জয়ন্ত সায় দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, এ কথা তো আমি আগেই স্বীকার করেছি। আমি একটি নির্বোধ মক্কেল।
অবিনাশবাবু বললেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।..কিন্তু জানো কি জয়ন্ত, যার নামে তুমি উইল করেছ, সেই তিনকড়ির কোনও কোনও গুপ্তকথা আমি জানতে পেরেছি?
জয়ন্তের সুন্দর মুখ মড়ার মতন হলদে হয়ে গেল তার চোখের উপরেও কেমন একটা কালো ছায়া নেমে এল। তিনি শুকনো স্বরে বললেন, ওসব কথা আমি শুনতে চাই না, ও নিয়ে আমি আলোচনা করতেও রাজি নই।
অবিনাশবাবু যেন নিজের মনেই বললেন, তিনকড়ি যেসব কাণ্ড করে, কোনও ভদ্রলোকেই তা করে না।
জয়ন্ত চঞ্চল ভাবে বললেন, সে যে কাণ্ডই করুক তার জন্যে আমার উইল অদল বদল হবে না। অবিনাশ, তুমি জানো না আমার অবস্থা কতটা সঙিন! এ ব্যাপার নিয়ে বাজে বাক্যব্যয় করলে কোনওই লাভ হবে না।
জয়ন্তের অবস্থা দেখে অবিনাশবাবুর দয়া হল। গলার আওয়াজ নরম করে আবার তিনি বললেন, জয়ন্ত, আমাকে তুমি চেনো। আমাকে তুমি অনায়াসেই বিশ্বাস করতে পারো। আমার কাছে সব কথা খুলে বলো, আমি নিশ্চয়ই তোমার উপকার করতে পারব।
জয়ন্ত অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে-ধীরে বললেন, ভাই অবিনাশ, তুমি যে আমার উপকারী বন্ধু তা কি আমার জানা নেই? আমি তোমাকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি। তোমার মতন বিশ্বাস আমি পৃথিবীর আর কারুকেই এমনকি নিজেকেও করি না! কিন্তু যতটা ভাবছ ততটা এখনও হয়নি। তোমাকে শান্ত রাখবার জন্যে আমি যা বলছি শোনো। আমি ইচ্ছা করলে যখন-খুশি এই তিনকড়ির হাত থেকে ছাড়ান পেতে পারি। সুতরাং তাকে নিয়ে তুমি আর মাথা ঘামিও না। এ প্রসঙ্গ চাপা দেওয়াই ভালো।
অবিনাশবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বেশ, তাই হোক।
জয়ন্ত বললেন, কিন্তু কথা যখন আজ উঠলই তখন আর একটা বিষয় তোমাকে জানিয়ে রাখতে চাই। সত্যসত্যই ওই তিনকড়ি বেচারার ওপরে আমার মনের টান আছে। আমি জানি তোমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে–সে নিজেই আমাকে একথা বলে গেছে। বোধহয় সে তোমার সঙ্গে খুব ভদ্র ব্যবহারও করেনি। কিন্তু ভাই অবিনাশ, আমি তাকে পছন্দ করি। তুমি আমার কাছে অঙ্গীকার করো, আমি যখন থাকব না তখন তার উচিত পাওনা তুমি তাকে মিটিয়ে দেবে? তোমার কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি পেলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।
অবিনাশবাবু বললেন, তুমি যতই বলো, আমি তাকে কখনওই পছন্দ করতে পারব না।
জয়ন্ত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। অবিনাশবাবুর কাঁধের ওপরে একখানা হাত রেখে বললেন, তুমি যে তাকে পছন্দ করতে পারবে না তাও আমি জানি। কিন্তু স্বীকার করো, আমার অবর্তমানে তুমি ঠিক উইল মতো কাজ করবে?
অবিনাশবাবু দুঃখিতভাবে একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, স্বীকার করছি।
.
