খানিকক্ষণ দুজনে নীরবে পথ চললেন। অবিনাশের মুখের দিকে তাকিয়ে সদানন্দের মনে হল তার বন্ধু যেন কোনও দুর্ভাবনা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন।
মিনিট কয় পরে অবিনাশ বললেন, সদানন্দ, তুমি সেই বিশ্রী লোকটার নাম জানো?
তিনকড়ি বটব্যাল।
বটে। তাকে দেখতে কীরকম?
তার চেহারার সঠিক বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব! তার দেহ দেখতে সাধারণ মানুষেরই মতন, কিন্তু তবু, তাকে দেখলে মোটেই সাধারণ মানুষ বলে মনে হয় না। সন্দেহ হয়, যেন তার দেহের ভিতরে কী একটা মস্ত অভাব থেকে গিয়েছে হয়তো তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃত! তার মুখের দিকে তাকালেই ভয়ে ও ঘৃণায় বুকের ভিতরটা কেমন করতে থাকে। তার চেহারা আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে আছে, তা খুঁটিয়ে বর্ণনা করবার শক্তি আমার নেই!
আবার খানিকক্ষণ নীরব থাকবার পর অবিনাশ বললেন, আচ্ছা, তিনকড়ি যে নিজের চাবি দিয়েই সদর দরজাটা খুলেছিল, এ-বিষয়ে তোমার কোনই সন্দেহ নেই তো?
সদানন্দ বিস্মিত স্বরে বললেন, এ কীরকম আশ্চর্য প্রশ্ন!
অবিনাশ বললেন, প্রশ্নটা তোমার আশ্চর্য বলে মনে হতে পারে বটে। চেকে যার নাম সই ছিল, সে-ভদ্রলোককে আমি খুবই চিনি। কিন্তু আমার গোল বাধছে এই তিনকড়িকে নিয়ে। সে কি সত্যিই নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলেছিল?
সদানন্দ বললেন, এই সামান্য চাবির কথা নিয়ে কোথায় যে গোল বাধল, আমি তো সেটা আন্দাজ করতে পারছি না! হ্যাঁ, সে তার নিজের পকেট থেকেই চাবি বার করেছিল।
অবিনাশ বললেন, ব্যস, এ কথা চাপা দাও! উঃ, অনেক কথা কয়ে ফেললুম–এত কথা কওয়া আমার উচিত হয়নি।
.
দ্বিতীয়। তিনকড়ি লোকটা কে?
অবিনাশবাবুর মগজে আজ যে কী পোকা ঢুকেছে তা আমরা বলতে পারি না। একে তো স্বভাবতই তিনি গম্ভীর–আজ সেই গাম্ভীর্যের ওপরে আবার বিরক্তিরও ছায়া এসে পড়েছে।
অন্য অন্য দিন বেড়িয়ে বাড়িতে ফিরে অনেক রাত পর্যন্ত তিনি লেখাপড়ার কাজ করতেন। কিন্তু আজ তিনি সেসব কিছুই করলেন না, বসে-বসে খালি কী যে ভাবতে লাগলেন তা কেবল তিনিই জানেন।
খানিক পরে উঠে দেরাজ খুলে তিনি একতাড়া কাগজ বার করলেন। সেই লম্বা কাগজগুলোর ওপরে লেখা রয়েছে, ডাক্তার জয়ন্তকুমার রায়ের উইল। উইলখানা তিনি এর আগেও কয়েকবার পড়েছিলেন, আজও আর একবার পড়ে দেখলেন। উইলের মোদ্দা কথা হচ্ছে এই
ডাক্তার জয়ন্তকুমার রায়, M.D,D.C.L,LL.D.,ER.S, পরলোকগত হলে তার সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি তার উপকারী প্রিয় বন্ধু শ্রীযুক্ত তিনকড়ি বটব্যাল ভোগ-দখল করতে পারবেন।
কিন্তু ডাক্তার জয়ন্তকুমার রায় যদি কখনও তিনমাসের বেশি অদৃশ্য হয়ে থাকেন, তাহলেও উক্ত তিনকড়িবাবু বিনা বাধায় ডাক্তার জয়ন্তবাবুর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হতে পারবেন।
উইলখানা পড়তে-পড়তে অবিনাশবাবুর মুখের অন্ধকার আরও বেশি ঘনিয়ে উঠল। এতকাল অ্যাটর্নিাগরি করছেন, কিন্তু এমন সৃষ্টিছাড়া উইল জীবনে তিনি কোনওদিনই দেখেননি। মানুষ যে সজ্ঞানে এমনধারা উইল করতে পারে, একথা স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না–এ উইলখানা দেখলেই তার চোখ যেন জ্বালা করতে থাকে।
উইলখানা যথাস্থানে রেখে দিয়ে অবিনাশবাবু নিজের মনেই বললেন, এ খালি পাগলামি নয়, ঘৃণার ব্যাপারও বটে।
পরের দিন সকালে উঠে তিনি ডাক্তার করুণাকুমার চৌধুরীর উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। করুণাবাবুর মতন বিখ্যাত ডাক্তার শহরে খুব কমই আছেন। করুণা ছিলেন অবিনাশের সহপাঠী ও বাল্যবন্ধু এবং তাদের সে-বন্ধুত্ব আজও অক্ষত আছে। অবিনাশবাবুর বিশ্বাস, করুণাবাবু ছাড়া আর কেউ খামখেয়ালি জয়ন্ত ডাক্তারের হাঁড়ির খবর দিতে পারবে না– কারণ তারা দুজনে খালি সমব্যবসায়ী নন, ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে।
অবিনাশবাবুকে দেখে করুণা খুব সাদরে অভ্যর্থনা করলেন। চা পান করতে করতে দুজনে মিলে খানিকক্ষণ একথা-সেকথা নিয়ে আলোচনা করলেন। তারপর চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে অবিনাশবাবু বললেন, আচ্ছা করুণা, তোমার আর আমার চেয়ে বড় বন্ধু জয়ন্তের বোধহয়। আর কেউ নেই, কী বলো?
