চলতে-চলতে অবিনাশবাবু আর একটা রাস্তায় আর একখানা বাড়ির সামনে এসে পড়লেন। বাহির থেকেই বোঝা যায় এ বাড়ির ভিতর যিনি বাস করেন, তিনি অশিক্ষিত বা গরিব লোক নন। অবিনাশবাবু বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। একজন লোক দাঁড়িয়েছিল তাকে ডেকে শুধোলেন, রামচরণ, জয়ন্ত বাড়িতে আছেন?
রামচরণ বললে, আমি ঠিক বলতে পারছি না হুজুর! আপনি বাইরের ঘরে একটু বসুন, বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখে আসছি। সে চলে গেল। অবিনাশবাবু সাজানো-গুছানো একটি ঘরের ভিতরে গিয়ে সোফায় ওপরে বসে পড়লেন।
বড়-বড় চিত্রকরের আঁকা ভালো ভালো ছবি, দামি দামি পাথরের মূর্তি ও আসবাব দিয়ে ঘরখানি চমৎকার রূপে সাজানো। এই ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই সারা মনটি যেন আরামে এলিয়ে আসে। অবিনাশবাবুর মতে, এমন আনন্দদায়ক ঘর কলকাতায় আর দ্বিতীয় নেই! এইখানেই জয়ন্ত ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বসে কত সুন্দর সন্ধ্যা তিনি নিশ্চিন্ত প্রাণে কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আজ তার মনের ভিতর থেকে সমস্ত আনন্দের স্মৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে! তিনকড়ির মুখ মনে করে জীবনের উপরেও তাঁর যেন বিতৃষ্ণা আসতে লাগল–এবং বার বার তার মনে হতে লাগল, তার বন্ধুর এই ঘরেও সর্বত্রই যেন একটা অদৃশ্য অমঙ্গলের আভাস জেগে আছে।
রামচরণ এসে খবর দিলে, জয়ন্ত কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন, সে তা জানতে পারেনি।
অবিনাশবাবু বললেন, আচ্ছা রামচরণ, তোমার বাবু যে পুরোনো বাড়িতে বসে কাজ করেন, তার চাবি তিনকড়িবাবুর হাতে গেল কেমন করে?
রামচরণ বললে, বাবুই তাকে দিয়েছেন।
দেখেছি, ওই তিনকড়ি-ছোকরার ওপরে তোমার বাবুর খুব বিশ্বাস!
হ্যাঁ হুজুর, বাবু তাকে খুবই বিশ্বাস করেন। খালি তাই নয়, বাবু হুকুম দিয়েছেন তিনকড়িবাবু যা বলবেন আমাদের সকলকেই তাই করতে হবে।
আচ্ছা রামচরণ, তোমাদের ওই তিনকড়িবাবুকে আমি বোধহয় এখানে কখনও দেখিনি?
না হুজুর, তিনি বাড়ির এদিকে কখনও আসেন না। খিড়কির দরজা দিয়ে তিনি আনাগোনা করেন।
আমি এখন আসি রামচরণ।
রাস্তায় বেরিয়ে অবিনাশবাবু আবার ভাবতে-ভাবতে চললেন, বেচারা জয়ন্ত! জানি চিরদিনই সে খামখেয়ালি, কিন্তু তার মতন সুচরিত্র ও মিষ্টপ্রকৃতির লোক তিনকড়ির মতন বীভৎস জীবের সঙ্গে মেলামেশা করছে কেমন করে? তিনকড়ি কোন মায়ামন্ত্রে জয়ন্তকে বশীভূত করেছে?..এই তিনকড়ি! নিশ্চয়ই এ যে-জীবন যাপন করে তা ওর চেহারার মতোই ভয়ংকর! সে-জীবনের পরিচয় পেলে জয়ন্ত কখনওই তার সঙ্গে মিশতে পারবে না।…এই নরপশুটা কিনা ঘুমন্ত জয়ন্তের বিছানার পাশে গিয়েও বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি সে কোনওগতিকে ঘুণাক্ষরেও উইলের কথা টের পায়, তাহলে জয়ন্তের প্রাণ কি আর একদণ্ডও নিরাপদ থাকবে? এই সমূহ বিপদ থেকে জয়ন্তকে উদ্ধার করতে হবেই! কিন্তু সে কি আমার প্রস্তাবে রাজি হবে?
