আমি হুঁশিয়ার হয়েই রইলুম। বাইরের চোখ বুজে শুয়ে আছি বটে, কিন্তু মনের চোখ খোলা আছে! তন্দ্রা অনেকবারই সোহাগ করে আমাকে ঘুম পাড়াতে এসেছিল, কিন্তু আজ আর তার কোনও জারিজুরিই খাটল না! আমি জোর করে সারারাত জেগে রইলুম!
তাঁবুর ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো এল, কিন্তু রাত্রের চোর এল না! পাখিদের সমবেত চিৎকার শুনে মনে হল, আমার ব্যর্থতা দেখে তারা যেন আমাকে টিটকারি দিচ্ছে!
বিরক্ত মনে তাঁবুর পর্দা ঠেলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালুম।
সর্দার কাছের একটা বাঁশঝাড়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে সেলাম করলে।
আমি তিক্ত স্বরে বললুম, সারা রাত জেগে থাকাই সার হল। বদমাইশ চোরটা কাল আসেনি।
সর্দার বললে, সে এসেছিল।
এসেছিল!
হ্যাঁ হুজুর, ওই বাঁশঝাড়ের মধ্যে।
ওর ভিতর দিয়ে রাত্রে বা দিনে কোনও মানুষ আসতে পারে না।
হুজুর, তাকে মানুষ মনে করছেন কেন?
কী সর্দার, তুমিও কি তাকে পেতনি বলে ভাবো?
আমি তাকে কী মনে করি, আল্লাই তা জানেন। কিন্তু সে ওই বাঁশঝাড়ের মধ্যে এসেছিল, আমি কাল রাতে ওইখানে শুকনো পাতায় পায়ের শব্দ শুনেছি। আজ এখনই ওই জায়গাটা আমি পরীক্ষা করে আসছি। বাঁশঝাড়ের তলাকার জমি এখনও পরশু রাতের বৃষ্টিতে নরম হয়ে আছে। ওই জমিতে আমি হাঁটু আর হাতের ছাপ দেখেছি। সে হামাগুড়ি দিয়ে বাঁশঝাড়ের তলা দিয়ে আসছিল। কিন্তু তার চোখ আমাদের চেয়ে ঢের বেশি তীক্ষ্ণ, সে চোখ তো এখন আর মানুষের চোখ নয়! গাছের ওপরে আমাকে সে নিশ্চয় দেখে ফেলেছে। তারপর আর কী সে বাঁশঝাড় ছেড়ে বাইরে বেরোয়?
রুদ্ধ আক্রোশে আমি স্তব্ধ হয়ে রইলুম।
সর্দার আবার শুধোলে, হুজুর, আমাদের তাঁবু তুলে এখান থেকে আজ রওনা হবার কথা। কখন যাবেন?
আমি দৃঢ়স্বরে বললুম, আগে ওই চোরকে ধরব, তবে এখান থেকে এক পা নড়ব। যদি এক মাস এখানে থাকতে হয়, তাও থামব! সর্দার, আজ তোমার বুটা আমার বুর পাশে এনে খাঁটিয়ে ফ্যালো। আজ রাত্রে তুমি আর গাছে চোড়ো না, নিজের তাঁবুর ভিতরে জেগে বসে থেকো। আমার তাঁবুতে আমিও জেগে থাকব। আমার ডাক শুনলেই তুমি বেরিয়ে এসো।
সর্দার ঘাড় নেড়ে জানালে, আচ্ছা।
সে রাতেও আবার জাগবার পালা। আকাশে চাঁদ জাগছে, বনে রক্তপিপাসা জাগছে, তাঁবুতে আমার চোখ জাগছে, বাঁশঝাড়ে চোর জাগছে! আর জাগছে নদী–যেন ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে-শোনাতে!
