রামহরি বললে, বাবু, দেশে ফিরে এবার আর আমি তোমাদের দলে ভিড়ব না!
বিমল হেসে বললে, কেন?
তোমরা সব করতে পারো বাবু! কোনওদিন হয়তো আবার স্বশরীরে স্বর্গে যাওয়ার বায়না ধরবে। তোমাদের পায়ে দূর থেকেই নমস্কার।
বাঘার মাথা চাপড়ে কুমার বললে, হ্যাঁ রে বাঘা, তোর কী মত?
বাঘা ল্যাজ নেড়ে জবাব দিলে, ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ।
মানব দানব (উপন্যাস)
প্রথম । রহস্যময় বাড়ি
যাকে বলে মিশুকে লোক, অ্যাটর্নি অবিনাশবাবু সে-প্রকৃতির মানুষ ছিলেন না।
কেউ তাকে হাসতে দেখেনি। রোগা-সোগা লম্বাটে চেহারা, সর্বদাই গম্ভীর মুখে থাকেন, কথাবার্তা কন খুবই কম। তবু লোকে তাকে অপছন্দ করে না।
তার সহ্যশক্তি ছিল যথেষ্ট। যখন কোনও আসরে গিয়ে বসতেন, কোনওরকম অন্যায় কথা বা যুক্তিহীন তর্কই তাকে বিচলিত করতে পারত না।
অতিগম্ভীর মুখে তার শান্ত ও মিষ্ট চোখ দুটি সকলকে আকর্ষণ করত। নিজের প্রকৃতির মাধুর্যকে তিনি চেহারায় ও কথাবার্তায় প্রকাশ করতে পারতেন না বটে, কিন্তু সেটা বিশেষরূপে ফুটে উঠত তাঁর অনেক সদয় ব্যবহারের ভিতর দিয়ে।
কারণে বা অকারণে অবিনাশবাবুর মন যেদিন কিঞ্চিৎ খুশি থাকত, সেদিন এক পেয়ালার পরেও তিনি আর এক পেয়ালা চা পান করবার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। এবং সেদিন দ্বিতীয় পেয়ালা চা পান করতে করতে তিনি নিজের কথাবার্তার মাত্রাও বেশ কিছু বাড়িয়ে না ফেলে। পারতেন না।
তিনি সহজে কারুর সঙ্গে মিশতেন না, কিন্তু এক দিন যার সঙ্গে মেলামেশা করতেন, সে হয়ে থাকত তাঁর চিরদিনের বন্ধু।
এর ঠিক উলটো প্রকৃতি ছিল তাঁর বন্ধু সদানন্দবাবুর। তাঁর মুখও যেমন, কথাবার্তাও তেমনি সর্বদাই হাসিখুশিমাখা। সামাজিকতায়, পাঁচজনের সঙ্গে মেলামেশায় ও নানারকম গল্পগুজবে তিনি ছিলেন যাকে বলে অদ্বিতীয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হত না যে, অবিনাশবাবুর সঙ্গে সদানন্দবাবুর স্বভাবের মিল আছে কোথাও। অথচ এরা দুজনেই ছিলেন দুজনের বিশেষ বন্ধু। সরস ও নীরস চেহারার ভিতরে এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব দেখা যায় না সচরাচর।
তাদের একটা মস্ত অভ্যাস ছিল। সেটা হচ্ছে দুই বন্ধুতে মিলে কলকাতার পথে-বিপথে বেড়িয়ে বেড়ানো। তারা যখন বেড়িয়ে বেড়াতেন তখন দেখলে মনে হত, তাঁদের দুজনেরই ধাত বুঝি একই রকম! দুজনেই গম্ভীর, বোবার মতন নির্বাক। পৃথিবীর কোনও কিছুর দিকেই যে তাঁদের প্রাণের টান আছে এবং তারা যে পরস্পরের সঙ্গসুখ উপভোগ করছেন, এ কথা তাদের মুখ দেখে বোঝা অসম্ভব ছিল। অথচ সন্ধ্যার সময়ে দুজনে মিলে একটিবার বেড়িয়ে আসতে না পারলে দুই বন্ধুরই প্রাণ যেন ছটফট করতে থাকত।
