নৌকোগুলো হ্রদের সেই দ্বীপের দিকে ভেসে চলল।
আমি বললুম, কুমার, তোমরা কী করে এখানে এলে সে কথা তো কিছুই বললে না?
কুমার বললে, আচ্ছা শুনুন, খুব সংক্ষেপে বলে যাচ্ছি। আপনারা যেদিন শিকারের খোঁজে বেরিয়ে গেলেন, সেইদিন রাত্রেই ওই বনমানুষগুলো আমাদের আক্রমণ করে। ওরা যে কী করে আমাদের খোঁজ পেলে তা আমি জানি না। তাদের সেই হঠাৎ আক্রমণে আমরা একেবারে কাবু হয়ে পড়লুম। লাঠির ঘায়ে আমার মাথা ফেটে গেল, বাঘা রীতিমতো জখম হল। তারপরে তারা। আমাকে আর কমলকে নিয়ে নিজেদের বাসায় ফিরে এল। আমাদের নিয়ে ওরা যে কী করত তাও বলতে পারি না। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটা পুরো দিন আমরা এক গাছতলায় পড়ে রইলুম। বনমানুষগুলো বড় বড় গাছের উপরে লতাপাতা ডাল দিয়ে ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর বানিয়ে বাস করে। দ্বিতীয় দিন রাত্রে যখন তারা গাছের উপরে ঘুমে অচেতন, আমি তখন কোনও রকমে পকেট থেকে আমার ছুরিখানা বার করলুম। তারপর ছুরিখানা দাঁতে চেপে ধরে আগেই কমলের বাঁধন কেটে দিলুম, তারপর কমল আমাকে মুক্ত করলে। শত্রুরা টের পাওয়ার আগেই আমরা পালিয়ে এই হ্রদের ধারে এসে উপস্থিত হলুম, তারপর সাঁতার দিয়ে একেবারে ওই দ্বীপে গিয়ে উঠলুম। ওখানে এই পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা!
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কিন্তু ওরা কী করে ওখানে এল?
কুমার বললে, সে অনেক কথা। দ্বীপে গিয়ে শুনবেন। আজ বন্দুকের আওয়াজ শুনেই আমরা বুঝতে পেরেছিলুম যে, আমাদের খোঁজে আপনারা এখানে এসেছেন।
কে যেন আকাশের নীলিমাকে নিংড়ে হ্রদের জলে গুলে দিয়েছে, কী স্বচ্ছ নীল তার রং! তার তলা পর্যন্ত আলো করে সূর্যদেবের কিরণ-প্রদীপ জ্বলজ্বল করে জ্বলছে এবং কতরকমের মাছ যে সেখানে খেলা করে বেড়াচ্ছে, তাও স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে!
আগ্নেয়গিরির আগুন-জিভগুলো এখন আমাদের চোখের খুব কাছেই লকলক করে উঠছে গাছের পর গাছের সবুজ আঁচলটাকা সেই ছায়া-নাচানো দ্বীপটিও একেবারে আমাদের কোলের সামনে এসে পড়েছে। তারপরেই আমাদের নৌকোগুলো একে একে তীরে গিয়ে ভিড়ল।
দ্বীপে যে লোকগুলি আশ্রয় নিয়েছে তাদের সর্দার ছিল সোনাউল্লা। দ্বীপে নেমে আমাকে সেলাম ঠুকে সে বললে, বাবুজি, আজ আগেই আপনাদের খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে তো?
হ্যাঁ সোনাউল্লা, তাহলে বড় ভালো হয়–আমাদের ভারি খিদে পেয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি যাহোক কিছু বেঁধে আমাদের খাইয়ে দাও!
কিন্তু বাবুজি, আমরা যে মুসলমান!
ভাই সোনাউল্লা, আমরা এখন ভগবানের নিজের রাজত্বে বাস করছি…হয়তো এইখানেই আমাদের চিরকাল বাস করতে হবে। এখানে কেউ হিন্দুও নয়, কেউ মুসলমানও নয়–এখানে শুধু এক জাত আছে, সে হচ্ছে মানুষজাত! দলাদলিতে মানুষ যেসব জাতের সৃষ্টি করছে এখানে আমরা তা মানব না। তুমি যাও সোনাউল্লা, আগে তোমার হাতের রান্না খেয়ে পেট ঠান্ডা করি, তারপর তোমাদের কাহিনি শুনব।
.