সর্দার বলে কী?–তাকে মানুষ মনে করছেন কেন? সে মানুষ নয়! সর্দারের মনে কুসংস্কারের উদয় হয়েছে? আশ্চর্য কী, সে-ও তো আফ্রিকারই লোক! এই আফ্রিকা হচ্ছে বিশ্বের সমস্ত কুসংস্কারের স্বদেশ! এখানে আকাশে বাতাসে জলে স্থলে ঘুরে বেড়ায় শুধু ভুত আর পেতনি! যে নরখাদক জন্তু বেশি মানুষ মারে, সে আর এখানে সাধারণ জন্তু থাকে না, লোকে বলে–দুষ্ট মানুষই নাকি ঝাড়ফুঁক তুকতাকের গুণে জন্তুর দেহ ধরে নরনারীর ঘাড় ভাঙছে! তাই এদেশে ভূতের চেয়ে রোজার দল ভারী!
কাল সারারাত কেটেছে অনিদ্রায়, আজও রাতদুপুর হয়ে গেছে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে তার আমেজ এসেছে বুঝতে পারিনি। হঠাৎ তাঁবুর ভিতরে খটমট করে জিনিস নড়ার আওয়াজ হল এবং সঙ্গে সঙ্গে চট করে আমার তন্দ্রার ঘোর কেটে গেল!
ঘরের ভিতরে কেউ এসেছে! ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে তাকে দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু বিষম একটা পূতিগন্ধে চারিদিক বিষাক্ত হয়ে উঠেছে! মানুষের গা দিয়ে এরকম দুর্গন্ধ বেরোয় না!
আমি শ্বাস রোধ করে পাথরের মতন স্থির ভাবে শুয়ে রইলুম। যে ঘরের ভিতরে এসে ঢুকেছে সেও নিসাড়,–তন্দ্রা ছুটে যাবার সময়ে হয়তো আমি সামান্য চমকে উঠেছিলুম, হয়তো সে দাঁড়িয়ে আমাকে তীক্ষ্ণনেত্রে পরীক্ষা করছে, হয়তো সে অন্ধকারেও দেখতে পায়!
এইভাবে মিনিট পাঁচেক কাটল। নীরবতার ভিতরে কেমন একটা বন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আমার কানকে আঘাত করতে লাগল বারংবার। আর সেই পূতিগন্ধ! উঃ, অসহনীয়!
আবার খট খট করে শব্দ হল! কেউ আমার টেবিলের ওপরে জিনিসপত্তর নাড়াচাড়া করছে! আমি ঘুমোচ্ছি ভেবে নিশ্চয় সে নিশ্চিত হয়েছে!
আগে আন্দাজ করে নিলুম, চোর আমার টেবিলের কোনওদিকে আছে। তারপর কোনওরকম জানান না দিয়ে আচম্বিতে একলাফ মেরে টেবিলের সেইদিকে লাফিয়ে পড়লুম এবং চোরকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরতে গেলুম–
সঙ্গে সঙ্গে দু-খানা অত্যন্ত সবল বাহু আমাকে এমন প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারলে যে, আমি আবার ছিটকে বিছানার ওপরে এসে পড়লুম!
দৈবগতিতে আমার হাত পড়ল ইলেকট্রিক টর্চের ওপরে,বন্দুকের সঙ্গে এটাকেও আমি প্রতিরাত্রে পাশে নিয়ে শয়ন করি।
টর্চটা তুলে নিয়েই টিপলুম চাবি এবং পর-পলকেই বৈদ্যুতিক আলোপ্রবাহের মধ্যে আমার চোখের সুমুখে যে-মুখখানা জেগে উঠল, তার স্মৃতি আমি জীবনে ভুলতে পারব না!
রাশিকৃত উজ্জ্বল কিলবিলে কালো সাপের মতন কেশগুচ্ছের মধ্যে একখানা ভয়ানক কালো মুখ! সে মুখ স্ত্রীলোকের এবং সে মুখ মানুষের–এবং সে মুখ মানুষের নয়! ওই অগ্নিবর্ষী দুটো ভাটার মতন ক্ষুধিত চক্ষু–তা মানুষের চোখ নয় কখনও! ওই দংশনোদ্যত ক্রুদ্ধ নিষ্ঠুর দন্তগুলো–ওগুলো কি মানুষের দাঁত?
হঠাৎ তীব্র আলোকছটায় মূর্তির চোখদুটো নিশ্চয় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল!
আমি চিৎকার করে ডাকলুম–সর্দার, সর্দার, সর্দার!