করুণা বললেন, এ কথা সত্যি বটে। কিন্তু হঠাৎ এমন কথা জিজ্ঞাসা করছ কেন বলো দেখি? আজকাল তো জয়ন্তের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে।
–তাই নাকি? তোমরা দুজনেই ডাক্তার অথচ তোমাদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ নেই?
আগে প্রায়ই দেখা হত। কিন্তু গেল কয়বছর ধরে জয়ন্ত ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। আমার বিশ্বাস, তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। দিনরাত যে সব আজগুবি বৈজ্ঞানিক ব্যাপার নিয়ে নাড়াচাড়া করে আর, পাগলের মতন যেসব কথা নিয়ে বক বক করে তার কোনও মানেই হয় না। দেখে-শুনে আমি তার হাল একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি!
অবিনাশবাবু বললেন, ও, বুঝেছি। তোমাদের ভেতরে মতভেদ হয়েছে। আচ্ছা করুণা, তুমি জয়ন্তের নতুন বন্ধু তিনকড়ি বটব্যালকে চেনো?
করুণা ভুরু কুঁচকে বললেন, তিনকড়ি! না, ও নামও কখনও শুনিনি!
করুণার কাছ থেকে আর বিশেষ কিছু জানা যাবে না বুঝে অবিনাশবাবু আবার বাড়িমুখো হলেন। তিনকড়ির কথা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে-ঘামিয়ে সে দিনটাই তাঁর বাজে নষ্ট হয়ে গেল। কে এই তিনকড়ি, জয়ন্তের সঙ্গে এমন ছোটলোকের কী সম্পর্ক, তিনি কিছুতেই সেটা আন্দাজ করতে পারলেন না। এমনকী রাত্তিরেও সেই ব্যাপারটা তাঁকে যেন একেবারে পেয়ে বসল। ঘুমোবার জন্যে চোখ মুদেও অন্ধকারের ভিতরে তিনি যেন দেখতে পেলেন সদানন্দের বলা সেই গল্পের ছবিটি নির্জন নিশুত রাত রাস্তায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আলোর থামগুলো; অস্বাভাবিক আকারের একটা ঘৃণ্য মানুষের বদ চেহারা খটখট করে এগিয়ে আসছে; একটি ছোট্ট মেয়ে ছুটতে ছুটতে চলে যাচ্ছে; দুজনের গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগল–ছোট মেয়েটি পড়ে গেল, আর সেই বেয়াড়া মানুষটা তাকে দু-পায়ে থেঁতলে পথের ওপরে ফেলে রেখেই আবার চলতে শুরু করল,–অম্লানমুখেই।…তারপর তিনি দেখলেন, তাঁর বন্ধু জয়ন্ত বিছানায় শুয়ে ঘুমে অচেতন হয়ে আছেন। সেই ভীষণ লোকটা অনায়াসেই জয়ন্তের বিছানায় পাশে এসে দাঁড়াল; অসঙ্কোচে জয়ন্তের নাম ধরে ডাকলে; তাঁর বন্ধুর ঘুম ভেঙে গেল, তাড়াতাড়ি উঠে বসে এমন অসময়েও এই ভয়াবহ মূর্তিটিকে ঘরের মধ্যে দেখেও সে কিছুমাত্র অসন্তোষ প্রকাশ করলে না! লোকটা তাকে বললে চেক সই করে দিতে এবং জয়ন্তও বিনা বাক্যব্যয়ে তার এই অসঙ্গ ত অনুরোধ রক্ষা করলে!
