অনন্ত আবার বললে, আপিসের অনেক কাজ বাকি আছে–
অবিনাশবাবু বাধা দিয়ে বললেন, থাক গে বাকি, তুমি এক কাজ করো তো অনন্ত। আমি আজ একটা অদ্ভুত ধাঁচের হাতের লেখা পেয়েছি। তুমি একবার দেখবে?–এই বলে তিনি তিনকড়ির লেখা সেই চিঠিখানা বার করে তার হাতে দিলেন।
অনন্ত চিঠিখানার ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে বললে, একি সেই তিনকড়ি, যে জয়ন্তবাবুর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী? এই কি কালকে খুন করে পালিয়েছে?
অবিনাশবাবু বললেন, হ্যাঁ অনন্ত, এ সেই তিনকড়ি। শুনেছি, হাতের লেখা দেখে লোকের চরিত্র বোঝা যায়। দ্যাখো দেখি, এই চিঠিখানা পড়ে তিনকড়ির চরিত্র তুমি কিছু বুঝতে পারো কি না?
অনন্ত টেবিলের ওপরে চিঠিখানা রেখে বললে, এ হাতের লেখাটা অদ্ভুত বটে! তারপরে চিঠির ওপরে ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে হাতের লেখা পরীক্ষা করতে লাগল। খানিক পরে সে বললে, আচ্ছা, আপনার কাছে জয়ন্তবাবুর কোনও চিঠি আছে? আমি একবার দেখব।
আছে বইকী। এই টেবিলের টানাতেই আছে–এই বলে অবিনাশবাবু টেবিলের টানা থেকে একখানা চিঠি বার করে এগিয়ে দিলেন।
অনন্ত সে-চিঠিখানা টেবিলের ওপর তিনকড়ির চিঠির পাশে রাখলে। তারপর মিনিট পাঁচেক পরীক্ষা করে যেন নিজের মনেই মৃদু স্বরে বললে, আশ্চর্য ব্যাপার!
অবিনাশবাবু কিঞ্চিৎ বিস্মিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, কী আশ্চর্য ব্যাপার, অনন্ত? আর, তুমি ও চিঠি দুখানা একসঙ্গে মিলিয়ে কী দেখছ?
অনন্ত বললে, মশাই, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! এই চিঠি দুখানা দুরকম করে লেখা বটে, কিন্তু আমার মনে হয় এ দুখানা চিঠিই এক হাতের লেখা!
ভারী আশ্চর্য তো!
আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই! কোথায় জয়ন্তবাবু আর কোথায় তিনকড়ি! মানব আর দানব
অবিনাশবাবু তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললেন, অনন্ত! মনে রেখো, চিঠিখানা গোপনীয়!
যে আজ্ঞে। বুঝেছি।–বলে অনন্ত গম্ভীর মুখে সে-ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অবিনাশবাবু তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে তিনকড়ির চিঠিখানা লোহার সিন্দুকের মধ্যে পুরে ফেললেন। তারপর বিবর্ণ মুখে সভয়ে নিজের মনে বলে উঠলেন, কী! একটা নরপিশাচের জন্যে জয়ন্ত এই চিঠি জাল করেছে!–তার দেহের রক্ত যেন ঠান্ডা হয়ে গেল!
.
ষষ্ঠ । করুণার শেষ পত্র
দিনে দিনে অনেকদিন কেটে গেল! কুমার মনোমোহন চৌধুরীর হত্যার কোনও কিনারাই হল না। পুলিশ থেকে হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হল, কিন্তু তিনকড়ির টিকিটি পর্যন্ত কেউ দেখতে পেলে না। পৃথিবী যেন তাকে একেবারেই গ্রাস করে ফেললে।
পুলিশ একে-একে তার জীবনের অনেক ঘটনাই আবিষ্কার করেছে। সে যাদের সঙ্গে মেলামেশা করত তাদের মধ্যে একজনও ভদ্রলোক ছিল না এবং অনেকেই ছিল জেলফেরত দাগি আসামি। তাদের সঙ্গে মিলে সে যেসব জঘন্য ও নিষ্ঠুর কাজ করত, তা শুনলেও মন ঘৃণায় ও ভয়ে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
জয়ন্তের জন্যে অবিনাশবাবুর দুর্ভাবনা এখন অনেকটা কমে এসেছে; কারণ তিনকড়ির ঘৃণিত মূর্তি আর তার বন্ধুর আশেপাশে ঘোরাফেরা করে না। তিনি মনে করলেন, অমঙ্গ ল থেকেই মঙ্গলের জন্ম হয় কুমার মনোমোহন চৌধুরীর জীবন নষ্ট হল বটে, কিন্তু তার বিনিময়ে ডাক্তার জয়ন্তের জীবন ভীষণ এক রাহুর গ্রাস থেকে মুক্তিলাভ করলে!