চতুর্থ। হত্যাকাণ্ড
এক বছর পরে। সারা কলকাতা শহরে ভীষণ এক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ল। এরকম নিষ্ঠুর খুনের কথা বড় একটা শোনা যায় না।
গঙ্গানদীর কাছাকাছি একটা রাস্তায় এক বাড়ির একটি মেয়ের রাতের বেলায় ঘুম হচ্ছিল না। মেয়েটি ছিল সে-বাড়ির শিক্ষয়িত্ৰী। সেদিন পূর্ণিমা রাত–জ্যোত্মার দুগ্ধময়ী ধারায় চারিদিক ধবধব করছিল। মেয়েটি জানলার ধারে বসে আনমনে পথের দিকে তাকিয়েছিল। মেয়েটির নাম কমলা।
সেইখানে বসে-বসে কমলা সে রাতে যা দেখেছিল তা হচ্ছে এই
একটি বয়স্ক ভদ্রলোক একা পথ চলছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি যখন কমলাদের বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালেন, তখন আকাশের জ্যোত্সা ও পথের গ্যাসের আলোকে তার চেহারা বেশ পরিষ্কারই দেখা যাচ্ছিল। তার মাথার চুলগুলি রুপোর মতন সাদা, আর মুখখানি এমন শান্ত ও ভাবভঙ্গি এমন ধীর স্থির যে দেখলেই তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছা হয়।
ঠিক সেই সময়েই আর এক দিক দিয়ে একটি যুবক ভদ্রলোক প্রাচীন লোকটির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কমলা প্রথমটা তার দিকে ততটা নজর দেয়নি, কিন্তু তার পরে দেখেছিল সে মাথায় অত্যন্ত বেঁটে। তাকে দেখে প্রাচীন লোকটি খুবই বিনীত ও ভদ্রভাবে নমস্কার করলেন।
কমলা তখন ভালো করে বেঁটে লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখে তখনই তাকে চিনতে পারলে। তার নাম হচ্ছে তিনকড়ি বটব্যাল, সে একবার কী একটা কাজে কমলাদের বাড়ি এসেছিল। কিন্তু তার চেহারা, ভাবভঙ্গি ও কথাবার্তা কমলার এত খারাপ লেগেছিল যে, তাকে সে মোটেই পছন্দ করতে পারেনি।
প্রাচীন ভদ্রলোকটি খুব শিষ্ট এবং মিষ্ট স্বরে ধীরে ধীরে তিনকড়িকে কী বলতে লাগলেন। কিন্তু তিনকড়ির ভাব দেখে মনে হল না যে, তাঁর কথা সে কান পেতে শুনছে। তারপর কোথাও কিছু নেই আচমকা তিনকড়ি মহা খাপ্পা হয়ে লাফালাফি করতে ও হাতের মোটা লাঠিগাছা ঘোরাতে শুরু করে দিলে–ঠিক যেন হঠাৎ পাগলের মতন!
প্রাচীন লোকটি অত্যন্ত বিস্মিত ও ক্ষুব্ধভাবে দুই পা পিছিয়ে গেলেন। তিনকড়ি তাতে আরও রেগে গিয়ে সেই মোটা লাঠিগাছা দিয়ে তাঁকে ক্রমাগত নির্দয়ভাবে মারতে লাগল। বৃদ্ধ ভদ্রলোক মাটির ওপরে পড়ে গেলেন, তিনকড়ি তখনও ঠিক বাঁদরের মতন মুখ খিঁচিয়ে তার দেহের ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁকে ঘন ঘন লাঠি ও লাথি মেরে একেবারে কাবু করে ফেললে।
এর পরে কমলা আর কিছুই দেখেনি, কারণ এই ভয়ানক দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।
ঘটনাস্থলে যখন পুলিশ এসে পড়ল, তিনকড়ি তখন অদৃশ্য হয়ে গেছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মৃতদেহ পথের মাঝখানে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে আছে এবং ঠিক তার দেহের পাশেই পড়ে রয়েছে একগাছা মোটা লাঠির আধখানা। সেই রক্তমাখা আধখানা লাঠি দেখলেই বুঝতে দেরি হয় না যে, সেই লাঠি দিয়েই এই হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে! লাঠির বাকি অংশ অনেক খুঁজেও পাওয়া গেল না, খুব-সম্ভব হত্যাকারী সেটাকে হাতে করেই নিয়ে গেছে। মৃত ব্যক্তির পকেটের ভিতর থেকে একটি মানিব্যাগ, একটি সোনার ঘড়ি ও একখানি ঠিকানা লেখা খামেমোড়া চিঠি পাওয়া গেল। খামের উপরে, শ্রীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র সেন, এই নাম লেখা রয়েছে।
