চোখের সামনে, সেই জাহাজের গায়ের উপরে ফুটে উঠল–গঙ্গা-ধোয়া, আম কাঁঠালের বন-দিয়ে-ঘেরা, কোকিল-পাপিয়া-ডাকা আমাদের বাংলাদেশের আসল ছবি!
.
ট্রাইশেয়াটপস
আনন্দের প্রথম আবেগটা কেটে গেলে পর সবাইকে ডেকে বললুম–ভাই সব! আজ এতদিন পরে ভগবান আমাদের ওপরে মুখ তুলে চেয়েছেন। এতদিন পরে আবার আমাদের দেশে ফেরবার সুযোগ ঘটেছে, এমন সুযোগ গেলে আর পাব না! তোমরা সবাই মিলে চিৎকার করো, আমি আর বিমল সেইসঙ্গে বন্দুকের আওয়াজ করি। তাহলেই জাহাজের লোকেরা শুনতে পাবে।
আমাদের দল এখন খুব ভারী। কাজেই সকলে মিলে যখন চিৎকার করতে লাগল, সারা আকাশটা যেন কেঁপে উঠল। তার উপরে আমার আর বিমলের বন্দুকের আওয়াজ।
হঠাৎ জাহাজ থেকেও বারদুয়েক বন্দুকের শব্দ হল।
কমল আনন্দে লাফাতে লাফাতে বললে, শুনতে পেয়েছে! শুনতে পেয়েছে! জাহাজের লোকেরা আমাদের চিৎকার শুনতে পেয়েছে।
কুমার বললে, ওই যে জাহাজ থেকে দুখানা নৌকা নীচে নামিয়ে দিচ্ছে! ওই যে, জনকয়েক লোকও দড়ির সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছে।
রামহরি বললে, দেখে মনে হচ্ছে ওরা যেন জাহাজি গোরা!
দুখানা নৌকো তীরের দিকে আসতে লাগল।
রামহরির কথাই সত্য। নৌকোর উপরে যারা রয়েছে, তারা সকলেই নীল পোশাক পরা বিলাতি খালাসি!
নৌকো তীরের কাছে আসবামাত্র আমরা তাড়াতাড়ি তার কাছে ছুটে গেলুম। আজ কতদিন পরে পৃথিবীর নতুন লোকের সঙ্গে দেখা! সাহেব হলেও তাদের যেন ভাই বলে মনে হতে লাগল।
একজন সাহেব আমার কাছে এগিয়ে এলেন। তার পোশাক দেখেই বুঝুলুম নিশ্চয়ই তিনি জাহাজের উচ্চপদস্থ কর্মচারী।
তিনি ইংরাজিতে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের দেখে তো ভারতবর্ষের লোক বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরের এই অজানা দ্বীপে তোমরা এলে কেমন করে? আমাদের জাহাজ ঝড়ের তোড়েই এদিকে এসে পড়েছে, নইলে এ-দ্বীপে তো কখনও কোনও জাহাজ থামে না!
আমি বললুম, সাহেব, আমরা মঙ্গলগ্রহে ছিলুম, সেখানকার উড়োজাহাজে চড়ে এখানে এসেছি?
কী বললে? তোমরা মঙ্গলগ্রহে ছিলে?
হ্যাঁ, সায়েব।
তুমি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ?
না সাহেব। বিশ্বাস না হয়, আমাদের সঙ্গীদের জিজ্ঞাসা করুন।
তা হলে তোমরা সবাই পাগল!
হ্যাঁ সায়েব, প্রথমে আমাদের কথা পাগলের প্রলাপ বলেই মনে হবে বটে। কিন্তু পরে আমাদের সব কথা শুনলেই বুঝবেন আমরা সত্যি বলছি কিনা। আপাতত আমরা আর কিছু চাই না, এই ভয়ানক দ্বীপ থেকে আগে আমাদের উদ্ধার করুন।
এ দ্বীপকে ভয়ানক বলছ কেন?
সায়েব, এখানে যেসব ভীষণ জীবজন্তু আছে, তুমি স্বপ্নেও কখনও তাদের দেখনি।
সে আবার কি?
