এই একই কথা নিয়ে তোলাপাড়া করে ক্রমেই তিনি শ্রান্ত হয়ে পড়লেন। তবু এ দুর্ভাবনা তাঁকে রেহাই দিলে না। এই তিনকড়ির আসল চেহারার সঙ্গে যদি তার পরিচয় থাকত, তাহলে হয়তো তিনি এতটা অভিভূত হয়ে পড়তেন না! তিনকড়ির প্রকৃতির পরিচয় তিনি পেয়েছেন, তার বিদকুটে চেহারার বর্ণনাও তিনি শুনেছেন এবং তাকে তিনি সর্বদা চোখের সামনেও দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু তার মুখখানা কিছুতেই তাঁর দৃষ্টির সীমার মাঝে আসছে না! শেষটা তাঁর কৌতূহল এতটা বেড়ে উঠল যে তিনি স্থির করলেন, যেমন করেই হোক তিনকড়ি বটব্যালকে তিনি দেখবেনই দেখবেন! হয়তো তার দেখা পেলে তার মনটা আবার হালকা হয়ে যাবে এবং এমন একটা জীবকে কেন যে তার বন্ধু এতটা অন্যায় প্রশ্রয় দিচ্ছেন, হয়তো এ-রহস্যটাও বোঝা তার পক্ষে শক্ত হবে না!
সদানন্দবাবু যে অদ্ভুত বাড়িটার কথা বলেছিলেন, পরদিন থেকে অবিনাশবাবু তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে রোজ নিয়মিতভাবে পাহারা দিতে লাগলেন। এ বাড়ির মালিক কে, সদানন্দবাবু তা জানেন না বটে, কিন্তু অবিনাশবাবু জানেন! এ বাড়ির মালিক হচ্ছেন তারই মক্কেল ডাক্তার জয়ন্তকুমার। এটা তার পরীক্ষাগার। এখানে তিনি নানারকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করেন। কিন্তু এখানে তিনকড়ি আনাগোনা করে কেন ও এ-বাড়ির চাবি তার পকেটেই বা থাকে কেন? নিজের মনের ভিতর থেকে এ-প্রশ্নের কোনও জবাব না পেয়ে অবিনাশবাবু আপনা-আপনিই বললেন, আচ্ছা, আগে তো তিনকড়িকে স্বচক্ষে দেখি, তার পরেই সব স্পষ্ট হয়ে যাবে!
এক দিন, দু-দিন, তিন দিন গেল–তিনকড়ির দেখা নেই। চতুর্থ দিনে অবিনাশবাবুর ধৈর্য সফল হল। তখন রাত দশটা বেজে গেছে, দোকানিরা একে-একে দোকানের ঝাঁপ ফেলছে, রাস্তাঘাট একেবারে নীরব ও নির্জন না হলেও গোলমাল খুব কম। এমন সময় অবিনাশবাবুর কানে এল কেমন একরকম পায়ের আওয়াজ! অন্যান্য পায়ের আওয়াজের সঙ্গে এর যেন কোনওই মিল নেই!
পদশব্দ আরও কাছে এগিয়ে এসে স্পষ্টতর হয়ে উঠল। অবিনাশবাবু প্রায় রুদ্ধশ্বাসে দেখলেন, মোড় ফিরে পথের ওপরে আবির্ভূত হল একটা মূর্তি! খর্ব দেহ, সাজপোশাক সাদাসিধে।
মূর্তিটা রাস্তা পার হয়ে ও-ফুটপাথের সেই বাড়িখানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পর নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে একটা চাবি বার করলে। অবিনাশবাবু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন এবং হাত দিয়ে তাঁর কাঁধ স্পর্শ করে বললেন, বোধহয় আপনিই তিনকড়িবাবু?
সাপের মতন শব্দ করে একটা দ্রুত নিশ্বাস টেনে তিনকড়ি সভয়ে পিছিয়ে গেল! কিন্তু তার সে ভয় মুহূর্তের জন্যে, তখনই সে নিজেকে সামলে নিলে! এবং যদিও সে
অবিনাশবাবুর চোখের দিকে আর মুখ তুলে তাকালে না, তবু বেশ শান্ত স্বরেই বললে, হা, ও নাম আমারই, আপনি কী চান?
অবিনাশবাবু বললেন, আমি হচ্ছি ডাক্তার জয়ন্তবাবুর একজন পুরোনো বন্ধু। আমার নাম অবিনাশচন্দ্র সেন, আপনি নিশ্চয়ই আমার নাম শুনেছেন? দেখছি, আপনি এই বাড়ির ভেতরেই যাচ্ছেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন?