.
তৃতীয়। জয়ন্তের কোনও ভাবনাই নেই
দিন পনেরো পর বন্ধুবান্ধবদের কাছে হঠাৎ ডাক্তার জয়ন্তের এক নিমন্ত্রণপত্র এসে হাজির। এটা কিছু নতুন ব্যাপার নয়, বহুকাল অদর্শনের পর এরকম আকস্মিক ভোজ দেওয়ার খেয়াল ডাক্তার জয়ন্তের অনেকবারই হয়েছে। অবশ্য, এরকম ভোজের আসরে জনকয় বাছা-বাছা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া আর কেউ নিমন্ত্রিত হতেন না।
ডাক্তার জয়ন্তের সঙ্গে এমনভাবে দেখা পাবার সুযোগ পেয়ে অবিনাশবাবু খুবই খুশি হয়ে গেলেন। আগেই বলেছি এক পেয়ালার ওপরে দু-পেয়ালা চা খেলেই তার মুখের কুলুপ খুলে যেত–আজকে তিনি দ্বিতীয় পেয়ালার উপরেও তৃতীয় পেয়ালা চা নিয়ে আসর জমকে বসেছেন রীতিমতো। কারণে অকারণে অনর্গল গল্প করে যাওয়া যাদের স্বভাব তারা আজ। যত গল্প করছে, অবিনাশবাবুও তাদের চেয়ে কিছুমাত্র কম করছেন না। সাধারণত স্বল্পবাক ও শুষ্ক প্রকৃতির এই প্রৌঢ় মানুষটিকে বন্ধুরা সকলেই যে পছন্দ করতেন, একথাও আগে জানিয়েছি। সুতরাং আজকের আনন্দসভায় অবিনাশবাবুকে এমন ভোলা প্রাণে যোগ দিতে দেখে সকলেই খুব আনন্দিত হয়ে উঠলেন।
বাবুর্চির হাতে তৈরি প্রন কাটলেট, পটলের দোরমা, রুইমাছের রোস্ট, শ্রীরামপক্ষীর সঝোল মাংস ও মোগলাই পোলাও খেয়ে সকলের মুখে যে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল সে কথা বলাই বাহুল্য। তারপর খোসমেজাজে আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে অন্যান্য বন্ধুরা যখন একে একে বিদায় নিয়ে গেলেন, অবিনাশবাবু তখনও তাঁর আসন ছেড়ে উঠলেন না।
জয়ন্ত বুঝলেন অবিনাশবাবু নিশ্চয়ই তাঁকে কোনও কথা বলতে চান, আর সেকথা নিতান্ত হালকা কথা নয়।
তাকে বেশিক্ষণ সবুর করতেও হল না। অবিনাশবাবু হঠাৎ গম্ভীর মুখে আরম্ভ করলেন, জয়ন্ত, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে। আমার কাছে তোমার যে-উইল রেখে এসেছ, তার কথা নিশ্চয়ই তুমি ভোলেনি?
জয়ন্ত বললেন, অবিনাশ, তুমি একটি বেচারি! আমার উইল নিয়ে তোমার যে দুর্ভাবনার অন্ত নেই, সেকথা আমি জানি। আমার মতন নির্বোধ মক্কেল পাওয়া কারুর পক্ষেই সৌভাগ্যের বিষয় নয়! করুণা তো আমার ওপরে চটেই আগুন হয়ে আছে। তার বিশ্বাস, আমার মাথার ঠিক নেই। আমার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাকেও সে গাঁজাখোরের খেয়াল বলে মনে করে!
অবিনাশবাবু বললেন, করুণার কথা এখন থাক। তোমার উইলের কথাই হোক। কোনও বুদ্ধিমান লোকই এ রকম উইল করে না।
