কি বলছেন? আগুন কোথায় পেলুম? সেও বড় অবাক কারখানা, বাবুজি! ওই যে পাহাড় দেখছেন, দিনরাত ওর ভিতরে আগুন জ্বলছে। আমরা ওইখান থেকেই আগুন। আনি!
আবার এই দেখুন, পাথর ঘষে ঘষে আমরা কেমন সব বর্ষার ফলা, তির আর ছুরি ছোরা-কুড়ুল তৈরি করেছি। অস্ত্রগুলোতে কেমন ধার হয়েছে, দেখছেন তো? এই সব ছুরি আর কুড়ুল দিয়ে গাছ কেটে কখানা ছিপও বানিয়ে ফেলেছি, এখন দরকার হলে জলের উপরেও আনাগোনা করতে পারি! খোদাতালার দয়ায় আমাদের আর অন্য কোনও কষ্ট নেই বটে, কিন্তু আজ কদিন থেকে নতুন এক বিপদ উপস্থিত হয়েছে।
রোজ রাত্রে কি একটা অদ্ভুত জন্তু আমাদের সন্ধান পেয়ে বেজায় উৎপাত শুরু করেছে। এরমধ্যেই সে আমাদের দল থেকে পাঁচজন লোককে ধরে নিয়ে গেছে, আমরা কিছুতেই তার হাত থেকে ছাড়ান পাচ্ছি না। এক রাত্রে চাঁদের আলোয় জন্তুটাকে আমি দেখেছি। দেখতে তাকে বাঘের মতো বটে, কিন্তু সে বাঘ নয়। কারণ বাঘের চেয়েও সে ঢের বেশি বড়, আর তার মুখের দু-দিকে হাতির মতো দুটো দাঁত আছে।
কি বললেন বাবুজি? সেকেলে খাড়া-ঘেঁতো বাঘ! সে আবার কীরকম বাঘ?
তা সে বাঘই হোক আর যাই-ই হোক, আমাদের আর এ-দ্বীপে থাকা পোষাবে না। এইবেলা প্রাণ নিয়ে এখান থেকে না পালালে একে একে সবাইকেই মরতে হবে। এখান থেকে কোথায় যাই, বলতে পারেন?
.
জাহাজ! জাহাজ
সোনাউল্লার গল্প শেষ হলে বিমল বললে, সোনাউল্লা, তোমাদের বাহাদুরি আছে বটে। এই সৃষ্টিছাড়া মুল্লুকে তোমরা এমন করে সংসার পেতে নিয়েছ।
সোনাউল্লা দাড়িতে হাত বুলোতে-বুলোতে বললে, কিন্তু বাবুজি, এ সংসার আবার তুলতে হবে। নইলে ওই খাঁড়া-সেঁতো বাঘ নিশ্চয়ই আমাদের ফলার করে ফেলবে।
আমি বললুম, আচ্ছা সোনাউল্লা, তোমরা এক কাজ করো না কেন? আমরা যে গুহায় এতদিন ছিলুম, সে গুহাটা খুব বড় আর নিরাপদ। তার ভেতরে অনায়াসে একশো জনের ঠাই দিতে পারে। চলো, আমরা সকলে মিলে সেইখানে আবার ফিরে যাই?
সোনাউল্লা বললে, সে ঠাই এখান থেকে কত দূরে বাবুজি?
আমি বললুম, তা ঠিক করে বলতে পারি না। তবে আমরা যে পাহাড়ে থাকি, তার উপরে চড়ে দেখেছি এখানে এই একটি বই দ্বীপ নেই। তা যদি হয় তাহলে আমরা নৌকোয় চড়ে পূর্বদিকেই ওই জঙ্গলের কাছে গিয়ে নামলেই পাহাড়ের খুব কাছে গিয়ে পড়ব।
সোনাউল্লা বললে, তাহলে সেই কথাই ভালো। আমরা কাল সকালেই এখান থেকে পালাব। সকলকে খবরটা দিয়ে আসি–এই বলে সে উঠে গেল।
রামহরি মুখ ভার করে বললে, এদের দলে মোছলমানই বেশি। গুহার ভেতরে এতগুলো মোছলমানের সঙ্গে থাকলে আমাদের যে জাত যাবে বাবু!