জয়ন্তবাবু এখানে নেই–এই বলে তিনকড়ি দরজায় চাবিটা ঢুকিয়ে দিলে এবং তার পরে মুখ না তুলেই হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে, আপনি আমাকে চিনলেন কেমন করে?
অবিনাশবাবু বললেন, আপনি দয়া করে আমার একটা কথা শুনবেন?
কেন শুনব না? বলুন।
আপনি এমন মুখ লুকোবার চেষ্টা করছেন কেন? আপনার মুখটা একবার আমাকে দেখতে দেবেন কি?
তিনকড়ি প্রথমটা একটু ইতস্তত করলে; এবং তারপর যেন হঠাৎ কী ভেবেই অবিনাশবাবুর সুমুখে এসে সিধে হয়ে দাঁড়াল!
কয়েক সেকেন্ড ধরে দুজনেই দুজনের মুখের দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অবিনাশবাবু বললেন, এরপর আর আমি আপনাকে ভুলব না। এটা একটা লাভের কথা।
তিনকড়ি বললে, হ্যাঁ। হয়তো আবার আমাদের দেখা করবার দরকার হবে। আমার ঠিকানাটাও রেখে দিন–এই বলে সে একখানা কার্ড এগিয়ে দিলে। কার্ডের ওপরে ব্রজদুলাল স্ট্রিটের এক বাড়ির নম্বর লেখা রয়েছে।
অবিনাশবাবু মনে-মনে বললেন, সর্বনাশ! একি সেই উইলের জন্যেই আমার সঙ্গে দেখা করবার ফন্দি আঁটছে? কিন্তু মনের কথা মুখে তিনি প্রকাশ করলেন না।
তিনকড়ি বললে, এখন বলুন দিকি মশাই, আমাকে আপনি চিনলেন কেমন করে?
লোকের মুখে শুনে। কে
লোক? তার নাম কী?
অবিনাশবাবু কেবল বললেন, এমন কোনও লোক তিনি আমাদের দুজনেরই বন্ধু।
সচমকে তিনকড়ি বললে, দুজনেরই বন্ধু। কে তিনি?
সন্দেহ হয়, যদিও তার প্রায় বামনের মতে দখলে মনে হয়, তিন্নিরপর চিন্তিত মুখে করে
অবিনাশবাবু বললেন, ধরুন, ডাক্তার জয়ন্ত।
ক্রুদ্ধস্বরে তিনকড়ি বললে, তিনি কখনও আপনাকে বলেননি। আপনি যে মিছে কথা কইবেন এটা আমি জানতুম না।
অবিনাশবাবু বললেন, আপনিও ঠিক ভদ্রলোকের মতন কথা কইলেন না!
তিনকড়ি বন্য জন্তুর মতন অট্টহাস্য করে উঠল। তারপর আচম্বিতে আশ্চর্য তৎপরতার সঙ্গে দরজাটা খুলে ফেলে বাড়ির ভিতরে সাঁৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অবিনাশবাবু কিছুক্ষণ সেইখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর চিন্তিত মুখে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন। তার মুখ দেখলে মনে হয়, তিনি যেন রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেছেন। তিনকড়ি প্রায় বামনের মতো বেঁটে, তাকে দেখলেই তার দেহকে বিকৃত বলে সন্দেহ হয়, যদিও তার দেহে অঙ্গ-বিকৃতির কোনও চিহ্ন পাওয়া যায় না। তিনকড়ির ভাব ও ব্যবহারও কখনও ভিতু ভিতু, আবার কখনও বা রীতিমতো বেপরোয়া। তার গলার আওয়াজও কেমন যেন ভাঙা ভাঙা ও চাপা-চাপা এবং সে কথা কয় প্রায় চুপিচুপি, কর্কশ স্বরে। এগুলো তার সস্বভাবের পরিচয় দেয় না বটে, কিন্তু তাকে দেখেই তার মনের ভিতরে কেন যে একটা ঘৃণা ও ভয়ের ভাব জেগে উঠেছিল, অবিনাশবাবু তার কোনও হদিস খুঁজে পেলেন না। তাঁর মনে হল, তিনকড়িকে দেখে তিনি যেটুকু বুঝেছেন সেইটুকুই তার আসল পরিচয় নয়–তার মধ্যে অমানুষিক একটা কিছু আছে নিশ্চয়! তার দেহের রক্তমাংসের ভিতরে বাস করছে যেন কোনও অভিশপ্ত আত্মা! অবিনাশবাবু আপন মনেই বললেন, জয়ন্ত, জয়ন্ত! তোমার জন্যে সত্যিই আমি দুঃখিত! যে নতুন বন্ধুটিকে তুমি পেয়েছ, তার মুখের ওপরে আমি শয়তানের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি!