খাঁড়া–দেঁতো বাঘ
আহারাদির পর একটা গাছতলায় পা ছড়িয়ে বসে সোনাউল্লার কাহিনি শুনতে লাগলুমঃ
বাবুজি, বামনদের উড়োজাহাজ যেদিন আবার পৃথিবীতে এসে নামল, আমাদের আর আনন্দের সীমা রইল না। তাই আপনারা উড়োজাহাজ ছেড়ে যখন নেমে গেলেন, তখন আমরাও আর থাকতে না পেরে নীচে নেমে পড়লুম। এই ফাঁকে বামনরা যে পালাতে পারে, মনের আনন্দে কারুরই আর সে কথা মনে রইল না।
আপনাদের বোধহয় স্মরণ আছে, তখনও ভালো করে ভোর হয়নি। মনের খুশিতে নাচতে নাচতে, লাফাতে লাফাতে, চাঁচাতে-চাচাতে আমরা চারিদিকে ছুটাছুটি করতে লাগলুম। বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না, ঠিক সেই সময়ে ভয়ানক একটা কাণ্ড ঘটল। আধা আলোয় আধা আঁধারে জঙ্গলের ভিতর থেকে হঠাৎ প্রকাণ্ড কি একটা বেরিয়ে এল–আমাদের মনে হল যেন একটা পাহাড় লাফাতে লাফাতে ছুটে আসছে।
প্রথমটা আমরা আতঙ্কে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম, তারপরে পাগলের মতো সকলে মিলে ছুটতে লাগলুম। সেই রাক্ষসটাও যে আমাদের পিছনে-পিছনে তেড়ে আসছে, তার পৃথিবী কাঁপানো পায়ের শব্দ শুনেই সেটা বেশ বুঝতে পারলুম। মাঝে মাঝে মানুষের কাতরানিও শোনা যেতে লাগল–নিশ্চয়ই আমাদের দলের কেউ কেউ তার কবলে পড়েছে।
আরও বেশি ভয় পেয়ে আমরা আরও বেশি বেগে দৌড়াতে লাগলুম। কিন্তু পিছনের সেই বিষম পায়ের শব্দ আর কিছুতেই যেন থামতে চায় না! এমনি ছুটতে ছুটতে বনবাদাড় ভেঙে আমরা যখন এই হ্রদের ওদিককার তীরে এসে পড়লুম, তখন আমাদের দম প্রায় আটকে যাওয়ার মতো হয়েছে। আমরা সেইখানেই কেউ বসে আর কেউ শুয়ে পড়ে জিরুতে লাগলুম। কিন্তু বেশিক্ষণ জিরুতে হল না, হঠাৎ বাজের মতো এক ভীষণ চিৎকার শুনে ফিরে দেখি, সেই পাহাড়ের মতো উঁচু রাক্ষসটা বনের ভিতর থেকে আবার বেরিয়ে আসছে। আমরা সকলে তখন হ্রদের জলে ঝাঁপ দিলুম।
আমাদের ভিতর তিন-চার জন লোক সাঁতার জানত না, সে বেচারিরা একেবারে তলিয়ে গেল! সেই সর্বনেশে জীবটা লাফাতে লাফাতে জলের ধার পর্যন্ত এল। তারপর এতগুলো শিকার হাতছাড়া হয়ে গেল দেখে, মনের দুঃখে আকাশপানে মুখ তুলে ভয়ানক চ্যাঁচামেচি শুরু করে দিল।
অনেকক্ষণ সাঁতার কেটে আমরা শেষে এই দ্বীপে এসে উঠলুম।
এখানে এসে প্রথম কদিন আমরা বনের ফলমূল খেয়ে কাটিয়ে দিলুম। তারপর হঠাৎ একদিন একরকম আশ্চর্য হাঁসের বাসার খোঁজ পেলুম–সে হাঁসদের ডানা নেই। তারপর থেকে ফলমূলের সঙ্গে সেই হাঁসের মাংস আর ডিম পেয়ে এখন আর আমাদের পেটের ভাবনা ভাবতে হয় না।
