অন্তত একজনও চলন্ত মানুষ দেখবার জন্যে আমার প্রাণ-মন যখন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, তখন রাস্তার মোড়ে হঠাৎ দেখতে পেলুম দুটো মূর্তিকে। প্রথম মূর্তিটা মাথায় বেঁটেসেঁটে, খুব তাড়াতাড়ি হনহন করে এগিয়ে আসছে। অন্য মূর্তি হচ্ছে একটি ছোট মেয়ের বয়স আট দশের বেশি হবে না, সে উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে আসছিল। রাস্তার বাঁকের মুখে দুজনেই দুজনের ওপরে গিয়ে পড়ল। ধাক্কা খেয়ে মেয়েটি ফুটপাতের ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। অবিনাশ, তার পরের কথা তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না। কারণ, সেই বেঁটে লোকটা সেই কচি বাচ্ছার গায়ের ওপরে দুই-পা রেখে উঠে দাঁড়াল, তারপর খুব সহজভাবেই তাকে দুই পায়ে হেঁতলে নির্বিকারের মতন আবার পথ চলতে লাগল। মেয়েটি পাড়া কাঁপিয়ে আর্তনাদ শুরু করে দিলে।
রাগে আমার সর্বশরীর জ্বলে গেল। টপ করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে ছুটে গিয়ে তার কোটের গলাটা সজোরে চেপে ধরলুম। কিন্তু তার মুখের পানে তাকিয়ে আমার সারা দেহ শিউরে উঠল। অবিনাশ, সে-মুখ মানুষের মুখ নয়–মানুষের ছাঁচে গড়া সে যেন কোনও অজানা হিংস্র জানোয়ারের মুখ! আমি তার গলা চেপে ধরতেই সে ফিরে দাঁড়িয়ে যে-দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে দেখলে তাও এক ভয়ানক অমানুষিক ভাবে ভরা! কিন্তু আমি যখন তাকে আবার ঘটনাস্থলের দিকে টেনে নিয়ে চললুম, তখন সে আমাকে কোনওরকম বাধা দেবার চেষ্টা করলে না।
ঘটনাস্থলে তখন মেয়েটির কান্না শুনে অনেক লোকজন এসে জড়ো হয়েছে। মেয়েটি এই অসময়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল পাড়ার এক ডাক্তার ডাকবার জন্যে তার বাড়িতে নাকি কার খুব বাড়াবাড়ি অসুখ। ডাক্তারকে খবর দিয়ে ফেরবার মুখেই এই কাণ্ড!
ইতিমধ্যে ডাক্তারও এসে হাজির! সব শুনে তিনিও লোকটার দিকে রুখে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু তার চেহারা দেখে ভয়ে চমকে ও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ডাক্তারের মুখ দেখেই বুঝলুম, এই নৃশংস জীবটাকে উচিতমতো শিক্ষা দেবার জন্যে তার হাতদুটো নিশপিশ করছে, কিন্তু তাঁর সাহসে কুলোচ্ছে না! পথে এসে যারা জড়ো হয়েছিল তারাও সবাই রেগে আগুন হয়ে উঠেছিল, কিন্তু এই মূর্তিমান নরপিশাচের চেহারা দেখে তাদের সকলেরই বুকের রক্ত যেন জল হয়ে গেল!
আমি লোকটাকে ডেকে বললুম, আপনার মতন পাষণ্ড দুনিয়ায় আমি দুটি দেখিনি! আপনি মানুষের সমাজে থাকবার যোগ্য নন।
লোকটা বললে, মশাই, এই সামান্য একটা দৈব-দুর্ঘটনা নিয়ে আপনারা এত বেশি গোলমাল করবেন না। আপনি কী করতে চান?