ব্লটিংয়ের ওপরে কালির ফোঁটা যেমন ক্রমেই বড় হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, আজকাল কলকাতা শহরের আকারও তেমনি বড় হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এক-একটি এমন নতুন পল্লি তৈরি হয়েছে, যার ফিটফাট পরিষ্কার ঝরঝরে রূপ দেখলে চোখ যেন জুড়িয়ে যায়। পুরোনো কলকাতা শহরের সঙ্গে এ-পল্লিগুলি যেন কিছুতেই খাপ খায় না। ঠিক যেন কোনও কয়লার মতন কালো ও ছেঁড়াখোঁড়া কাপড় পরা একটি মেয়ের গায়ে জড়োয়ার গয়না সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
এই রকমই একটা নতুন তৈরি পল্লির ভিতর দিয়ে সেদিন বৈকালে অবিনাশবাবু ও সদানন্দবাবু একসঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে চলেছিলেন। খানিকক্ষণ পরেই তারা একটি অদ্ভুত-আকার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন।
ও-রকম একটা নতুন পল্লির ভিতরে এমন মান্ধাতার আমলের আশ্চর্য বাড়ি প্রত্যেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাড়িখানা দেখলেই বোঝা যায়, তার বয়স একশো বছরের কম নয়। এবং গেল পঞ্চাশ বৎসরের ভিতরে সে-বাড়ির গায়ে যে রাজমিস্ত্রি হাত দিয়েছে, এমন প্রমাণও নজরে পড়ে না। প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ি। অথচ তার দোতলায় জানলা আছে মোটে চারটে। একতলায় আছে গুটি-দুয়েক জানলা ও একটি মস্ত সদর দরজা। ফুটপাতের ওপরে বাড়ির সামনে এধার থেকে ওধার পর্যন্ত একটি লম্বা রোয়াক একটানা চলে গিয়েছে। সেই রোয়াকের ওপরে পানওয়ালা, ভুনিওয়ালা ও ফুলুরিওয়ালারা নোংরা দোকান সাজিয়ে বসেছে এবং রাত্রে মুটে ও ভবঘুরেরা সেখানে আরামে গা ঢেলে দিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সুখের স্বপন দেখে। বাড়ির সদর দরজা প্রায় সর্বদাই বন্ধ থাকে এবং ইস্কুলের ছেলেরা দরজার কাঠের ওপরে ছুরি দিয়ে নিজেদের নামকে অমর করবার চেষ্টা করে যায়। বাড়ি ও তার বাসিন্দারা এসব অত্যাচার নির্বিবাদে সহ্য করে।
নিজের বেতের ছড়িটা তুলে এই বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে সদানন্দ বললেন, অবিনাশ, এ বাড়িটা কোনওদিন তুমি লক্ষ করেছ কি?
সদানন্দের কথা শুনে অবিনাশের মুখের ভাব যেন একটু বদলে গেল। তিনি খালি বললেন, কেন বলো দেখি?
এই বাড়ির সম্বন্ধে আমি একটা বেয়াড়া গল্প বলতে পারি। শুনি।
সদানন্দ বলতে লাগলেনঃ
কিছুদিন আগেকার কথা। পুজোর সময় বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলুম, কলকাতায় যখন ফিরলুম তখন শেষ রাত। ট্যাক্সি করে নিজের বাড়ির দিকে আসছি। পথের পর পথ–নির্জন ও ঘুমন্ত। পথের পর পথ–যেন কোনও অদৃশ্য শোভাযাত্রার আলোর মালা সাজিয়ে গ্যাসপোস্টগুলো দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি। পৃথিবীতে যে জীবন্ত মানুষ আছে তা প্রমাণিত করবার জন্যে একটা পাহারাওয়ালার লাল পাগড়ি পর্যন্ত দেখা দিলে না।
