ইন্সপেক্টার সেই খামখানা নিয়ে পরদিন সকালেই অ্যাটর্নি অবিনাশবাবুর সঙ্গে দেখা করলে। সমস্ত শুনে অবিনাশবাবু বললেন, ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। আগে মৃতদেহ না দেখে আমি আর কোনও কথাই বলব না। একটু দাঁড়ান, আমি জামাকাপড় ছেড়ে আসি।
ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃতদেহ দেখে তিনি বললেন, আশ্চর্য! ইনি যে কুমার মনোমোহন চৌধুরী!
ইন্সপেক্টার চমকে উঠে বললে, এও কি সম্ভব হতে পারে, বলেন কী! আপনার ভুল হয়নি তো?
ভুল হওয়া অসম্ভব।
তাহলে হয়তো আপনি খুনিকেও চিনতে পারবেন। তার নাম তিনকড়ি বটব্যাল।
নাম শুনেই অবিনাশবাবু থ হয়ে গেলেন, তার মুখে রা ফুটল না!..খানিক পরে থেমে থেমে প্রায় রুদ্ধস্বরে বললেন, আচ্ছা, এই তিনকড়ি মাথায় কি খুব বেঁটে?
হ্যাঁ, তার দেহ তো বেঁটে বটেই, শুনেছি তার চেহারাও নাকি শয়তানের মতোই সুন্দর। দেখুন দেখি, এই ভাঙা লাঠিগাছা আপনি চিনতে পারেন কি না?
অবিনাশবাবু দেখেই চিনতে পারলেন। কিন্তু এর মালিক তিনকড়ি নয়, তাঁর বন্ধু ডাক্তার জয়ন্ত এবং এ লাঠি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন তিনিই নিজে! এ সব কথা প্রকাশ না করে ইন্সপেক্টারকে ডেকে তিনি বললেন, আমার গাড়িতে আসুন। আমি আপনাকে তিনকড়ির ঠিকানায় নিয়ে যাচ্ছি। তিনকড়ি তাঁকে যে কাৰ্ডখানা দিয়েছিলেন সেখানা এখনও তাঁর পকেটবুকের মধ্যেই আছে।
অবিনাশবাবুর গাড়ি চিৎপুর রোডের অন্যান্য অসংখ্য গাড়ির আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে করতে পাথুরেঘাটার সরু রাস্তার ভিতরে ঢুকল। তারপর দু-ধারে কাঁসারিদের বাসনের দোকানগুলো পিছনে রেখে গাড়ি গিয়ে ঢুকল ব্রজদুলাল স্ট্রিটের এক ময়লা গলির ভিতরে! শীতকালের কুয়াশায় সকালের আলো তখনও আচ্ছন্ন হয়ে আছে এবং সেই কুয়াশায় ভিতর দিয়ে ঘোরাফেরা করছে জনকয়েক দুশমন চেহারার গুন্ডার মতন লোক! ঝিয়ের মতন দেখতে নোংরা কাপড় পরা কতকগুলো স্ত্রীলোক ব্যস্তভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই শীতেও উলঙ্গ দেহে কতকগুলো ছেলে চাঁচাচ্ছে, কাঁদছে বা পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া করছে।
ইন্সপেক্টার বললে, তিনকড়ি যেরকম লোক, সে থাকেও দেখছি ঠিক সেই রকম জায়গাতেই।
এ-গলির চেয়েও ছোট, নোংরা ও অন্ধকার আর একটা গলি বা শুড়িপথের ভিতরে ঢুকে পাওয়া গেল তিনকড়ির বাসা। চুন-বালি খসা একখানা নড়বড়ে পুরোনো বাড়ির ভাঙা রোয়াকের ওপরে একটা থুথুড়ি বুড়ি বসে-বসে খকখক করে কাশছিল। অবিনাশবাবু তাকে শুধোলেন, হ্যাঁ বাছা, তিনকড়িবাবু কি বাড়ির ভেতরে আছেন?
বুড়ি বিড়বিড় করে বললে, না গো, না! সে মিনসে কাল রাতে একবার এসেছিল, এসেই খানিক পরে আবার কোনও চুলোয় বেরিয়ে গেছে!
সে আবার কখন আসবে বলতে পারো?