এ-দ্বীপের বাসিন্দা কারা জানো? পাহাড়ের মতো উঁচু ডিপ্লোজােকাস আর ডাইনসর, হাতির মতো বড়-বড় ষাঁড়, উড়ন্ত সরীসৃপ বা টেরোডাকটাইল, খাঁড়াতে বাঘ, দানব শ্লথ–
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাহেব হো হো করে হেসে উঠে বললেন, থামো, থামো, আর পাগলামি কোরো না।
সেই সঙ্গেই গোরা খালাসিরা চারিদিক কাঁপিয়ে বিকট চিৎকার করে উঠল।
ফিরে দেখি আমাদের কাছ থেকে খানিক তফাতেই একটা ছোটখাট বনের ভিতর থেকে সাহেবের ব্যঙ্গ-হাসির মূর্তিমান প্রতিবাদের মতো কিম্ভুতকিমাকার প্রকাণ্ড এক জানোয়ার বেগে বেরিয়ে আসছে। কেবলমাত্র তার মুখটাই বোধহয় সাতফুটেরও চেয়ে বেশি লম্বা এবং তার মাথার উপরে ত্রিশূলের মতো তিনটে ধারালো শিং ও তার মুখখানা দেখতে যেন অনেকটা আমাদের জগদ্ধাত্রী দেবীর কাল্পনিক সিংহের মতো। তার চেহারা দেখে বুঝলুম সে হচ্ছে ট্রাইশেরাটপস।
সাহেব আর গোরা-খালাসিরা চোখের পলক না ফেলতেই এক ছুটে নৌকোর উপরে গিয়ে উঠল এবং বলাবাহুল্য আমরাও সকলে গিয়ে নৌকোর উপরে আশ্রয় নিতে কিছুমাত্র বিলম্ব করলুম না। নৌকো দুখানা জাহাজের দিকে চলল, সাহেব আমার করমর্দন করে বললেন, তোমার কথার অবিশ্বাস করেছিলুম বলে এখন আমি ক্ষমা চাইছি। আজ যা দেখলুম জীবনে আর ভুলব না।
জাহাজ ছাড়ল, মানুষের দেশে আবার আমাদের পৌঁছে দেবে বলে। আবার যে স্বদেশে ফিরতে পারব, এই আনন্দে আমাদের সমস্ত মন যেন আকুল হয়ে উঠল।
কিন্তু ঠিক শেষমুহূর্তেই এই দানব রাজ্যের কয়েকটি সুপরিচিত দূত আকাশপথে আর একবার আমাদের দেখা দিলে। তারা সেই গরুড় পাখি বা টেরোডাকটাইল! বিশ ফুট জুড়ে ডানা ছড়িয়ে তারা উড়ে যাচ্ছে দলে দলে।
যে দুটো পাখি আমাদের খুব কাছে ছিল, হঠাৎ তাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে গেল। কি বিষম তাদের ঝটাপটি কি কর্কশ তাদের চিৎকার!
জাহাজশুদ্ধ লোক ভয়ে ও বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখতে লাগল। অনেক গোরা-খালাসি হাঁটু গেড়ে বসে উপাসনায় প্রবৃত্ত হল। একজন পাদ্রি তাঁর ক্রুশখানা উঁচু করে তুলে ধরলেন সকলের মুখ দেখে মনে হল নিশ্চয় তারা তাদের উড়ন্ত প্রেতাত্মা বা নরকের দূত বলে ধরে নিয়েছে। স্ত্রীলোকরা আর শিশুরা তো কেঁদেই অস্থির–কেউ কেউ মুচ্ছিত হয়ে পড়ল।
এমনি ভয়, বিস্ময়, আর্তনাদের মধ্যে জাহাজ বেগে অগ্রসর হল, গরুড় পাখিরাও ধীরে ধীরে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল। পাদ্রিসাহেব বললেন তার পবিত্র ক্রুশ দেখেই শয়তানের দূতেরা ভয় পেয়ে আবার নরকে পালিয়ে গেল।
ময়নামতীর মায়াকানন ক্রমেই আকাশের নীলপটে মিলিয়ে যাচ্ছে, পাহাড়গুলোকে দূর থেকে দেখাচ্ছে চিত্রেলেখা মেঘের মতো।
