হত্যার পরদিনই অবিনাশবাবু জয়ন্তের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। খানিক পরে রামচরণ এসে তাঁকে নিয়ে গেল। তারপরে রামচরণ তাকে যখন খিড়কির দরজা দিয়ে পরীক্ষাগারের ভিতরে নিয়ে গেল, অবিনাশবাবু তখন রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন। কারণ এ গুপ্তকথাটা তিনিও জানতেন না।
জয়ন্ত তার পরীক্ষাগারের ভিতরে এক কোণে চুপ করে বসেছিলেন–তাঁকে দেখলেই মনে হয় তিনি যেন অত্যন্ত পীড়িত। ক্লান্ত, মৃদু স্বরে তিনি বললেন, এসো অবিনাশ, বোসো।
একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে জয়ন্তের সামনে বসে পড়ে অবিনাশবাবু বললেন, জয়ন্ত, তুমি সব খবর শুনেছ তো?
জয়ন্ত শিউরে উঠে বললেন, শুনেছি। খবরের কাগজের হকাররা ওই খুনের খবরটা চেঁচিয়ে বলতে বলতে এই পথ দিয়েই চলে গেল।
অবিনাশবাবু বললেন, যিনি খুন হয়েছেন, তোমার মতন তিনিও আমার মক্কেল। তার সম্বন্ধেও আমার খোঁজখবর নেওয়া উচিত। আশা করি তিনকড়িকে তুমি লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করবে না।
জয়ন্ত উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, অবিনাশ, ঈশ্বরের নাম নিয়ে বলছি, আর কখনও আমি তিনকড়ির মুখদর্শন করব না! তার সঙ্গে আমার সকল সম্পর্ক চুকে গেছে! আর, তাকে আমি সাহায্য করব কী, সে আমার সাহায্য চায়ও না। তুমি তাকে জানো না, কিন্তু আমি জানি। নিরাপদে, সে সম্পূর্ণ নিরাপদেই আছে! আর কখনও তার দেখা পাবে না!
অবিনাশবাবু গম্ভীর মুখে সব শুনলেন। এত অল্প কারণে জয়ন্তের এত উত্তেজিত ভাব তার যেন কেমন-কেমন লাগল। একটু পরে বললেন, তুমি দেখছি তিনকড়ির সম্বন্ধে খুবই নিশ্চিন্ত! অবিশ্যি, সে আর না দেখা দিলে তোমারই মঙ্গল। কিন্তু যদি সে ধরা পড়ে তাহলে তার সঙ্গে তমারও নাম রটবে, এটা বুঝেছ তো?
জয়ন্ত বললেন, হ্যাঁ, তার সম্বন্ধে আমি সত্যিই নিশ্চিন্ত। কিন্তু একটা বিষয়ে আমি তোমার পরামর্শ চাই। আমি–আমি একখানা চিঠি পেয়েছি। এ চিঠিখানা পুলিশকে দেখাব কি না তাই ভাবছি। অবিনাশ, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি–তুমিই বলো, এখন আমার কী করা উচিত?
অবিনাশবাবু বললেন, এ চিঠি পুলিশের হাতে পড়লে তিনকড়ির কি ধরা পড়বার সম্ভাবনা?
জয়ন্ত বললেন, না। তিনকড়ির অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে, সেজন্যে আমার কোনও ভাবনা নেই। আমি কেবল নিজের সুনামের কথা ভাবছি।
অবিনাশবাবু বললেন, আচ্ছা, চিঠিখানা দেখি।
জয়ন্তের হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে অবিনাশবাবু গোটা-গোটা হরফে অদ্ভুত ধাঁচের হাতের লেখায় পড়লেন?
প্রিয় জয়ন্তবাবু,
আমি হচ্ছি আপনার অযোগ্য বন্ধু। তবু আমার সঙ্গে আপনি যে সদয় ব্যবহার করেছেন তার তুলনা নেই। তবে এইটুকু আপনাকে জানিয়ে রাখতে চাই যে, ভবিষ্যতে আমার জন্যে আপনি কোনও বিপদেই পড়বেন না। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আমার পালাবার উপায় আমি করে নিয়েছি। সুতরাং আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
ভবদীয়
শ্ৰীতিনকড়ি বটব্যাল
চিঠিখানা পড়ে অবিনাশবাবু শুধোলেন, চিঠির খামখানা কোথায়?