বুড়ি এক মিনিট ধরে আগে খক খক করে কাশলে, তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, জানিনে বাপু! সে কখন আসে কখন যায়, কাকপক্ষীও টের পায় না!
আমরা একবার তার ঘরে যাব।
তা হয় না গো, তা হয় না! তার ঘরে তালা বন্ধ।
আমার সঙ্গে যিনি এসেছেন, তিনি পুলিশের লোক। আমরা তালা ভেঙেই তিনকড়ির ঘরে ঢুকব।
বুড়ির ভাঁজ পড়া মুখে একটা উৎকট আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠল। ব্যগ্রভাবে সে বললে, তাই নাকি বাবা, তাই নাকি! সে কী করেছে বাবা?
ইন্সপেক্টারের দিকে ফিরে অবিনাশবাবু চুপি-চুপি বললেন, দেখছেন, তিনকড়িকে এখানেও কেউ পছন্দ করে না। তার বিপদের কথা শুনে বুড়ির আহ্লাদের আর সীমা নেই!–তারপর বুড়ির দিকে ফিরে বললেন, এইবারে আমাদের বাড়ির ভিতরে নিয়ে চলো তো বাছা!
তিনকড়ির ঘরের ভিতরটার সঙ্গে এ-বাড়িখানা যেন খাপ খায় না। তার ঘরে দামি দামি। সোফা, কৌচ, চেয়ার, কার্পেট ও ছবি প্রভৃতি সাজানো রয়েছে। ঘরের অনেক জিনিসই লন্ডভন্ড হয়ে আছে–যেন তাড়াতাড়ি কেউ এ-ঘরের জিনিসপত্তর উলটে-পালটে রেখে চলে গিয়েছে। ঘরের মেঝের এক জায়গায় একখানা আধ-পোড়া চেক-বুক পাওয়া গেল। এবং যে লাঠি দিয়ে খুন। হয়েছিল তারও বাকি আধখানা একটা দরজার পাশ থেকে বেরিয়ে পড়ল। এই পেয়েই ইন্সপেক্টার মহা খুশি! ঘরের ভিতরে আর কোনও উল্লেখযোগ্য জিনিস পাওয়া গেল না।
সেই দিন দুপুরেই ব্যাঙ্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেখানে তিনকড়ির নামে পঞ্চাশহাজার টাকা জমা আছে।
ইন্সপেক্টার বললে, অবিনাশবাবু! খুন করবার পর তিনকড়ির মাথা নিশ্চয়ই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নইলে, সেই ভাঙা লাঠিটা ঘরের ভেতরে কখনওই ফেলে রেখে যেত না, আর ব্যাঙ্কের চেক-বুকখানাও পুড়িয়ে ফেলবার চেষ্টা করত না। আসলে টাকাই হচ্ছে মানুষের জীবন! পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এখন সে আর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা বের করতে পারবে, তার পেটও অচল হয়ে পড়বে! সে এখন আমার হাতের মুঠোর ভেতরে এসেছে–তার নামে হুলিয়া বের করলেই সে ধরা পড়বেই পড়বে।
তিনকড়ির নামে হুলিয়া বেরুল। কিন্তু তার চেহারা মার্কামারা হলেও কোথাও তার পাত্তা পাওয়া গেল না! তিনকড়িকে চেনে এমন আর কোনও লোকেরও সন্ধান মিলল না– কলকাতা শহরের বুক থেকে সে যেন কোনও যাদুমন্ত্রের গুণেই আচম্বিতে অদৃশ্য হয়ে গেল!
.
পঞ্চম। জাল চিঠি
প্রথম পরিচ্ছেদে নতুন রাস্তায় যে অদ্ভুত দেখতে বাড়িখানার কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ ডাক্তার জয়ন্তের পরীক্ষাগার যে-বাড়িখানার ভিতরে আছে, জয়ন্তবাবুর বসতবাড়ি থেকে যে সে বাড়িতে আনাগোনা করা যায়, এ গুপ্তকথাটা বাইরের কেউ জানত না। কারণ তাঁর বসতবাড়ি এক রাস্তায়, আর পরীক্ষাগার, আর এক রাস্তায়, কিন্তু এই দুখানা বাড়ির পিছনদিকই পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন।