আপনাকে নিয়ে থানায় যেতে চাই।
মশাই, থানায় গিয়ে কোনও ভদ্রলোকই মান খোয়াতে রাজি হয় না। কিছু টাকা পেলে যদি আপনাদের সাধ মেটে তাহলে আমি টাকা দিতে রাজি আছি।
আমরা সবাই মিলে স্থির করলুম ক্ষতিপূরণের জন্যে লোকটাকে একশো টাকা দিতে হবে।
টাকার পরিমাণ শুনে লোকটা প্রথমে কিছু ইতস্তত করতে লাগল, কিন্তু সকলের মারমুখো মূর্তির দিকে চেয়ে শেষটা সে রাজি হয়ে গেল। বললে, তাহলে আপনারা আমার সঙ্গে-সঙ্গে আসুন। আমার বাড়িতে গেলেই টাকা পাবেন।
তার সঙ্গে-সঙ্গে আমরা সবাই অগ্রসর হলুম। কিন্তু সে আমাদের কোথায় নিয়ে এল, জানো অবিনাশ? এই বিদঘুঁটে বাড়িটার সামনে! দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে একটা চাবি বার করে দ্বার খুলে সে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল এবং খানিক পরেই একখানা চেক হাতে নিয়ে ফিরে এল। চেকের তলায় যিনি নাম সই করেছেন, তিনি শুধু আমারই জানিত লোক নন, এই শহরের একজন বিখ্যাত ও মাননীয় ব্যক্তি।
আমি বিস্মিত স্বরে বললুম, মশাই, ব্যাপারটা বড় গোলমেলে বলে মনে হচ্ছে। কার চেক আপনি কাকে দিচ্ছেন?
লোকটা বিশ্রীভাবে দন্তবিকাশ করে বললে, আপনাদের ভয় পাবার কোনও কারণ নেই। যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে আপনাদের সঙ্গে আমি নিজেই গিয়ে চেকখানা ভাঙিয়ে দিতে রাজি আছি।
আমরা তাই-ই করলুম। তাকে নিয়ে তখনকার মতন আবার বাড়িতে ফিরে এলুম। তারপর যথাসময়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে আমি নিজের হাতে চেকখানা দাখিল করলুম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ছিল এ চেক জাল ও অচল। কিন্তু ব্যাঙ্কে সেই চেক চলল।
অবিনাশ বললেন, হুঁ। তাই নাকি?
সদানন্দ বললেন, হ্যাঁ। তুমিও বোধহয় আমারই মতো আশ্চর্য হচ্ছ? বাস্তবিক, চেকের তলায় যাঁর নাম ছিল, তার মতন মহৎ লোক এমন জানোয়ারের সঙ্গে কখনওই কোনও সম্পর্ক রাখতে পারেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনওরকম ভয়টয় দেখিয়ে এই লোকটা তার কাছ থেকে চেকখানা আদায় করেছিল।
অবিনাশ হঠাৎ গলার স্বর বদলে জিজ্ঞাসা করলেন, চেকে যিনি নাম সই করেছিলেন তিনিও ওই বাড়িতে থাকেন কি না, সে-খোঁজ নিয়েছ কি?
সদানন্দ বললেন, ও-বাড়িতে কখনও কোনও ভদ্রলোক বাস করতে পারেন? ও কি ভদ্রলোকের জায়গা? চেকে যিনি নাম সই করেছিলেন, তার বাসা যে অন্য জায়গায়, একথা তো আমি আগে থাকতেই জানি!
এ বিষয়ে তুমি আর কোনও খোঁজখবর নাওনি?
না, নেওয়া দরকার মনে করিনি। তবে এ পথ দিয়ে গেলেই ওই অদ্ভুত বাড়িখানা ভালো করে লক্ষ না করে আমি পারি না। ওটা আমার বাড়ি বলেই মনে হয় না। অত বড় বাড়িতে মোটে ওই কটি জানলা! জানলাগুলো কখনও খোলাও দেখিনি। সদর দরজাটাও সর্বদাই বন্ধ থাকে। মাঝে-মাঝে কেবল সেই বিশ্রী লোকটা ওই দরজা খুলে বাইরে আসে। ও-বাড়িটা যেন রহস্যময়!