জয়ন্ত বললেন, সেখানা ভুলে ফেলে দিয়েছি। তার ওপরে ডাকঘরের ছাপ ছিল না। চিঠিখানা লোক মারফত আমার কাছে এসেছে।
তাহলে চিঠিখানা এখন আমার কাছে থাক?
তোমার যা-খুশি করতে পারো। নিজের ওপরে আর আমার বিশ্বাস নেই।
জয়ন্ত, আর একটা কথা জানতে চাই। তুমি কি তিনকড়ির কথা শুনেই তোমার উইল করেছিলে?
জয়ন্ত হঠাৎ অত্যন্ত নিস্তেজভাবে চেয়ারের ওপরে হেলান দিয়ে এলিয়ে পড়লেন। তারপরে কেবল ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।
অবিনাশবাবু বললেন, একথা আমি আগেই জানতুম! হয়তো সে তোমাকে খুন করত। তুমি খুব বেঁচে গিয়েছ।
জয়ন্ত বললেন, অবিনাশ, ভগবান আমাকে খুব শিক্ষাই দিলেন! ওঃ, এ শিক্ষা জীবনে ভুলব না! বলেই তিনি দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন।
অবিনাশবাবু ধীরে-ধীরে গাত্রোত্থান করে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরে এসেই রামচরণের সঙ্গে তাঁর দেখা হল। তিনি তাকে শুধোলেন, রামচরণ, কোনও লোক আজ তোমার বাবুকে একখানা চিঠি দিয়ে গেছে?
রামচরণ বললে, না।
অবিনাশবাবুর মন আবার সন্দেহের দোলায় দুলে উঠল। তবে? তবে কি জয়ন্ত আসল কথা তার কাছে লুকোলে? তবে কি ও-রাস্তার বাড়ি দিয়ে তিনকড়ি নিজেই লুকিয়ে এসে চিঠিখানা জয়ন্তকে দিয়ে গেছে? কিংবা জয়ন্তের সামনে বসেই এই চিঠিখানা লিখেছে? তাহলে তো ব্যাপার বড় সুবিধের নয়!
অবিনাশবাবু ফিরে এসে নিজের আপিসঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। শরীর বড় শ্রান্ত হয়েছিল, একখানা আসনে গিয়ে বসে আজকের কথা ভাবতে-ভাবতে তাঁর দুই চোখ মুদে এল। তার একজন মক্কেল তিনকড়ির হাতে নিহত হয়েছেন। তাঁর আর একজন মক্কেলের মাথার ওপরেও বিপদের খাঁড়া ঝুলছে। তিনকড়ি এখন গা-ঢাকা দিয়েছে বটে, কিন্তু যে-কোনও অসর্তক মুহূর্তে আবার সে বেরিয়ে আসতে পারে, মূর্তিমান মৃত্যুর মতো। তখন জয়ন্তকে কে রক্ষা করবে?
এমন সময় তাঁর প্রধান কর্মচারী অনন্তবাবু গলা পাওয়া গেল। অবিনাশবাবু চোখ খুলে বললেন, কী অনন্ত?
অনন্ত বললে, আজ্ঞে, অনেক কাজ বাকি রয়েছে। কখন করবেন?
অবিনাশবাবু খানিকক্ষণ নীরবে অনন্তের মুখের পানে তাকিয়ে রইলেন। এই অনন্ত তার অনেক দিনের পুরোনো ও বিশ্বাসী লোক। তার এখানে কাজ করবার আগে সে অন্যত্র হাতের লেখা পরীক্ষার কাজ করত। হাতের লেখা পরীক্ষা করতে সে ছিল অদ্বিতীয়। তার এই বিশেষ গুণটি অনেক সময়েই অ্যাটর্নি অবিনাশবাবুর অনেক কাজে লেগেছে।
