়ির ভিতর দিয়ে জয়ন্ত ডাক্তারের বাড়ির ভিতরে যাওয়া যায়, প্রথম দিনে তুমি তো একথা আমাকে বলোনি!
তা বলিনি। কিন্তু সেকথা এখন থাক। বাড়ির সদর দরজাটা খোলা রয়েছে দেখছি। এসো, একবার ভিতরে ঢুকে জয়ন্তের খবর নেওয়া যাক।
অবিনাশবাবুর সঙ্গে সদানন্দবাবু বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন। উঠোনের কাছে গিয়ে উপরপানে তাকিয়েই তারা দেখতে পেলেন, দোতলার একটা জানলার ধারে জয়ন্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন।
অবিনাশবাবু এত সহজে বন্ধুর দুর্লভ দেখা পেয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, এই যে জয়ন্ত! কেমন আছো হে?
অত্যন্ত উদাসীনভাবে শুষ্ক স্বরে জয়ন্ত বললেন, মোটেই ভালো নয়। আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে।
অবিনাশবাবু বললেন, দিনরাত ঘরে বন্দি হয়ে থেকেই তোমার শরীর এমন কাহিল হয়ে পড়েছে! এসো-এসো জামাকাপড় ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসো! চলো, আমাদের সঙ্গে খোলা হাওয়ায় খানিকক্ষণ বেড়িয়ে আসবে চলো!
জয়ন্ত কিছুমাত্র উৎসাহ প্রকাশ না করে বললেন, হ্যাঁ, আমারও তোমাদের সঙ্গে বাইরে যাবার ইচ্ছে হচ্ছে! কিন্তু না, না, তা অসম্ভব, একেবারেই অসম্ভব!
অবিনাশবাবু বললেন, বেশ তো, তাহলে এইখানেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করা যাক না কেন!