আমি বললুম, এতই যদি জাতের ভয়, তাহলে আজ এদের হাতের রান্না মাংস কী করে খেলে রামহরি?
কে বললে আমি মাংস খেয়েছি? সব আমি লুকিয়ে বাঘাকে দিয়েছি। আমি খালি ফলমূল খেয়ে আছি!
বিমল হাসতে-হাসতে বলল, তাহলে তুমি এক কাজ করো রামহরি! আমরা আমাদের গুহায় ফিরে যাই, আর তুমি একলা এখানে বাস করো। এই দ্বীপে তোমার যে মহাদেব আছেন, তুমি রোজ প্রাণ ভরে তাঁর পূজা করতে পারবে আর তোমার জাতও রক্ষা পাবে।
কী যে বলো খোকাবাবু, সব ব্যাপারে ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না।–বলতে বলতে রামহরি রাগে গসগস করতে করতে সেখান থেকে উঠে গেল!
.
পরদিন সকালেই আমরা ছিপে চড়ে বেরিয়ে পড়লুম।
অনেকক্ষণ পরে আমরা যেখানে গিয়ে থামলুম, ঠিক তার সামনেই সেই ভয়াবহ অরণ্য, যার ভিতরে পথ হারিয়ে আমাদের প্রাণ যায়-যায় হয়ে উঠেছিল।
সেইখানে আমরা ছিপ ছেড়ে নেমে পড়লুম। ডাঙায় উঠে বালুকা প্রান্তরের দিকে তাকিয়েই আমি দেখতে পেলুম, দূরে সমুদ্রের ধারে আমাদের আশ্রয়স্থান সেই সুপরিচিত পাহাড়টি আকাশপানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
ঘণ্টা দুই পরে আমরা আবার আমাদের সেই পুরাতন গুহার মধ্যে ফিরে এলুম।
সেই দিন সন্ধ্যার সময়েই চারিদিক অন্ধকারে ডুবিয়ে ভীষণ এক ঝড় উঠল–তেমনি ঝড় আগে কখনও দেখিনি। সাগরের অনন্ত বুক থেকে তরঙ্গের এমন এক অশ্রান্ত কান্না ভেসে এল যে, পৃথিবীর আর সমস্ত শব্দ যেন কোথায় তলিয়ে গেল। ঝড়ের দাপটে আমাদের পাহাড়টা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপতে লাগল।
আমি বললুম, বিমল, এমন এক ঝড়ই আমাদের এই দ্বীপের দিকে টেনে নিয়ে এসেছিল, মনে আছে কি?
বিমল বললে, মনে আছে বইকী। সেদিনের কথা কি এ জীবনে আর ভুলতে পারব?
কুমার বললে, আজকের এই ঝড়টা যদি দ্বীপটাকে আমাদের দেশের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারত!
এমনি গল্প করতে করতে আর ঝড়ের হাহাকার শুনতে-শুনতে আমরা একে-একে ঘুমিয়ে পড়লুম।
হঠাৎ অনেকের চিৎকারে আর টানাটানিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল–শুনলুম কমল চিৎকার করে বলছে, বিনয়বাবু জাহাজ, জাহাজ।
তাড়াতাড়ি উঠে বসে দেখি, গুহার ভিতরে ভোরের আলো এসে পড়েছে আর আমার পাশে অত্যন্ত উত্তেজিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিমল, কুমার, কমল ও রামহরি।
জিজ্ঞাসা করলুম, ব্যাপার কী, তোমরা এত গোলমাল করছ কেন?
বিমল বললে, শিগগির উঠে আসুন বিনয়বাবু, দ্বীপের কাছে একখানা জাহাজ এসে নোঙর ফেলেছে।
শুনেই এক লাফে উঠে দাঁড়ালুম, তারপর ছুটে গুহার বাইরে গিয়ে পুলকিত নেত্রে দেখলুম, আকাশে বাতাসে কোথাও আর ঝড়ের চিহ্ন নেই এবং নীলসমুদ্রের উপরে একখানি লালরঙের প্রকাণ্ড জাহাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