ডাক্তার জয়ন্ত আবার তাঁর আগেকার স্বভাব ফিরে পেলেন। বরাবরই তিনি দানশীল ছিলেন, গরিবের দুঃখ-কষ্ট দেখলেই মুক্ত-হস্তে দান করতেন– তার ওপরে এখন তার ধর্মানুরাগও হঠাৎ যেন আরও প্রবল হয়ে উঠল। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় তাঁর বৈঠকখানায় আবার নিয়মিতভাবে বন্ধুর আসর বসতে লাগল এবং সে আসরে জয়ন্ত এখন ধর্মের কথা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করতে ভালোবাসেন। এইভাবে দুটি দীর্ঘ মাস কেটে গেল বেশ নিরাপদে।
তারপর অবিনাশবাবুর মনে আবার একটা খটকা লাগল। একদিন সন্ধেবেলায় তিনি নিয়মমতো জয়ন্তের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। বাড়ির ভিতরে ঢুকতে-না-ঢুকতেই রামচরণ এসে খবর দিলে, বাবুর শরীর ভালো নয়, তিনি কারুর সঙ্গে দেখা করবেন না! পরদিন ও তারপর আরও তিন দিন জয়ন্তের বাড়িতে গিয়ে অবিনাশবাবু এইভাবে ধুলোপায়েই ফিরে এলেন। তখন তিনি একটু আশ্চর্য হয়ে ব্যাপার কী জানবার জন্যে ডাক্তার করুণার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
করুণার বাড়ি থেকে যদিও তাঁকে ধুলোপায়েই ফিরে আসতে হল না, কিন্তু ভিতরে গিয়ে বন্ধুর চেহারা দেখে তার চক্ষু স্থির হয়ে গেল। বিছানার ওপরে স্থির হয়ে করুণা শুয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর অমন যে ধবধবে গায়ের রং, আজ যেন কালিমাখা হয়ে গেছে। এই কয়দিনের ভিতরেই তিনি যেন বুড়ো হয়ে পড়েছেন এবং তাঁর মুখের ওপরে ফুটে উঠেছে। আসন্ন মৃত্যুর অপচ্ছায়া!
অবিনাশবাবু সবিস্ময়ে বললেন, করুণা, একী! তোমার একী চেহারা হয়েছে!
করুণা আস্তে-আস্তে উঠে বসে বললেন, আমি দারুণ আঘাত পেয়েছি অবিনাশ, দারুণ আঘাত! এ আঘাত আমি বোধহয় আর সামলাতে পারব না! আমি ডাক্তার, সুতরাং বেশ বুঝতে পারছি আমার জীবনের কোনওই আশা নেই। মরতে আমি চাই না অবিনাশ, কিন্তু মরতে আমাকে হবেই!
অবিনাশবাবু বললেন, ব্যাপার যে কী কিছুই বুঝতে পারছি না। এদিকে তোমার অসুখ, ওদিকে জয়ন্তের অবস্থাও–
করুণার মুখের ভাব এক লহমায় বদলে গেল! একখানা কম্পমান হাত তুলে অত্যন্ত বিরক্তভাবে উচ্চৈঃস্বরে তিনি বললেন, থামো, থামো! ও-নাম আমার কাছে আর কোরো না– আমার মতে জয়ন্তের মৃত্যু হয়েছে! মরা লোকের নাম আমি শুনতে চাই না!
